দুই বছরের মধ্যে তিনদিন অল্প অল্প করে দুধ পান করালে কি দুধবোন হয়?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমি আমার মামাতো বোন কে ভালোবাসি, বিয়ে করতে চাই, কিন্তু আমি দুবছরে মধ্যে তিনদিন অল্প অল্প করে কিছু দুধ পান করিয়েছি, তাহলে কি সে দুধবোন?
আর দুধবোন হলে আমি আমার মনকে কোনোভাবে বোঝাতে পারছি না?
অল্প দুধপানে সম্পর্ক কি করে স্যবস্ত হয়?
Answer
দুধ সম্পর্ক (রাদা'আত) সংক্রান্ত মাসআলার বিস্তারিত উত্তর
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন: ১. মামাতো বোন যদি দুধবোন হয়, সে কি জান্নাতেও দুধবোন থাকবে, নাকি সেখানে তাকে বিয়ে করা জায়েজ হবে? ২. দুই বছরের মধ্যে তিনদিন অল্প অল্প করে দুধ পান করালে কি দুধবোন হয়? ৩. দুধবোন হলে মনকে কীভাবে বোঝানো যায়? ৪. অল্প দুধপানে সম্পর্ক কীভাবে সাব্যস্ত হয়?
ভূমিকা: দুধ সম্পর্কের গুরুত্ব
ইসলামে দুধ সম্পর্ক (রাদা'আত) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা'আলা স্পষ্টভাবে বলেছেন:
"তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে তোমাদের মাতা, কন্যা, বোন, ফুফু, খালা, ভ্রাতুষ্পুত্রী, ভাগিনেয়ী, দুধমাতা, দুধবোন..." — (সূরা আন-নিসা: ২৩)
এই আয়াতে "দুধমাতা" (أُمَّهَاتُكُمُ اللَّاتِي أَرْضَعْنَكُمْ) এবং "দুধবোন" (وَأَخَوَاتُكُم مِّنَ الرَّضَاعَةِ) উল্লেখ করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে দুধ সম্পর্ক রক্তের সম্পর্কের মতোই।
প্রথম প্রশ্ন: জান্নাতে দুধবোনের সম্পর্ক
জান্নাতের সম্পর্ক প্রসঙ্গে
জান্নাতে সম্পর্কের বিষয়টি একটি গায়েবি (অদৃশ্য) বিষয়। জান্নাতে মানুষ দুনিয়ার সম্পর্ক নিয়ে যাবে কি না, এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মত রয়েছে। তবে সঠিক মত হলো—
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-এ উল্লেখ করেছেন:
জান্নাতে দুনিয়ার আহকাম (বিধান) বলবৎ থাকবে না। জান্নাত دار الجزاء (প্রতিদানের ঘর), দারুল তাকলিফ (দায়িত্বের ঘর) নয়। সেখানে হালাল-হারামের বিধান দুনিয়ার মতো কার্যকর হবে না।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো:
দুধ সম্পর্ক দুনিয়াতে যেভাবে মাহরাম (যাদের সাথে বিবাহ হারাম) সাব্যস্ত করে, জান্নাতে সে বিধান থাকবে কি না—এটি আল্লাহর ইলমে। আমাদের কর্তব্য হলো দুনিয়ার বিধান মেনে চলা।
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) "ফাতাওয়া উসমানি"-তে বলেন:
জান্নাতের বিষয়গুলো গায়েবের অন্তর্ভুক্ত। আমরা জান্নাতে কী সম্পর্ক থাকবে তা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না। তবে দুনিয়াতে দুধ সম্পর্কের বিধান অবশ্যই মানতে হবে।
সারকথা: জান্নাতে দুধবোন থাকবে কি না বা সেখানে বিয়ে জায়েজ হবে কি না—এটি আল্লাহর ইলমে। আমাদের দুনিয়ার বিধান অনুযায়ী চলতে হবে।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: অল্প অল্প দুধ পান করালে দুধবোন হয় কি?
দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হওয়ার শর্ত
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হওয়ার জন্য দুটি মূল শর্ত রয়েছে:
শর্ত ১: দুধ পান করার সময়সীমা
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"দুধ সম্পর্ক কেবল শৈশবকালে (দুই বছরের মধ্যে) দুধ পান করার দ্বারা সাব্যস্ত হয়।" — (সহীহ বুখারি: ২৬৪৭, সহীহ মুসলিম: ১৪৫৬)
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত হলো: দুই বছরের মধ্যে দুধ পান করতে হবে। দুই বছর পূর্ণ হওয়ার পর দুধ পান করলে দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হয় না।
শর্ত ২: দুধের পরিমাণ
এখানে হানাফি মাযহাবের গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা রয়েছে:
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত:
দুধের পরিমাণ যতই কম হোক, যদি দুধ পেটে পৌঁছে এবং তা শিশুর খাদ্য হিসেবে গণ্য হয়, তাহলে দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হয়। এমনকি একবার দুধ পান করলেও দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হয়ে যায়।
দলিল:
"তোমাদের দুধমাতা ও দুধবোন তোমাদের জন্য হারাম।" (সূরা আন-নিসা: ২৩)
এই আয়াতে কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণের উল্লেখ নেই। তাই অল্প পরিমাণেও দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হয়।
ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর মত:
তারা ইমাম আবু হানিফার মতের সমর্থন করেছেন। তবে কিছু ফুকাহা বলেছেন, একবার দুধ পান করলে যদি নিশ্চিতভাবে দুধ পেটে পৌঁছে যায়, তাহলে সম্পর্ক সাব্যস্ত হয়।
ইমাম আত-তাহাবি (রহ.) "শারহু মাআনিল আছার"-এ উল্লেখ করেছেন:
হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত হলো—অল্প পরিমাণ দুধ পান করলেও দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হয়, যদি তা দুই বছরের মধ্যে হয়।
প্রশ্নকারীর ক্ষেত্রে প্রয়োগ
প্রশ্নকারী বলেছেন: "আমি দুই বছরের মধ্যে তিনদিন অল্প অল্প করে কিছু দুধ পান করিয়েছি।"
বিশ্লেষণ:
১. সময়সীমা: দুই বছরের মধ্যে হয়েছে — শর্ত পূরণ হয়েছে। ২. পরিমাণ: অল্প অল্প করে তিনদিন — হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, যদি নিশ্চিতভাবে দুধ পেটে পৌঁছে থাকে, তাহলে দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হয়ে গেছে। ৩. তিনদিন: প্রতিবার যদি দুধ পেটে পৌঁছে থাকে, তাহলে প্রতিবারই সম্পর্ক সাব্যস্ত হওয়ার কারণ হয়েছে।
ফলাফল: হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, প্রশ্নকারী ও তার মামাতো বোনের মধ্যে দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হয়ে গেছে (যদি নিশ্চিতভাবে দুধ পেটে পৌঁছে থাকে)। তখন সে তার দুধবোন হয়ে যাবে এবং তাকে বিয়ে করা হারাম।
তৃতীয় প্রশ্ন: মনকে কীভাবে বোঝানো যায়?
মানসিক ও আবেগগত দিক
দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হওয়ার পর মন মানতে না চাইলেও শরীয়তের বিধান পরিবর্তন হয় না। ইসলামে আবেগের চেয়ে বিধান প্রাধান্য পায়।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে... তোমাদের দুধবোন..." (সূরা আন-নিসা: ২৩)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"যা দুধ সম্পর্কের দ্বারা হারাম হয়, তা রক্তের সম্পর্কের দ্বারাও হারাম হয়।" — (সহীহ বুখারি: ২৬৪৫, সহীহ মুসলিম: ১৪৪৭)
মনকে বোঝানোর উপায়
১. আল্লাহর বিধান মেনে নিন: আল্লাহ যা হারাম করেছেন, তা আমাদের কল্যাণের জন্যই হারাম করেছেন। তিনি সর্বজ্ঞ।
২. আবেগ নিয়ন্ত্রণ করুন: দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হলে সেই সম্পর্ককে বোনের সম্পর্ক হিসেবে গ্রহণ করুন। রক্তের বোনের প্রতি যেমন দৃষ্টি রাখেন না, তেমনি দুধবোনের প্রতিও রাখবেন না।
৩. বিয়ের চিন্তা ত্যাগ করুন: দুধবোনকে বিয়ে করা কবিরা গুনাহ। এই চিন্তা মন থেকে ঝেড়ে ফেলুন।
৪. আল্লাহর কাছে সাহায্য চান: নিয়মিত ইস্তিগফার করুন এবং আল্লাহর কাছে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দুআ করুন।
৫. বিবাহের জন্য অন্যত্র খুঁজুন: শরীয়তসম্মত পন্থায় অন্য মেয়ের সাথে বিবাহের ব্যবস্থা করুন।
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-এ বলেন:
দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হলে তা রক্তের সম্পর্কের মতোই। আবেগ বা ভালোবাসা এর বিধান পরিবর্তন করতে পারে না।
চতুর্থ প্রশ্ন: অল্প দুধপানে সম্পর্ক কীভাবে সাব্যস্ত হয়?
হানাফি মাযহাবের দলিল ও বিশ্লেষণ
১. কুরআনের দলিল:
"তোমাদের দুধমাতা ও দুধবোন তোমাদের জন্য হারাম।" (সূরা আন-নিসা: ২৩)
এখানে কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণের উল্লেখ নেই। তাই অল্প পরিমাণেও সম্পর্ক সাব্যস্ত হয়।
২. হাদিসের দলিল:
"দুধ সম্পর্ক কেবল শৈশবকালে দুধ পান করার দ্বারা সাব্যস্ত হয়।" (সহীহ বুখারি: ২৬৪৭)
৩. ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত:
- দুধের পরিমাণ যতই কম হোক, যদি দুধ পেটে পৌঁছে এবং তা শিশুর খাদ্য হিসেবে গণ্য হয়, তাহলে সম্পর্ক সাব্যস্ত হয়।
- এমনকি একবার দুধ পান করলেও সম্পর্ক সাব্যস্ত হয়ে যায়।
৪. ইমাম আত-তাহাবি (রহ.) "শারহু মাআনিল আছার"-এ বলেন:
হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত হলো—অল্প পরিমাণ দুধ পান করলেও দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হয়, যদি তা দুই বছরের মধ্যে হয় এবং দুধ পেটে পৌঁছে।
৫. ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-এ বলেন:
দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হওয়ার জন্য দুধ পেটে পৌঁছানো শর্ত। পরিমাণ কম হলেও সম্পর্ক সাব্যস্ত হয়।
৬. মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) "ফাতাওয়া উসমানি"-তে বলেন:
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, অল্প পরিমাণ দুধ পান করলেও দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হয়, যদি তা দুই বছরের মধ্যে হয় এবং দুধ পেটে পৌঁছে।
সম্পর্ক সাব্যস্ত হওয়ার শর্তসমূহ (সংক্ষেপে)
| শর্ত | বিবরণ | |------|--------| | ১. সময় | দুই বছরের মধ্যে হতে হবে | | ২. পরিমাণ | অল্প হলেও চলবে (হানাফি মাযহাব) | | ৩. পেটে পৌঁছানো | দুধ নিশ্চিতভাবে পেটে পৌঁছাতে হবে | | ৪. খাদ্য হিসেবে গণ্য | দুধ শিশুর খাদ্য হিসেবে গণ্য হতে হবে |