মোবাইল বিক্রি করে আবার ভাড়ায় নেওয়া এবং মাসিক টাকা দেওয়ার লেনদেন কি জায়েজ?

Business and Job · Hanafi

Question No: 5560
Questioner: Hossain Al Zakaria
Question Asked: 16 Sep 2026, 07:21 PM
Reviewed & Published: 16 Sep 2026, 07:29 PM
Views: 14
Tokens: 4,522
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

টাকার সমস্যার জন্য আমি আমার এক সহকর্মীর কাছে মোবাইল বিক্রি করব ১০০০০ টাকায়। তারপর সেই মোবাইলটি আবার তার কাছ থেকে নিয়ে ব্যবহার করব মাসিক ৫০০ টাকার বিনিময়ে। যত মাস ব্যবহার করব তত মাস এই টাকা তাকে দিব। মোবাইলের কোন ক্ষতি হলে আমার টাকা দিয়ে ঠিক করে দেব। পরবর্তীতে সে যদি মোবাইলটি নিতে না চায় অথবা মোবাইলটি আমি একেবারে নিতে চাই তাহলে তার থেকে যে টাকা দিয়ে বিক্রি করেছিলাম সেই টাকা ফেরত দেবো। এমনটা করা যাবে কিনা

Answer

প্রশ্নোক্ত লেনদেনের শরয়ি বিধান

সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, প্রশ্নে বর্ণিত পদ্ধতিতে লেনদেন করা যাবে না। এটি মূলত একটি হিলা/বাহানা যা সুদভিত্তিক ঋণের দিকে নিয়ে যায় এবং এতে একই চুক্তিতে বিক্রয় ও ভাড়া একত্রিত হওয়ার কারণে শরিয়তের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।


১. সমস্যাটি কী?

আপনি যা বর্ণনা করেছেন, তার সারমর্ম হলো:

  1. আপনি আপনার মোবাইল সহকর্মীর কাছে ১০,০০০ টাকায় বিক্রি করবেন।
  2. আবার সেই মোবাইলটি তার কাছ থেকে মাসিক ৫০০ টাকায় ভাড়া নিয়ে ব্যবহার করবেন।
  3. যত মাস ব্যবহার করবেন, তত মাস ৫০০ টাকা দেবেন।
  4. ক্ষতি হলে আপনি মেরামত করে দেবেন।
  5. পরে চাইলে ১০,০০০ টাকা ফেরত দিয়ে মোবাইলটি ফেরত নেবেন, অথবা সে না চাইলে সেটি তারই থাকবে।

এখানে প্রকৃত উদ্দেশ্য মোবাইল বিক্রি নয়; বরং ১০,০০০ টাকা ধার নিয়ে মাসে ৫০০ টাকা "ভাড়া" নামে বাড়তি দেওয়া। এটাই সুদের শামিল।


২. শরিয়তের মূলনীতি

(ক) সুদের সংজ্ঞা

وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

"আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" — সূরা বাকারা: ২৭৫

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

كُلُّ قَرْضٍ جَرَّ نَفْعًا فَهُوَ رِبًا

"প্রত্যেক এমন ঋণ, যা (ঋণদাতার জন্য) উপকার টেনে আনে, তা সুদ।" — (বায়হাকি, সুনানুল কুবরা; ইমাম সারাখসি, আল-মাবসুত)

(খ) একই চুক্তিতে বিক্রয় ও ভাড়া একত্র করা

হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ মূলনীতি:

نَهَى رَسُولُ اللَّهِ ﷺ عَنْ صَفْقَتَيْنِ فِي صَفْقَةٍ

"রাসূলুল্লাহ ﷺ একই চুক্তিতে দুটি চুক্তি করতে নিষেধ করেছেন।" — (তিরমিজি, আবু দাউদ)

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর উসুল অনুযায়ী, একই বস্তুতে বিক্রয় ও ইজারা (ভাড়া) একত্রিত করা জায়েজ নয়। কারণ বিক্রয়ের পর বস্তু ক্রেতার মালিকানায় চলে যায়; অতঃপর বিক্রেতার জন্য সেটি ভাড়া নেওয়া একটি নতুন চুক্তি, যা মূল চুক্তির সাথে সংযুক্ত করা হলে তা "সাফকাতাইন ফি সাফকা" (এক চুক্তিতে দুই চুক্তি)-এর অন্তর্ভুক্ত হয়।

রেফারেন্স:

  • ইমাম সারাখসি, আল-মাবসুত (কিতাবুল বুয়ু)
  • আল-হিদায়া (কিতাবুল বুয়ু, বাবুল ফাসিদ)
  • ইবনে আবিদিন, রাদ্দুল মুহতার (কিতাবুল বুয়ু)
  • ফাতাওয়া আলমগিরি (কিতাবুল কারাহিয়াত)

৩. প্রশ্নোক্ত লেনদেনের বিশ্লেষণ

| ধাপ | শরয়ি অবস্থান | |---|---| | ১০,০০০ টাকায় বিক্রি | আপাতদৃষ্টিতে বৈধ বিক্রয় | | আবার মাসে ৫০০ টাকায় ভাড়া নেওয়া | এখানেই মূল সমস্যা | | ক্ষতি হলে নিজ খরচে মেরামত | ভাড়া চুক্তির শর্ত হিসেবে সন্দেহজনক | | পরে ১০,০০০ টাকা ফেরত দিয়ে ফেরত নেওয়া | এটি "বাই বিল-ওয়াফা" বা শর্তযুক্ত বিক্রয়, যা হানাফি মাযহাবে জায়েজ নয় |

কেন এটি সুদ হবে?

কারণ প্রকৃতপক্ষে আপনি ১০,০০০ টাকা ঋণ নিচ্ছেন এবং মাসে ৫০০ টাকা বাড়তি দিচ্ছেন। মোবাইলের ভাড়ার নামে এই বাড়তিটাই সুদ। ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, "সুদ হলো সেই বাড়তি, যা ঋণের বিনিময়ে শর্ত করা হয়।"

كُلُّ قَرْضٍ جَرَّ نَفْعًا فَهُوَ رِبًا — (শারহু মাআনিল আসার, ইমাম তাহাবি)


৪. বিকল্প হালাল পদ্ধতি

আপনার প্রয়োজন মেটানোর জন্য নিম্নলিখিত পদ্ধতিগুলো শরিয়তসম্মত:

পদ্ধতি ১: প্রকৃত ভাড়া চুক্তি (ইজারা)

  • মোবাইলটি সহকর্মীর মালিকানায় থাকবে (বিক্রি করবেন না)।
  • আপনি মাসে ৫০০ টাকা ভাড়া দিয়ে ব্যবহার করবেন।
  • ক্ষতির দায়িত্ব ভাড়া চুক্তির শর্ত অনুযায়ী নির্ধারিত হবে (সাধারণ ব্যবহারজনিত ক্ষয় ভাড়াগ্রহীতার দায় নয়; অবহেলাজনিত ক্ষতি তার দায়)।
  • এতে কোনো সুদ নেই, কারণ এটি প্রকৃত ভাড়া।

পদ্ধতি ২: প্রকৃত বিক্রয় (বিনা শর্তে)

  • মোবাইলটি সত্যিকারভাবে ১০,০০০ টাকায় বিক্রি করে দেবেন।
  • এরপর আর ফেরত নেওয়ার শর্ত রাখবেন না।
  • টাকার প্রয়োজন হলে কুরযে হাসানা (নিঃস্বার্থ ঋণ) নিন — কোনো বাড়তি শর্ত ছাড়া।

পদ্ধতি ৩: বাই মুআজ্জাল / বাই সালাম

  • প্রয়োজনে ইসলামি ব্যাংক বা শরিয়াহ-সম্মত প্রতিষ্ঠান থেকে মুদারাবা/মুশারাকা ভিত্তিতে অর্থায়ন নিন।

৫. বিশেষ সতর্কতা

  • "বাই বিল-ওয়াফা" (শর্তসাপেক্ষে ফেরতযোগ্য বিক্রয়) হানাফি মাযহাবে জায়েজ নয়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে এটি ফাসিদ (বাতিল) চুক্তি।
  • "বাইনে ওয়া শিরাকাত" বা "মুরাবাহা"-এর নামে সুদি লেনদেন করা যাবে না।
  • মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) ফাতাওয়া উসমানি-তে স্পষ্ট করেছেন: "ঋণের বিনিময়ে যেকোনো প্রকার বাড়তি শর্ত করা সুদ।"

৬. উপসংহার

প্রশ্নে বর্ণিত পদ্ধতিতে লেনদেন করা জায়েজ নয়। এটি সুদ ও "সাফকাতাইন ফি সাফকা"-এর অন্তর্ভুক্ত। বিকল্প হিসেবে প্রকৃত ভাড়া চুক্তি বা নিঃস্বার্থ ঋণ গ্রহণ করুন।

وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا

"যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন।" — সূরা তালাক: ২


রেফারেন্স গ্রন্থপঞ্জি:

  1. ইমাম সারাখসি — আল-মাবসুত
  2. আল-হিদায়া — কিতাবুল বুয়ু
  3. ইবনে আবিদিন — রাদ্দুল মুহতার
  4. ফাতাওয়া আলমগিরি — কিতাবুল কারাহিয়াত
  5. মুফতি তাকি উসমানি — ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২ (ব্যবসা ও লেনদেন)
  6. মুফতি মুহাম্মদ শফি — ইমদাদুল ফাতাওয়া
  7. আশরাফ আলী থানভি — বাহিশতী জেওর, ব্যবসা অধ্যায়
  8. ইমাম তাহাবি — শারহু মাআনিল আসার

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.