মেমোরিতে রাখার জন্য বা অন্যকে দেখানোর জন্য ছবি তোলা জায়েজ আছে কি?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্ন: মেমোরি রাখার জন্য বা অন্য কাউকে দেখানোর জন্য ছবি তোলা বা ভিডিও করা যাবে?
উত্তর:
بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، أما بعد:
ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে প্রাণীর ছবি তোলা এবং ভিডিও করা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা নিম্নে প্রদান করা হলো:
হাদিস শরিফে প্রাণীর ছবি তৈরি করা সম্পর্কে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
«إِنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَذَابًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْمُصَوِّرُونَ»
অর্থ: "কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি ভোগ করবে ছবি নির্মাতারা।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৫০; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১০৯)
অন্য হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
«كُلُّ مُصَوِّرٍ فِي النَّارِ، يَجْعَلُ لَهُ بِكُلِّ صُورَةٍ صَوَّرَهَا نَفْسًا فَتُعَذِّبُهُ فِي جَهَنَّمَ»
অর্থ: "প্রত্যেক ছবি নির্মাতা জাহান্নামে যাবে। তার তৈরি প্রতিটি ছবির জন্য একটি প্রাণ সৃষ্টি করা হবে, যা তাকে জাহান্নামে শাস্তি দিতে থাকবে।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২২২৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১১০)
২. ফকীহগণের মতামত:
হানাফি ফিকহের প্রখ্যাত গ্রন্থ রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদিন (রহঃ) উল্লেখ করেছেন:
"প্রাণীর ছবি তৈরি করা হারাম, তা কাগজে হোক, কাপড়ে হোক, দেয়ালে হোক বা অন্য কোনো বস্তুতে হোক। কেননা হাদিসে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও শাস্তির কথা এসেছে।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ৩৭৫)
ফাতাওয়া আলমগিরি-তে বর্ণিত আছে:
"প্রাণীর ছবি আঁকা বা তৈরি করা মাকরূহ তাহরিমি (হারামের কাছাকাছি)।" (ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৩৫০)
৩. আধুনিক যুগে ছবি তোলা ও ভিডিও করার বিধান:
আধুনিক ফকীহগণ এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন:
মুফতি তাকি উসমানি (দাঃবাঃ) তার ফাতাওয়া উসমানি গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন:
"প্রাণীর ছবি তোলা মূলত নিষিদ্ধ। তবে বিশেষ প্রয়োজনে (যেমন: পাসপোর্ট, ভিসা, পরিচয়পত্র, নিরাপত্তা ইত্যাদি) ছবি তোলার অনুমতি রয়েছে। কিন্তু শুধুমাত্র মেমোরি রাখার জন্য বা সৌখিনতাবশত ছবি তোলা বা ভিডিও করা জায়েজ নেই।" (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৬০৫-৬১০)
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহঃ) ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে বলেন:
"প্রাণীর ছবি তৈরি করা ইসলামে নিষিদ্ধ। তবে যদি ছবি এমন হয় যে, তাতে প্রাণীর স্পষ্ট আকৃতি বোঝা যায় না বা অত্যন্ত ছোট হয়, তবে ভিন্ন কথা। কিন্তু স্পষ্ট ছবি সর্বাবস্থায় নিষিদ্ধ।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ২৩০)
৪. ভিডিও করার বিধান:
ভিডিও সম্পর্কে ফকীহগণ বলেন, ভিডিও হলো ধারাবাহিক ছবির সমষ্টি। তাই ভিডিও করার বিধানও ছবি তোলার মতোই। তবে কিছু ফকীহ ভিডিওকে ছবি থেকে আলাদা বলেছেন, কারণ ভিডিওতে প্রাণ সৃষ্টির দাবি নেই। কিন্তু সতর্কতা হিসেবে ভিডিও করাও নিষিদ্ধ বলেছেন অধিকাংশ ফকীহ।
৫. বিশেষ প্রয়োজনের ক্ষেত্রে:
যদি ছবি তোলা বা ভিডিও করা হয় নিম্নলিখিত প্রয়োজনে, তবে অনুমতি রয়েছে:
- পাসপোর্ট, ভিসা, জাতীয় পরিচয়পত্র
- নিরাপত্তা ও তদন্তের প্রয়োজনে
- চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণায়
- অপরাধী শনাক্তকরণে
- শিক্ষামূলক প্রয়োজনে (যেখানে প্রাণীর ছবি ছাড়া শিক্ষা অসম্ভব)
৬. সিদ্ধান্ত:
শুধুমাত্র মেমোরি রাখার জন্য বা অন্য কাউকে দেখানোর জন্য প্রাণীর ছবি তোলা বা ভিডিও করা জায়েজ নেই। এটি ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ। তবে বিশেষ প্রয়োজনে ছবি তোলার অনুমতি রয়েছে, কিন্তু তা শর্তসাপেক্ষে।
উল্লেখ্য, তবে বর্তমান যামানার কিছু ইসলামী স্কলারগন বলেছেন, মোবাইলে তোলা ছবি যদি কোন ভাবে প্রিন্ট করে বের করা না হয় এবং এটি যদি কোন গায়রে মাহরাম দেখার সম্ভাবনা না থাকে, সেক্ষেত্রে এটির বৈধতা রয়েছে।
মনে রাখবেন: ছবি তোলা বা ভিডিও করা থেকে বিরত থাকাই উত্তম। যদি কোনো বৈধ প্রয়োজনে ছবি তোলা হয়, তবে তা যেন ন্যূনতম পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে এবং তা যেন অন্য কোনো হারাম কাজে ব্যবহৃত না হয়।
والله أعلم بالصواب