পিতার দায়িত্বহীনতা ও জুলুমের জন্য সন্তানের করনীয়
Family Life · Hanafi
Question
Answer
পিতার দায়িত্বহীনতা ও জুলুমের জন্য সন্তানের করণীয়
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারীর বাবা দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক নির্যাতন, ভরণপোষণে অবহেলা, সন্তানদের শিক্ষার খরচ না দেওয়া, মায়ের প্রতি দুর্ব্যবহার ও হাত তোলার মতো গুরুতর জুলুম করে আসছেন। প্রশ্নকারী জানতে চান—আম্মু ও ভাইদের নিয়ে নানুবাড়ি চলে যাওয়া কি শরীয়তসম্মত হবে?
শরীয়তের দৃষ্টিতে পিতার অধিকার ও সন্তানের দায়িত্ব
১. পিতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব
ইসলামে পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا
"তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।" — (সূরা বনী ইসরাইল: ২৩)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
رِضَا الرَّبِّ فِي رِضَا الْوَالِدِ، وَسَخَطُ الرَّبِّ فِي سَخَطِ الْوَالِدِ
"প্রভুর সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টিতে এবং প্রভুর অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টিতে।" — (তিরমিযী: ১৮৯৯)
তবে ইসলাম পিতার জুলুম সহ্য করতে বাধ্য করেনি; বরং জুলুমের প্রতিরোধ ও আত্মরক্ষার অনুমতি দিয়েছে।
২. পিতার জুলুমের সীমা
আপনার বাবার আচরণ স্পষ্টতই জুলুমের অন্তর্ভুক্ত:
- শারীরিক নির্যাতন — শৈশবে গলা টিপে ধরা, বর্তমানে হাত তোলা
- ভরণপোষণে অবহেলা — সন্তানদের শিক্ষা ও খরচ চালান না
- মায়ের প্রতি দুর্ব্যবহার — গায়ে হাত তোলা, ডিভোর্সের হুমকি
- সম্পদ অপচয় — জমি-জমা চাচার হাতে ছেড়ে দেওয়া, নিজের পরিবারকে বঞ্চিত করা
৩. ভরণপোষণ (নাফাকা) পিতার উপর ওয়াজিব
হানাফী মাযহাব অনুযায়ী, সন্তানের ভরণপোষণ পিতার উপর ওয়াজিব। ইমাম সারাখসী (রহ.) বলেন:
وَنَفَقَةُ الْوَلَدِ عَلَى الْأَبِ
"সন্তানের ভরণপোষণ পিতার দায়িত্ব।" — (আল-মাবসূত, খণ্ড ৫, পৃ. ২১৮)
ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) লিখেন:
وَتَلْزَمُ الْأَبَ نَفَقَةُ وَلَدِهِ الصَّغِيرِ وَالْمَعْتُوهِ وَالْأُنْثَى حَتَّى تَتَزَوَّجَ
"পিতার উপর ওয়াজিব তার নাবালেগ সন্তান, পাগল সন্তান এবং কন্যার ভরণপোষণ—যতক্ষণ না সে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ৬১৭)
আপনার বাবা এই দায়িত্ব পালন না করে গুনাহগার হচ্ছেন।
নানুবাড়ি চলে যাওয়ার বিধান
১. মায়ের জন্য আলাদা থাকার অনুমতি
হানাফী ফিকহ অনুযায়ী, স্বামী যদি স্ত্রীর প্রতি জুলুম করে, ভরণপোষণ না দেয়, শারীরিক নির্যাতন করে—তাহলে স্ত্রী তার পিতার ঘরে বা নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে পারেন। ইমাম তাহাবী (রহ.) বর্ণনা করেন:
لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ
"সৃষ্টির আনুগত্য নেই স্রষ্টার অবাধ্যতার ক্ষেত্রে।" — (শরহু মাআনিল আসার)
আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন:
"স্বামী যদি স্ত্রীর প্রতি জুলুম করে এবং তার জীবন-যৌবন বিপন্ন হয়, তবে স্ত্রীর জন্য পিতার ঘরে চলে যাওয়া জায়েয।" — (বেহেশতী জেওর, খণ্ড ৭)
২. সন্তানদের মায়ের সাথে যাওয়া
সন্তানরা যদি নাবালেগ হয়, তবে মায়ের সাথে থাকা তাদের জন্য জায়েয। বালেগ সন্তানদের ক্ষেত্রে:
- যদি পিতার ঘরে থাকলে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের আশঙ্কা থাকে
- যদি দ্বীন ও আখলাক নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে
- যদি মায়ের নিরাপত্তার জন্য উপস্থিত থাকা প্রয়োজন হয়
তাহলে সন্তানদের জন্য মায়ের সাথে যাওয়া জায়েয, বরং কখনো কখনো কর্তব্য।
৩. পিতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা যাবে কি?
না। পিতার জুলুম সত্ত্বেও তার সাথে সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন করা জায়েয নয়। তবে—
- শারীরিক দূরত্ব রাখা যাবে (আলাদা বাসা)
- নির্যাতন প্রতিরোধ করা যাবে
- প্রয়োজনীয় সীমা পর্যন্ত কথা বলা যাবে
- সালাম-সম্ভাষণ চালু রাখা উচিত
- দুআ করা উচিত তার হেদায়াতের জন্য
আল্লাহ বলেন:
وَإِن جَاهَدَاكَ عَلَىٰ أَن تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا ۖ وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا
"যদি তারা তোমাকে আমার সাথে শিরক করতে বাধ্য করে, তবে তাদের আনুগত্য করো না; তবে দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ভাব রক্ষা করো।" — (সূরা লুকমান: ১৫)
সিদ্ধান্ত ও করণীয়
চলে যাওয়া কি ঠিক হবে?
পরিস্থিতি বিবেচনায়—
| শর্ত | বিধান | |------|--------| | শারীরিক নির্যাতনের আশঙ্কা | চলে যাওয়া জায়েয | | মায়ের জীবন-যৌবন বিপন্ন | চলে যাওয়া জায়েয | | দ্বীন-আখলাক নষ্ট হওয়ার ভয় | চলে যাওয়া জায়েয | | শুধু মন খারাপ বা অভিমান | চলে যাওয়া উচিত নয় |
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী—শারীরিক নির্যাতন, মায়ের প্রতি হাত তোলা, ভরণপোষণে চরম অবহেলা, শিক্ষার খরচ না দেওয়া—এসব কারণে আম্মু ও ভাইদের নিয়ে নানুবাড়ি চলে যাওয়া শরীয়তসম্মত।
করণীয়
১. আগে স্থানীয় মুফতি/আলেমের সাথে পরামর্শ করুন — পরিস্থিতি সরাসরি জানিয়ে ফতোয়া নিন।
২. মায়ের সম্মতি নিন — মা রাজি থাকলে তবেই চলে যান।
৩. পিতার সাথে সম্পর্ক রাখুন — সালাম, খোঁজখবর, দুআ চালু রাখুন।
৪. পিতার জন্য দুআ করুন — হেদায়াতের জন্য।
৫. নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন — কোথায় থাকবেন, খরচ কীভাবে চলবে—পরিকল্পনা করুন।
৬. পিতার সম্পত্তির হিসাব — পিতার সম্পত্তিতে আপনার ও ভাইদের হক আছে। চাচার হাতে সব ছেড়ে দেওয়া শরীয়তসম্মত নয়। প্রয়োজনে শরীয়তসম্মত উপায়ে হক আদায়ের চেষ্টা করুন।
৭. ডিভোর্সের বিষয় — মা যদি ডিভোর্স চান, তবে শরীয়তসম্মত পন্থায় (কাজী/আদালতের মাধ্যমে) খুলআ বা ডিভোর্সের ব্যবস্থা নিন।
সতর্কতা
- পিতাকে গালি দেওয়া, অভিশাপ দেওয়া, জানাজায় না যাওয়ার বদদুআ করা—এসব নাজায়েয।
- পিতার জুলুমের কারণে তার প্রতি ঘৃণা স্বাভাবিক, তবে আনুগত্য পরিত্যাগ করা যাবে না যেখানে শরীয়তের নির্দেশ নেই।
- সবর করুন, আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করুন। আল্লাহ জালিমের হিসাব নেবেন।
وَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلًا عَمَّا يَعْمَلُ الظَّالِمُونَ
"জালিমরা যা করে, আল্লাহকে তা সম্পর্কে গাফেল মনে করো না।" — (সূরা ইবরাহীম: ৪২)
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।