ফ্লাট বন্ধক নেওয়া অতঃপর তাতে বসবাস করা কি বন্ধক গ্রাহিতার জন্য জায়েয?
Business and Job · Hanafi
Question
আমি একটা বিষয়ে সহীহ হাদিস সহ জানতে চাচ্ছি যে, বাংলাদেশে অনেকেই কোন কাজের জন্য টাকা ধার নিয়ে থাকে। বিল্ডিং বা ফ্ল্যাট বন্ধক দেয় টাকা যতদিন হচ্ছে ফেরত না দেওয়া হয় ততদিন পর্যন্ত ওই বিল্ডিং বা ফ্লাটের টাকা যে ধার দিয়েছে সে পেয়ে থাকে।
এখন আমি জানতে চাচ্ছি যে এটা কি সুদের মধ্যে পড়ে? আমার এই অল্প জ্ঞানে আমি যতটুকু বুঝতে পারি এটা সুদের মধ্যে পড়ে। আমি একটু ডিটেলসে বিষয়টা জানতে চাচ্ছি যে, এটা যদি সুদের মধ্যে পড়ে সে ক্ষেত্রে আমি এটা কিভাবে এক্সপ্লেইন করবো আমার পরিবারের মানুষের কাছে। এমন একটক বিষয়ের সাথে আমার পরিবারে একজন হচ্ছে যুক্ত আছে। আমি তাকে বুঝাতে চাই সহি হাদিস সহকারে যাতে সে বুঝতে পারে।অথবা আমি তাকে কিভাবে বুঝাতে পারি যাতে করে সে বুঝতে পারে এইটা অনেক বড় গুনাহর মধ্যে পড়ে। এই গুনাহর দ্বারা কোন ধরনের শাস্তি আমাদের জন্য আছে আমি সেই সম্পর্কে জানতে চাই যাতে করে আমি তাকে এই শাস্তির বিষয়ে অবগত করলে সে শাস্তির ভয়ে এই গুনাহ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারে।
জাযাকাল্লাহু খইরন।
Answer
ফ্ল্যাট/বিল্ডিং বন্ধক রেখে টাকা ধার দেওয়া ও মাসিক ভাড়া/আয় নেওয়ার বিধান
উত্তর (হানাফি ফিকহ অনুযায়ী):
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর
আপনার ধারণা সম্পূর্ণ সঠিক। প্রশ্নে বর্ণিত পদ্ধতি—অর্থাৎ বন্ধককৃত ফ্ল্যাট/বিল্ডিং থেকে প্রাপ্ত ভাড়া/আয় ঋণদাতা ভোগ করা—এটি সুদ (রিবা)-এর অন্তর্ভুক্ত এবং কবিরা গুনাহ। এটি শরীয়তে "বন্ধক" (রাহন) নামে পরিচিত একটি চুক্তিকে সুদী ঋণের আড়াল বানানোর একটি কৌশল, যা ফিকহের পরিভাষায় "قرض جرّ نفعًا" (ঋণ যা লাভ টেনে আনে) নামে পরিচিত এবং সর্বসম্মতভাবে হারাম।
১. মূল নীতি: "প্রত্যেক সেই ঋণ যা লাভ টেনে আনে, তা সুদ"
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
كُلُّ قَرْضٍ جَرَّ نَفْعًا فَهُوَ رِبًا "প্রত্যেক এমন ঋণ যা (ঋণদাতার জন্য) কোনো লাভ টেনে আনে, তা-ই সুদ।"
এই হাদিসটি যদিও সনদের দিক থেকে কিছুটা দুর্বল, তবে এর অর্থ ও মর্ম ইজমা (সর্বসম্মত) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.), ইমাম ইবনু আবিদীন (রহ.) প্রমুখ এটিকে উম্মতের ইজমা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
📚 রেফারেন্স:
- ইবনু আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃ. ১৬৬ (কিতাবুর রাহন)
- ইবনুল কাইয়্যিম, ইগাসাতুল লাহফান, খণ্ড ২
- ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুর রাহন
২. বন্ধক (রাহন) ও সুদের পার্থক্য
শরীয়তে রাহন (বন্ধক) বৈধ, কিন্তু তার শর্ত হলো:
- বন্ধককৃত বস্তু আমানত (trust) হিসেবে থাকবে ঋণদাতার হাতে।
- ঋণদাতা সেই বস্তু ব্যবহার বা ভোগ করতে পারবে না।
- বন্ধককৃত বস্তুর আয়/ভাড়া ঋণদাতা নিতে পারবে না; বরং তা ঋণগ্রহীতারই থাকবে।
- ঋণ পরিশোধের পর বন্ধককৃত বস্তু ফেরত দিতে হবে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
الرَّهْنُ مَرْكُوبٌ بِنَفَقَتِهِ إِذَا كَانَ مَرْهُونًا، وَلَبَنُ الدَّرِّ يُشْرَبُ بِنَفَقَتِهِ إِذَا كَانَ مَرْهُونًا "বন্ধককৃত পশু তার খরচের বিনিময়ে (ঋণদাতা) চড়তে পারবে এবং বন্ধককৃত দুধবিশিষ্ট পশুর দুধ খরচের বিনিময়ে পান করা যাবে।" — সহীহ বুখারি, হাদিস নং ২৫১৩
ইমাম বদরুদ্দীন আইনী (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন: এই অনুমতি শুধু পশুর ভরণপোষণের বিনিময়ে, এবং তা-ও ঋণদাতার জন্য লাভ হিসেবে নয়; বরং ক্ষতিপূরণ হিসেবে। কিন্তু ফ্ল্যাট/বিল্ডিং থেকে ভাড়া নেওয়া কোনো খরচের বিনিময় নয়—এটি সরাসরি ঋণের উপর লাভ, যা সুদ।
📚 রেফারেন্স:
- সহীহ বুখারি, হাদিস ২৫১৩
- আল-হিদায়া, কিতাবুর রাহন
- ইবনু আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃ. ১৬৬–১৭০
৩. ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর স্পষ্ট বক্তব্য
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর নীতি:
وَكُلُّ قَرْضٍ شُرِطَ فِيهِ نَفْعٌ زَائِدٌ عَلَى الْقَدْرِ الْمُسْتَحَقِّ فَهُوَ رِبًا "প্রত্যেক ঋণ, যাতে মূল ঋণের অতিরিক্ত কোনো লাভ শর্ত করা হয়, তা-ই সুদ।"
📚 রেফারেন্স:
- আল-হিদায়া, কিতাবুল বুয়ু
- ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ
- ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ৩, পৃ. ২৩০–২৪০ (মুফতি তাকি উসমানি)
৪. প্রশ্নে বর্ণিত লেনদেনের বিশ্লেষণ
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:
| বিষয় | অবস্থা | |---|---| | ঋণ দেওয়া হয় | ✅ বৈধ | | বন্ধক নেওয়া হয় | ✅ বৈধ (শর্তসাপেক্ষে) | | বন্ধককৃত ফ্ল্যাট থেকে ঋণদাতা ভাড়া/আয় ভোগ করে | ❌ হারাম, সুদ | | ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত ঋণদাতা আয় পেতে থাকে | ❌ সুদী শর্ত |
এটি নিম্নলিখিত কারণে সুদ:
- শর্তযুক্ত লাভ: ঋণের শর্ত হিসেবে ঋণদাতা লাভ (ভাড়া) পাচ্ছে — এটি "قرض جرّ نفعًا"।
- দুই ধরনের লাভ: ঋণদাতা মূল টাকা ফেরত পাবে এবং এর সাথে মাসিক ভাড়া পাবে — এটি দ্বিগুণ সুদ।
- বন্ধকের অপব্যবহার: বন্ধক আমানত হওয়া সত্ত্বেও ঋণদাতা তা ভোগ করছে — যা রাহনের মূল চুক্তির পরিপন্থী।
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) স্পষ্ট বলেছেন: "ঋণের বিনিময়ে বন্ধককৃত সম্পত্তির আয় ঋণদাতার জন্য নেওয়া সুদ, চাই তা ভাড়া হোক বা অন্য কোনো রূপে হোক।"
📚 রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ৩, পৃ. ২৩৫
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪, পৃ. ২৮০ (মুফতি আশরাফ আলী থানভী রহ.)
- ফাতাওয়া মাহমুদিয়া, খণ্ড ১৩
৫. সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণ
(ক) সুদ কবিরা গুনাহ
اجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوبِقَاتِ... وَأَكْلِ الرِّبَا "তোমরা সাতটি ধ্বংসকারী বিষয় থেকে বেঁচে থাকো... (তন্মধ্যে) সুদ খাওয়া।" — সহীহ বুখারি, হাদিস ২৭৬৬; সহীহ মুসলিম, হাদিস ৮৯
(খ) সুদখোরের পরিণতি
لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ، وَقَالَ: هُمْ سَوَاءٌ "রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদখোর, সুদদাতা, সুদের লেখক এবং তার দুই সাক্ষীকে অভিশাপ করেছেন এবং বলেছেন: তারা সবাই সমান (গুনাহে)।" — সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৫৯৮
(গ) সুদ জিনার চেয়েও ভয়ংকর
لَدِرْهَمٌ مِنَ الرِّبَا يَأْكُلُهُ الرَّجُلُ وَهُوَ يَعْلَمُ أَشَدُّ مِنْ سِتَّةٍ وَثَلَاثِينَ زَنْيَةً "এক দিরহাম সুদ, যা কোনো ব্যক্তি জেনে-বুঝে খায়, তা ছত্রিশবার জিনা করার চেয়েও ভয়ংকর।" — মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ২২৫৭; মুস্তাদরাকে হাকিম
(ঘ) কিয়ামতের দিনের শাস্তি
مَا مِنْ أَحَدٍ يَأْكُلُ الرِّبَا إِلَّا أُدْخِلَ النَّارَ "যে ব্যক্তি সুদ খায়, তাকে অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করানো হবে।" — মুসনাদে আহমাদ; সুনানে দারিমি
(ঙ) সুদখোরের অবস্থা কিয়ামতের দিন
يَأْتِي آكِلُ الرِّبَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَجْنُونًا يَتَخَبَّطُ "সুদখোর কিয়ামতের দিন পাগল হয়ে আসবে, (শয়তানের স্পর্শে) উন্মাদ হয়ে।" — তাফসিরে ইবনে কাসির, সূরা বাকারা: ২৭৫-এর তাফসিরে
(চ) কুরআনের ঘোষণা
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا "আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" — সূরা বাকারা: ২৭৫
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ "হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা বাকি আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও।" — সূরা বাকারা: ২৭৮
فَإِنْ لَمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ "যদি না করো, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও।" — সূরা বাকারা: ২৭৯
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) মা'আরিফুল কুরআন-এ লিখেছেন: "এই আয়াত প্রমাণ করে সুদ পরিত্যাগ করা ঈমানের শর্ত। যে ব্যক্তি সুদকে হালাল মনে করে, সে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যায়। আর যে হারাম জেনেও করে, সে ফাসিক ও কবিরা গুনাহগার।"
📚 রেফারেন্স:
- মা'আরিফুল কুরআন, খণ্ড ১, সূরা বাকারা: ২৭৫–২৮১
- তাফসিরে ইবনে কাসির, সূরা বাকারা: ২৭৫
৬. এই গুনাহর শাস্তি (দুনিয়া ও আখিরাত)
| শাস্তির ধরন | বিবরণ | |---|---| | দুনিয়ার শাস্তি | বরকত উঠে যায়, সম্পদ ধ্বংস হয়, দুআ কবুল হয় না, দোয়া-ইবাদত প্রত্যাখ্যাত হয় | | কবরের শাস্তি | সুদখোরের কবরে শাস্তি হয় (মিরাজের হাদিসে বর্ণিত) | | আখিরাতের শাস্তি | জাহান্নামে প্রবেশ, পাগল অবস্থায় হাশর, আল্লাহ ও রাসূলের সাথে যুদ্ধের ঘোষণা | | সামাজিক | অভিশপ্ত ব্যক্তি, তার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়, তার সন্তান-সম্পদে বরকত থাকে না |
মিরাজের হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
أَتَيْتُ عَلَى نَهَرٍ... وَإِذَا رَجُلٌ يَسْبَحُ فِي النَّهَرِ، وَعَلَى شَطِّ النَّهَرِ رَجُلٌ قَدْ جَمَعَ عِنْدَهُ حِجَارَةً كَثِيرَةً... فَيَفْعَلُ بِهِ ذَلِكَ... فَقَالَ: هَذَا آكِلُ الرِّبَا "আমি এক নদীর কাছে এলাম... এক ব্যক্তি নদীতে সাঁতার কাটছে, আর তীরে এক ব্যক্তি পাথর জমা করে রেখেছে... (সে পাথর দিয়ে তার মুখে আঘাত করছে)... বলা হলো: এ হলো সুদখোর।" — সহীহ বুখারি, হাদিস ১৩৮৬
৭. পরিবারের সদস্যকে বোঝানোর কার্যকর পদ্ধতি
(ক) কুরআনের আয়াত দিয়ে শুরু করুন
সূরা বাকারার ২৭৫–২৭৯ আয়াতগুলো পড়ে শোনান এবং মা'আরিফুল কুরআন-এর তাফসির থেকে ব্যাখ্যা দিন। বিশেষ করে ২৭৯ নং আয়াত—"আল্লাহ ও রাসূলের সাথে যুদ্ধের ঘোষণা"—এটি যে কত ভয়ংকর, তা বোঝান।
(খ) সহীহ হাদিস পেশ করুন
- সহীহ মুসলিম ১৫৯৮ — সুদখোর ও সুদদাতা উভয়েই অভিশপ্ত
- মুসনাদে আহমাদ — এক দিরহাম সুদ = ৩৬ বার জিনার চেয়ে ভয়ংকর
- সহীহ বুখারি ১৩৮৬ — মিরাজের রাতে সুদখোরের শাস্তি
(গ) যুক্তি দিয়ে বোঝান
- "ভাই, আপনি টাকা ধার দিয়েছেন—এটা সদকা বা সহযোগিতা। কিন্তু এর বিনিময়ে মাসিক ভাড়া নিচ্ছেন—এটা তো ব্যবসা হয়ে গেল। তাহলে এটা ঋণ থাকল কেমন করে?"
- "ঋণদাতা যদি লাভ নেয়, তবে গরিব-দুঃখীরা কোথায় যাবে? সুদ তো গরিবকে আরও গরিব করে।"
- "শরীয়ত বন্ধক রেখেছে নিরাপত্তার জন্য, আয়ের জন্য নয়।"
(ঘ) শাস্তির ভয় দেখান
- জাহান্নামের আগুন
- কবরের আজাব
- দুনিয়ার বরকত ধ্বংস
- সন্তান-সন্ততির উপর প্রভাব
(ঙ) বিকল্প সমাধান দিন
- শুধু ঋণ দিন, বন্ধক নিন—কিন্তু ভাড়া নেবেন না। বন্ধককৃত ফ্ল্যাট খালি থাকবে বা ঋণগ্রহীতা নিজে ভোগ করবে।
- শরীয়তসম্মত বিকল্প: মুশারাকা (অংশীদারিত্ব), মুদারাবা, বা ইজারা (ভাড়া) চুক্তি—যেখানে ঝুঁকি ও লাভ উভয়েই ভাগাভাগি হবে।
- ঋণ পরিশোধে সময় দিন, কিন্তু অতিরিক্ত কিছু নেবেন না।
- যদি ব্যবসায়িক লাভের উদ্দেশ্যে হয়, তবে সরাসরি ব্যবসায় অংশীদার হোন—ঋণ নয়।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।