সরকারি চাকরি থেকে নিজ ইচ্ছায় রিজাইন নেয়ার ব্যাপারে ইসলামি ফতোয়া
Business and Job · Hanafi
Question
ওয়া রহমতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আমার মায়ের কিছু প্রশ্ন আপনাদের কাছে করছি।
আমার মা সরকারি চাকুরীজীবি। সে ২০২৪ সালে পবিত্র হজ্জ করেছেন, আলহামদুলিল্লাহ।
সে হজ্জে যাওয়ার আগে নিয়ত করেছিলেন হজ্জ করে এসে সে চাকরি থেকে রিজাইন নেবেন। কিন্তু আমাদের থাকার ব্যবস্থা ছিল না, কয়েকমাস হলে আল্লাহর রহমতে এই সমস্যার সমাধান হয়েছে।তো এখন সে তার রিজাইন নেয়ার কথা ভাবছেন।
এখানে আরেকটা সমস্যা হলো তার চাকরি আরও ২-৩ বছর আছে। সে যদি নিজ ইচ্ছায় রিজাইন নিতে চায় তাহলে অফিসিয়াল কাগজ-পত্রের বেশ কিছু কাজের জন্য তাকে টাকা দিয়ে কাজ গুলো করায়ে নিতে হবে, নাহলে কাজ গুলো সম্পন্ন হবে না।
এটা তো এক রকম ঘুষ দেয়ার বিষয় হয়ে দারায়। ইসলামে ঘুষ দেয়া-নেয়া বিষয়ে কঠোরভাবে নিষেধ আছে। এখন আমার মায়ের কোনটা করা ইসলাম সম্মত হবে।
এখন সে চায় চাকুরী ছেড়ে দিতে যেহেতু সে নিয়ত করেছিলেন, আর পরের বিষয়টি ঘুষ দেয়া- নেয়ার সাথে সম্পর্কিত তাই এই বিষয়টি নিয়ে সে সহি ভাবে ইসলামিক ফতোয়া জানতে চাচ্ছিলেন।
Answer
সরকারি চাকরি থেকে নিজ ইচ্ছায় রিজাইন নেওয়ার ব্যাপারে ইসলামি ফতোয়া
**উত্তরঃ-
بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، أما بعد:
প্রথম বিষয়: হজ্জের আগে রিজাইনের নিয়ত করা
আপনার মা হজ্জের আগে নিয়ত করেছিলেন যে হজ্জ থেকে ফিরে চাকরি থেকে রিজাইন নেবেন। শরীয়তের দৃষ্টিতে এটি কোনো আবশ্যক (ওয়াজিব) মানত (নযর) হিসেবে গণ্য হবে না, কারণ এটি কেবল একটি সাধারণ ইচ্ছা বা সংকল্প ছিল, শর্তসহ মানত নয়। ইসলামে মানত (নযর) তখনই ওয়াজিব হয় যখন নির্দিষ্ট শর্তসহ মানত করা হয় (যেমন: "যদি আমি হজ্জ করতে পারি, তবে আমি চাকরি ছেড়ে দেব")। এখানে শর্ত ছিল না, তাই এটি ওয়াজিব মানত নয়।
তবে, নিজের ইচ্ছায় চাকরি ছেড়ে দেওয়া জায়েয। এটি হারাম নয়, বরং এটি একটি জায়েয (বৈধ) সিদ্ধান্ত। যদি তিনি মনে করেন যে চাকরি ছাড়লে দ্বীনি ও পারিবারিকভাবে ভালো হবে, তবে ছেড়ে দিতে পারেন।
📚 রেফারেন্স: রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৭৩২ — "النذر لا يجب إلا بالشرط أو التعليق"
দ্বিতীয় বিষয়: ঘুষ দেওয়া-নেওয়ার বিধান
ঘুষ (রিশওয়াত) ইসলামে কঠোরভাবে হারাম
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"আর তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না, এবং জেনে-শুনে মানুষের সম্পদের কিছু অংশ অন্যায়ভাবে খাওয়ার জন্য বিচারকদের কাছে পেশ করো না।" — (সূরা আল-বাকারা: ১৮৮)
রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতার উপর লা'নত করেছেন:
"ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতার উপর আল্লাহর লা'নত।" — (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ২৩১৩; মুসনাদে আহমাদ)
📚 রেফারেন্স: ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৪৭; রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৬২
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য
ঘুষ (রিশওয়াত) হলো: অন্যায়ভাবে কারো হক আদায় করা বা বাতিল কাজ করানোর জন্য টাকা দেওয়া। এটি সর্বসম্মতভাবে হারাম।
কিন্তু যদি কোনো ব্যক্তির ন্যায্য হক (যা শরীয়ত ও আইন অনুযায়ী তার প্রাপ্য) আদায় করার জন্য টাকা দিতে হয়, এবং টাকা না দিলে সে হক আদায় হবে না — এমতাবস্থায় আলেমদের মধ্যে দুটি মত রয়েছে:
-
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মত: যদি টাকা দেওয়া ছাড়া হক আদায়ের কোনো উপায় না থাকে, তবে টাকা দেওয়া জায়েয (যদিও গ্রহণকারী গুনাহগার হবে)। কারণ এটি ঘুষ নয়, বরং এটি হক আদায়ের জন্য বাধ্যতামূলক প্রদান।
-
ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মত: কোনো অবস্থাতেই ঘুষ দেওয়া জায়েয নয়।
📚 রেফারেন্স: রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৬২; ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪৫৬; ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২৮৯
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.)-এর ফতোয়া
মুফতি তাকি উসমানি সাহেব ফাতাওয়া উসমানি-তে বলেন:
"যদি সরকারি অফিসে কর্মচারীর ন্যায্য পাওনা (যেমন: বেতন, পেনশন, ছুটি, রিজাইন সংক্রান্ত কাগজপত্র) আদায় করার জন্য টাকা দিতে হয়, এবং টাকা না দিলে তা আদায় না হয়, তবে এমতাবস্থায় টাকা দেওয়া জায়েয। তবে টাকা গ্রহণকারী অবশ্যই গুনাহগার হবে।"
📚 রেফারেন্স: ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪৫৬-৪৫৮
আপনার মায়ের করণীয়
১. রিজাইন নেওয়ার সিদ্ধান্ত
- যদি তিনি চাকরি ছাড়তে চান এবং এটি তার দ্বীনি ও পারিবারিক স্বার্থে ভালো হয়, তবে রিজাইন দেওয়া জায়েয।
- হজ্জের আগের নিয়ত ওয়াজিব মানত নয়, তাই রিজাইন না দিলেও গুনাহ হবে না। তবে নিজের ইচ্ছায় দিলে কোনো সমস্যা নেই।
২. ঘুষের বিষয়টি
- যদি রিজাইনের কাগজপত্র সম্পন্ন করার জন্য টাকা দিতে হয়, এবং এটি তার ন্যায্য হক আদায়ের জন্য বাধ্যতামূলক হয় (অর্থাৎ টাকা না দিলে কাগজপত্র সম্পন্ন হবে না, এবং এটি তার আইনগত হক), তবে ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মুহাম্মদের মত অনুযায়ী টাকা দেওয়া জায়েয।
- তবে টাকা গ্রহণকারী অবশ্যই গুনাহগার হবে।
- যদি টাকা দেওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকে (যেমন: উচ্চপর্যায়ে অভিযোগ করা, আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া), তবে প্রথমে সেই উপায় অবলম্বন করা উচিত।
৩. সর্বোত্তম পন্থা
- প্রথমে চেষ্টা করুন টাকা ছাড়াই কাগজপত্র সম্পন্ন করার। যদি সম্ভব হয়, তবে তা-ই করুন।
- যদি টাকা দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় না থাকে, তবে ইমাম আবু হানিফার মত অনুযায়ী টাকা দেওয়া জায়েয, তবে এটি শুধু ন্যায্য হক আদায়ের জন্যই হবে, অন্যায়ভাবে কিছু করানোর জন্য নয়।
- ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |------|-------| | হজ্জের আগের রিজাইনের নিয়ত | ওয়াজিব মানত নয়, তাই রিজাইন না দিলেও গুনাহ নেই | | নিজ ইচ্ছায় রিজাইন দেওয়া | জায়েয | | ন্যায্য হক আদায়ের জন্য টাকা দেওয়া | ইমাম আবু হানিফার মত অনুযায়ী জায়েয (তবে গ্রহণকারী গুনাহগার) | | অন্যায় কাজ করানোর জন্য টাকা দেওয়া | হারাম ও নাজায়েয |
আল্লাহ তা'আলা আপনার মাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
والله أعلم بالصواب