বিবাহের জন্য উপযুক্ত পাত্রী সন্ধানের উপায়
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
এখন আমি এই সিচুয়েশনে কি পদক্ষেপ নিতে পারি??আর দীনি কাওকে খোজার উপায় কি?আমি এমন একজন জীবন সাথী যাই যে আমার এই হেদায়েতের পথ চলা সাথী হবে
Answer
বিবাহের জন্য উপযুক্ত পাত্রী সন্ধানের উপায়
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী কানাডায় প্রবাসী, আল্লাহর হেদায়েত পাওয়ার পর দ্বীন শিখছেন। ৬-৭ মাস পর পারমানেন্ট রেসিডেন্সি আসবে। পরিবার এখন পাত্রী দেখা শুরু করেছেন, কিন্তু তারা দীনকে প্রাধান্য না দিয়ে সৌন্দর্য ও স্টেটাসকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। প্রশ্নকারী এমন জীবনসাথী চান যিনি তার হেদায়েতের পথে সঙ্গী হবেন। তিনি জানতে চান—এই পরিস্থিতিতে কী পদক্ষেপ নিতে পারবেন এবং দ্বীনদার পাত্রী খোঁজার উপায় কী।
বিস্তারিত উত্তর
১. দ্বীনদার পাত্রীকে প্রাধান্য দেওয়া ইসলামের নির্দেশ
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعٍ: لِمَالِهَا، وَلِحَسَبِهَا، وَلِجَمَالِهَا، وَلِدِينِهَا، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ
"নারীকে বিবাহ করা হয় চারটি কারণে—তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য এবং তার দ্বীনদারির জন্য। তুমি দ্বীনদার নারীকে গ্রহণ করো, (নাহলে) তোমার হাত ধূলিমলিন হবে।"
— সহীহ বুখারী, হাদীস ৫০৯০; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৪৬৬
ইমাম নববী (রহ.) এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, দ্বীনদারিকে অগ্রাধিকার দেওয়া সুন্নত এবং দ্বীনি স্বার্থে অন্যান্য দিক ত্যাগ করা উচিত। (শরহু সহীহ মুসলিম, খণ্ড ১০, পৃ. ৫১)
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَلَا تَنْكِحُوا الْمُشْرِكَاتِ حَتَّىٰ يُؤْمِنَّ ۚ وَلَأَمَةٌ مُّؤْمِنَةٌ خَيْرٌ مِّن مُّشْرِكَةٍ وَلَوْ أَعْجَبَتْكُمْ
"তোমরা মুশরিক নারীদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে। নিশ্চয়ই একজন মুমিন দাসী একজন মুশরিক নারীর চেয়ে উত্তম, যদিও সে তোমাদেরকে মুগ্ধ করে।"
— সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২২১
২. পরিবারের সাথে সৌজন্য ও দ্বীনি দাওয়াত
প্রশ্নকারীর পরিবার নামমাত্র মুসলিম এবং দীনি বিষয়ে তাদের ধারণা কম। এমতাবস্থায়:
ক. পরিবারের সাথে ধৈর্য ও সৌজন্য বজায় রাখা: ইসলামে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ বলেন:
وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا
"পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।"
— সূরা আল-বাকারা, আয়াত ৮৩
খ. পরিবারকে দ্বীনের গুরুত্ব বোঝানো: কঠোরতা নয়, বরং ভালোবাসা ও যুক্তির মাধ্যমে বোঝান যে, দ্বীনদার জীবনসাথীই দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতার কারণ হবে। রাসূল ﷺ বলেছেন:
الدُّنْيَا مَتَاعٌ، وَخَيْرُ مَتَاعِ الدُّنْيَا الْمَرْأَةُ الصَّالِحَةُ
"দুনিয়া একটি সামগ্রী, আর দুনিয়ার সর্বোত্তম সামগ্রী হলো সৎকর্মপরায়ণ স্ত্রী।"
— সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৪৬৭
গ. নিজের দ্বীনি উন্নতি অব্যাহত রাখা: আপনি নিজে দ্বীন শিখছেন—এটি চালিয়ে যান। আপনার দ্বীনি উন্নতি দেখে পরিবারও প্রভাবিত হবে, ইনশাআল্লাহ।
৩. দ্বীনদার পাত্রী খোঁজার কার্যকর উপায়
ক. স্থানীয় মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার: কানাডার মসজিদগুলোতে দ্বীনদার পরিবার ও পাত্রী খোঁজার জন্য যোগাযোগ করুন। ইমাম বা মসজিদ কমিটির সাথে কথা বলুন।
খ. দ্বীনি সংগঠন ও দাওয়াহ সেন্টার: যেসব ইসলামিক সংগঠন দ্বীনি শিক্ষা ও দাওয়াহর কাজ করে, তাদের সাথে যোগাযোগ করুন।
গ. দ্বীনি পরিবারের সাথে সম্পর্ক: যারা দ্বীনদার, তাদের মাধ্যমে পাত্রী খোঁজার অনুরোধ করুন। রাসূল ﷺ বলেছেন:
الْمَرْءُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ، فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ
"মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের উপর থাকে, তাই তোমাদের প্রত্যেকে যেন লক্ষ্য করে সে কার সাথে বন্ধুত্ব করছে।"
— সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৮৩৩; তিরমিযী, হাদীস ২৩৭৮
ঘ. অনলাইন ইসলামিক ম্যাট্রিমোনিয়াল সাইট: দ্বীনদার পাত্রী খোঁজার জন্য ইসলামিক ম্যাট্রিমোনিয়াল সাইট ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে সতর্কতা ও শরীয়তের সীমা রক্ষা করে।
ঙ. পরিবারকে রাজি করানোর কৌশল: পরিবারকে বলুন যে, আপনি নিজে পাত্রী খুঁজতে চান বা দ্বীনদার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করতে চান। তাদের সাথে ঝগড়া নয়, বরং সম্মানের সাথে আলোচনা করুন।
৪. দ্বীনি পাত্রী নির্বাচনের মানদণ্ড
একজন দ্বীনদার পাত্রী নির্বাচনে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো লক্ষ্য করুন:
- সালাত ও ইবাদত: সে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে কি না।
- পর্দা ও হায়া: শরীয়ত অনুযায়ী পর্দা ও হায়া বজায় রাখে কি না।
- কুরআন ও সুন্নাহর জ্ঞান: দ্বীনি মৌলিক জ্ঞান আছে কি না।
- চরিত্র ও আখলাক: সততা, ধৈর্য, নম্রতা ইত্যাদি।
- পরিবারের দ্বীনি পরিবেশ: তার পরিবার দ্বীনদার কি না।
৫. দ্বীনি পাত্রী না পাওয়া গেলে করণীয়
যদি পরিবারের চাপে বা অন্য কারণে দ্বীনদার পাত্রী না পাওয়া যায়, তাহলে:
- ইস্তিখারা ও দুআ: আল্লাহর কাছে দুআ করুন, তিনি যেন দ্বীনদার জীবনসাথী দেন। রাসূল ﷺ বলেছেন:
لَا يَرُدُّ الْقَضَاءَ إِلَّا الدُّعَاءُ
"দুআ ছাড়া ভাগ্য পরিবর্তন হয় না।"
— তিরমিযী, হাদীস ২১৩৯
-
ধৈর্য ধারণ: আল্লাহ পরীক্ষা করেন, কিন্তু ধৈর্য ধারণকারীদের সাথে আছেন। (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৫৩)
-
পরিবারকে বোঝানো: যদি পরিবার জোর করে অদ্বীনদার পাত্রী বিয়ে দিতে চায়, তাহলে সম্মানের সাথে অস্বীকার করুন এবং বোঝান যে, এটি আপনার দ্বীনি ও পারিবারিক শান্তির জন্য ক্ষতিকর।
৬. বিশেষ পরামর্শ
- আপনার দ্বীনি শিক্ষা অব্যাহত রাখুন: আপনি দ্বীন শিখছেন—এটি চালিয়ে যান। দ্বীনি জ্ঞান বাড়লে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
- স্থানীয় দ্বীনি পরিবেশে মিশুন: কানাডার দ্বীনদার মুসলিমদের সাথে সম্পর্ক গড়ুন।
- পরিবারের সাথে সংলাপ: পরিবারকে বলুন, "আমি দ্বীনদার পাত্রী চাই, কারণ এটি আমার ও আমার সন্তানদের দ্বীনি ভবিষ্যতের জন্য জরুরি।"
- বিয়ে তাড়াহুড়ো করবেন না: সঠিক পাত্রী না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। রাসূল ﷺ বলেছেন:
إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ
"নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল।"
— সহীহ বুখারী, হাদীস ১
সারসংক্ষেপ ও উপদেশ
- দ্বীনদার পাত্রীকে প্রাধান্য দিন—এটি সুন্নত ও আল্লাহর নির্দেশ।
- পরিবারের সাথে সৌজন্য বজায় রাখুন এবং তাদেরকে দ্বীনের গুরুত্ব বোঝান।
- স্থানীয় মসজিদ, ইসলামিক সেন্টার ও দ্বীনি সংগঠনের মাধ্যমে পাত্রী খুঁজুন।
- দুআ ও ইস্তিখারা করুন—আল্লাহই সর্বোত্তম ব্যবস্থাপক।
- ধৈর্য ধারণ করুন—সঠিক সময়ে আল্লাহ দ্বীনদার জীবনসাথী দান করবেন, ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে দ্বীনদার জীবনসাথী দান করুন এবং আমাদের দ্বীনের পথে অবিচল রাখুন। আমীন।
রেফারেন্স
- সহীহ বুখারী, হাদীস ৫০৯০
- সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৪৬৬, ১৪৬৭
- সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৮৩৩
- সুনানে তিরমিযী, হাদীস ২১৩৯, ২৩৭৮
- শরহু সহীহ মুসলিম—ইমাম নববী (রহ.)
- রাদ্দুল মুহতার—ইবনে আবিদীন শামী (রহ.)
- ফাতাওয়া উসমানি—মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া—আশরাফ আলী থানভী (রহ.)
- মা'আরিফুল কুরআন—মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.)