বাচ্চা নষ্ট করা সংক্রান্ত মাসআলা
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
বাচ্চা নষ্ট করা সংক্রান্ত মাসআলা
উত্তর (সংক্ষিপ্ত):
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থায় — অর্থাৎ তালাকের পর ইদ্দতের মধ্যে সন্তান গর্ভে থাকার বিষয় নিশ্চিত হওয়ার পর — গর্ভপাত করানো বা বাচ্চা নষ্ট করা শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয নয়; বরং তা হারাম ও কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। এ অবস্থায় করণীয় হলো ইদ্দত পূর্ণ করা এবং সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর শরীয়তসম্মত পন্থায় সন্তানের লালন-পালন ও ভরণপোষণের ব্যবস্থা করা।
বিস্তারিত আলোচনা
১. তালাকের পর ইদ্দত ও সন্তানের বিধান
তালাকের পর স্ত্রীর ইদ্দত পালন করা ফরজ। গর্ভবতী স্ত্রীর ইদ্দত শেষ হয় সন্তান প্রসবের মাধ্যমে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَأُولَاتُ الْأَحْمَالِ أَجَلُهُنَّ أَن يَضَعْنَ حَمْلَهُنَّ
"আর গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতের সময়সীমা হলো সন্তান প্রসব করা।" — (সূরা আত-তালাক: ৪)
অতএব আপনার বোনের ইদ্দত এখনো শেষ হয়নি; সন্তান প্রসব পর্যন্ত ইদ্দত চলবে। এই সময়ে সে তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী হিসেবেই থাকবে, এবং সন্তানের নসব (বংশপরিচয়) তার সাবেক স্বামীর সাথেই প্রমাণিত হবে।
২. গর্ভপাতের শরঈ হুকুম
ফকীহগণের সর্বসম্মত মতানুযায়ী, কোনো বৈধ ওজর ছাড়া গর্ভপাত করা হারাম। বিশেষত:
- ১২০ দিন (৪ মাস) পূর্ণ হওয়ার পর রূহ ফুঁকে দেওয়া হয়; এরপর গর্ভপাত করা নিঃসন্দেহে হত্যার সমান — সম্পূর্ণ হারাম।
- ১২০ দিনের আগে, যদি কোনো শরীয়তসম্মত ওজর (যেমন মায়ের জীবননাশের আশঙ্কা, প্রমাণিত মারাত্মক রোগ ইত্যাদি) না থাকে, তাহলেও গর্ভপাত করা জায়েয নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ خَشْيَةَ إِمْلَاقٍ ۖ نَّحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُمْ
"তোমরা দারিদ্র্যের ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না; আমিই তাদের রিযিক দিই এবং তোমাদেরও।" — (সূরা আল-ইসরা: ৩১)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ
"আল্লাহ যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন, তোমরা তাকে হত্যা করো না — হক ছাড়া।" — (সূরা আল-আনআম: ১৫১)
৩. হানাফী ফিকহের দলিল
-
আল-হিদায়া ও রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)-এ উল্লেখ আছে যে, গর্ভস্থ সন্তানও একটি জীবিত সত্তা; তা নষ্ট করা জায়েয নয়। ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) বলেন, বিনা ওজরে গর্ভপাত করা হারাম, এবং এতে দিয়াত বা কাফফারা ওয়াজিব হওয়ার কথা আলোচিত হয়েছে।
-
ফাতাওয়া আলমগিরি-তে এসেছে: "إذا ألقت المرأة ما لم يخلق منه شيء فلا شيء عليها، وإن ألقت مضغة أو علقة فعليها..." — অর্থাৎ গর্ভের সৃষ্টি নষ্ট করা গুরুতর অপরাধ।
-
ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি দা.বা.)-তে স্পষ্ট করা হয়েছে: আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি সত্ত্বেও, শুধু সামাজিক বা পারিবারিক কারণে গর্ভপাত করা জায়েয নয়; কেবল মায়ের জীবন রক্ষার জন্য নির্ভরযোগ্য মুসলিম বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সিদ্ধান্তে তা অনুমোদিত হতে পারে।
-
ইমদাদুল ফাতাওয়া (হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী রহ.)-তেও গর্ভপাতকে নিষিদ্ধ বলা হয়েছে।
৪. আপনার বোনের করণীয়
- গর্ভপাত করাবেন না — এটি হারাম ও গুরুতর গুনাহ।
- ইদ্দত পূর্ণ করবেন — সন্তান প্রসব পর্যন্ত।
- সাবেক স্বামীকে জানাবেন — সন্তান তারই; শরীয়ত অনুযায়ী সন্তানের ভরণপোষণ (নফাকা) ও লালন-পালনের দায়িত্ব পিতার।
- ধৈর্য ও তাওয়াক্কুল — আল্লাহ তাআলা বলেন: "যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং এমন জায়গা থেকে রিযিক দেন যা সে কল্পনাও করে না।" (সূরা আত-তালাক: ২-৩)
- পরিবারের সহযোগিতা নিন — সন্তান লালন-পালনে পরিবারের সবাই সহযোগিতা করবেন; এতে কোনো দোষ নেই।
৫. বিশেষ সতর্কতা
- যদি মায়ের জীবননাশের প্রকৃত আশঙ্কা থাকে, তবে নির্ভরযোগ্য মুসলিম ডাক্তারের পরামর্শে এবং স্থানীয় মুফতির সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে — নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।
- শুধু "ডিভোর্স হয়ে গেছে" বা "সামাজিক সমস্যা হবে" — এই ধরনের কারণে গর্ভপাত করা কোনোভাবেই জায়েয নয়।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | হুকুম | |---|---| | তালাকের পর ইদ্দত | সন্তান প্রসব পর্যন্ত চলবে | | গর্ভপাত (বিনা ওজরে) | হারাম | | ১২০ দিনের পর গর্ভপাত | হত্যার সমান — কঠোরভাবে হারাম | | সন্তানের নসব | সাবেক স্বামীর সাথে প্রমাণিত | | সন্তানের নফাকা | পিতার দায়িত্ব | | ওজর থাকলে | নির্ভরযোগ্য ডাক্তার ও মুফতির পরামর্শে |
আল্লাহ তাআলা আপনার বোনকে ধৈর্য দান করুন এবং এই সন্তানকে তার জন্য রহমত বানিয়ে দিন। আমিন।
রেফারেন্স: সূরা আত-তালাক: ৪, ২-৩; সূরা আল-ইসরা: ৩১; সূরা আল-আনআম: ১৫১; আল-হিদায়া; রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন); ফাতাওয়া আলমগিরি; ফাতাওয়া উসমানি; ইমদাদুল ফাতাওয়া; বেহেশতী জেওর।
والله أعلم بالصواب