স্ত্রীর অধিকার ও হক: ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে।

Family Life · Hanafi

Question No: 5511
Questioner: Suraia Shova
Question Asked: 15 Sep 2026, 07:04 PM
Reviewed & Published: 15 Sep 2026, 07:33 PM
Views: 14
Tokens: 7,270
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

বিয়ের দুইবছরে স্বামীর পরিবারের কেউ বউয়ের কী লাগবে না লাগবে না তার খোঁজ নয় আর না ভরণপোষণের দায়িত্ব কারো আছে।
স্বামীর চাকরি না থাকা অবস্থায় খারাপ সময়েও কারোর মানবতাও দেখতে পাইনি।
অনেক কথা শোনার মধ্যে দিয়ে আজ এতদূর...
সেই সময় আমার স্বামীর মেন্টাল সাপোর্টার ছিলাম। প্রয়োজনেও কখনও তার থেকে কোনো খরচ নেইনি... জুলুম করিনি হকের জন্য।

আজ তার টাকা পয়সা হয়েছে...সে আমার সব অবদাম স্বীকার করে।
ইসলামের শরিয়তের বাকি সব জ্ঞান দেওয়া...হাদিস শোনানো স্ত্রীর কি কি করা উচিত এই বিষয়ে
কোনো সমস্যা নেই তাতে তার
আর আমি তার অবাধ্য হয়ে চলিও না।

গতকাল একটা কথা বলায় আমার ওপর মন ভারী করে রেখেছে আর তা হল " স্ত্রী চাইলে তার স্বামীর থেকে প্রাপ্য চাহিদা আদায় করে নিতে পারে এবং স্বামী তা দিতে বাধ্য। "

এটার জন্য সে তার পরিবারের জন্যখরচ করা যে অনেক বেশি সোয়াবের তা তুলনা দিয়ে পোস্ট শেয়ার করে রেখেছে।

আসলেই বউয়ের অধিকার আর হক কী?
আমি জানতে চাই

Answer

স্ত্রীর অধিকার ও হক: ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে বিস্তারিত উত্তর

উত্তর:

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, যিনি নারী-পুরুষ উভয়ের অধিকার নির্ধারণ করে দিয়েছেন। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর উপর, যিনি স্ত্রীদের অধিকারের ব্যাপারে সর্বোত্তম আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছেন।

১. স্ত্রীর মৌলিক অধিকারসমূহ (হক)

ইসলামী শরীয়তে স্ত্রীর স্বামীর উপর কতগুলো অবশ্যপালনীয় হক (حقوق واجبة) রয়েছে। এগুলো কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমায়ে উম্মত দ্বারা প্রমাণিত:

(ক) ভরণপোষণ (نفقة) — খাওয়া, পোশাক, বাসস্থান

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَعَلَى الْمَوْلُودِ لَهُ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ "সন্তানের পিতার দায়িত্ব হলো প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী তাদের (মায়েদের) খাওয়া-পোশাকের ব্যবস্থা করা।" — (সূরা বাকারা: ২৩৩)

لِيُنفِقْ ذُو سَعَةٍ مِّن سَعَتِهِ ۖ وَمَن قُدِرَ عَلَيْهِ رِزْقُهُ فَلْيُنفِقْ مِمَّا آتَاهُ اللَّهُ "সামর্থ্যবান ব্যক্তি তার সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে, আর যার রিযিক সংকুচিত করা হয়েছে সে আল্লাহ যা দিয়েছেন তা থেকেই ব্যয় করবে।" — (সূরা তালাক: ৭)

রাসূলুল্লাহ ﷺ হজ্জাতুল বিদায়ের খুতবায় বলেছেন:

فَاتَّقُوا اللَّهَ فِي النِّسَاءِ، فَإِنَّكُمْ أَخَذْتُمُوهُنَّ بِأَمَانِ اللَّهِ... وَلَهُنَّ عَلَيْكُمْ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ "নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো... তাদের উপর তোমাদের দায়িত্ব হলো প্রচলিত নিয়মে তাদের খাওয়া ও পোশাকের ব্যবস্থা করা।" — (সহীহ মুসলিম: ১২১৮; সহীহ বুখারী: ১৭৩৯)

হানাফী ফিকহের সিদ্ধান্ত: স্ত্রীর ভরণপোষণ দেওয়া স্বামীর উপর ওয়াজিব (অবশ্য কর্তব্য)। এটি কোনো দান বা অনুগ্রহ নয়, বরং ঋণসদৃশ দায়িত্ব। — (রাদ্দুল মুহতার: ৩/৫৭২; ফাতাওয়া আলমগীরী: ১/৫৪৮; আল-হিদায়া: ২/৩৫০)

(খ) ভরণপোষণের শর্ত

হানাফী মাযহাব অনুযায়ী ভরণপোষণ ওয়াজিব হওয়ার শর্ত:

  1. বৈধ বিবাহ হওয়া
  2. স্ত্রী স্বামীর ঘরে অবস্থান করা (বা স্বামীর অনুমতিক্রমে অন্যত্র থাকা)

স্বামীর চাকরি না থাকা অবস্থায়, আপনি তখন স্বেচ্ছায় সহযোগিতা করেছেন — এটি আপনার ইহসান ও সওয়াবের কাজ, কিন্তু শরীয়তগত বাধ্যবাধকতা ছিল না।

(গ) স্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার

وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ "নারীদেরও পুরুষদের উপর ন্যায়সংগত অধিকার রয়েছে, যেমন পুরুষদেরও নারীদের উপর রয়েছে।" — (সূরা বাকারা: ২২৮)

স্ত্রীর নিজের সম্পদ, মোহর, উত্তরাধিকার — সবই তার একান্ত। স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির কেউ তার সম্পদে জোরপূর্বক হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। — (রাদ্দুল মুহতার: ৩/১৭০)

(ঘ) সদাচরণ ও সম্মান

وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ "তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" — (সূরা নিসা: ১৯)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সে, যে তার পরিবারের প্রতি সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের প্রতি তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।" — (সুনানে তিরমিযী: ৩৮৯৫; ইবনে মাজাহ: ১৯৭৭)

(ঙ) স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিবাহ নিষিদ্ধ নয়, তবে...

হানাফী মাযহাব অনুযায়ী স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিবাহ বৈধ, তবে বিনা কারণে দ্বিতীয় বিবাহ করা মাকরূহে তাহরীমী এবং প্রথম স্ত্রীর হক নষ্ট করা হলে তা গুনাহ। — (রাদ্দুল মুহতার: ৪/১৭৫)

২. আপনার প্রশ্নের নির্দিষ্ট বিষয়সমূহের বিশ্লেষণ

(ক) "স্ত্রী চাইলে স্বামীর থেকে প্রাপ্য চাহিদা আদায় করে নিতে পারে এবং স্বামী তা দিতে বাধ্য"

এই কথাটি শর্তসাপেক্ষে সঠিক:

  • যদি স্বামী সামর্থ্যবান হয় এবং স্ত্রী স্বামীর ঘরে অবস্থান করে — তাহলে হ্যাঁ, স্ত্রী তার ভরণপোষণ (খাওয়া, পোশাক, বাসস্থান) দাবি করতে পারে এবং স্বামী তা দিতে বাধ্য। — (রাদ্দুল মুহতার: ৩/৫৭২; ফাতাওয়া উসমানী: ২/৩৩৫)

  • যদি স্বামী অভাবী হয় — তাহলে সে বাধ্য নয়, বরং সামর্থ্য অর্জন পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। — (আল-হিদায়া: ২/৩৫০; ফাতাওয়া আলমগীরী: ১/৫৪৮)

  • তবে স্ত্রী চাইলে স্বামীর কাছ থেকে অতিরিক্ত কিছু (যেমন বিলাসদ্রব্য, দামী পোশাক, গহনা) দাবি করতে পারে না — এগুলো ভরণপোষণের অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং স্বামীর স্বেচ্ছা ও সামর্থ্যের বিষয়। — (ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/৫৪৯)

মুফতি তাকি উসমানী (দা.বা.) বলেন: "স্ত্রীর ভরণপোষণ হলো খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থান — যা প্রচলিত নিয়মে (معروف) নির্ধারিত হয়। এর বাইরে অতিরিক্ত দাবি করা স্ত্রীর হক নয়।" — (ফাতাওয়া উসমানী: ২/৩৩৬)

(খ) "স্বামী তার পরিবারের জন্য খরচ করলে অনেক বেশি সওয়াব"

এটি সঠিক, তবে শর্তসহ:

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

دِينَارٌ أَنْفَقْتَهُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، وَدِينَارٌ أَنْفَقْتَهُ فِي رَقَبَةٍ، وَدِينَارٌ تَصَدَّقْتَ بِهِ عَلَى مِسْكِينٍ، وَدِينَارٌ أَنْفَقْتَهُ عَلَى أَهْلِكَ — أَعْظَمُهَا أَجْرًا الَّذِي أَنْفَقْتَهُ عَلَى أَهْلِكَ "এক দীনার আল্লাহর পথে খরচ করলে, এক দীনার দাসমুক্তিতে, এক দীনার মিসকিনকে দান করলে, আর এক দীনার নিজের পরিবারের উপর খরচ করলে — সর্বোচ্চ সওয়াব হলো সেই দীনারের, যা তুমি নিজের পরিবারের উপর খরচ করেছ।" — (সহীহ মুসলিম: ৯৯৫)

তবে লক্ষণীয়:

  • এখানে "أَهْل" (পরিবার) বলতে স্ত্রী-সন্তান প্রথমে অন্তর্ভুক্ত। — (শরহে মুসলিম, ইমাম নববী: ৭/৮১)
  • পিতা-মাতা, ভাই-বোনদের জন্য খরচ করাও সওয়াবের কাজ, তবে স্ত্রীর হক আদায়ের পর। — (রাদ্দুল মুহতার: ৩/৫৭৩)
  • স্ত্রীর হক নষ্ট করে পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য খরচ করলে তা সওয়াব নয়, বরং গুনাহ। — (ফাতাওয়া উসমানী: ২/৩৩৭)

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন: "স্বামীর উপর প্রথম দায়িত্ব হলো স্ত্রীর ভরণপোষণ। এরপর পিতা-মাতা, তারপর অন্যান্য আত্মীয়।" — (রাদ্দুল মুহতার: ৩/৫৭৩)

(গ) আপনার স্বামীর পোস্ট শেয়ার করা প্রসঙ্গে

আপনার স্বামী যদি "পরিবারের জন্য খরচ করলে বেশি সওয়াব" — এই হাদীস শেয়ার করে আপনার হক অস্বীকার করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেন, তাহলে এটি হাদীসের অপব্যবহার। কারণ:

  1. হাদীসে "أهل" বলতে স্ত্রী-সন্তান প্রথমে অন্তর্ভুক্ত।
  2. স্ত্রীর হক আদায় করা ফরজ, আর পরিবারের অন্যান্যদের জন্য খরচ করা নফল/মুস্তাহাব। ফরজ ত্যাগ করে নফলে লিপ্ত হওয়া শরীয়তের দৃষ্টিতে ভুল।
  3. আপনার স্বামী যদি এখন সামর্থ্যবান হন, তাহলে আপনার ভরণপোষণ দেওয়া তার উপর ওয়াজিব। আপনি যদি এখন পর্যন্ত না নিয়ে থাকেন, তাহলে আপনি হক ছেড়ে দিয়েছেন — এটি আপনার ইহসান, কিন্তু শরীয়ত আপনাকে তা দিতে বাধ্য করেনি।

মনে রাখবেন: আপনি আগে স্বামীর আর্থিক সংকটে সহযোগিতা করেছেন — এটি আপনার ইহসান ও সওয়াবের কাজ। কিন্তু এখন স্বামী সামর্থ্যবান হলে আপনার হক আদায় করা তার দায়িত্ব। আপনি চাইলে তা দাবি করতে পারেন, অথবা ছেড়ে দিয়ে সওয়াবের অংশীদার হতে পারেন — উভয়টিই আপনার অধিকার।

৩. স্ত্রীর কর্তব্য (যা আপনার উপর ওয়াজিব)

আপনি লিখেছেন "আমি তার অবাধ্য হয়ে চলিও না" — আলহামদুলিল্লাহ, এটি প্রশংসনীয়। স্ত্রীর কর্তব্য:

  1. স্বামীর আনুগত্য (নাফরমানি না করা) — (সূরা নিসা: ৩৪)
  2. স্বামীর সম্পদ ও সম্মান রক্ষা — (সূরা নিসা: ৩৪)
  3. সদাচরণ ও ধৈর্য — (সূরা বাকারা: ২২৮)
  4. স্বামীর পরিবারের প্রতি সম্মান — তবে তাদের জুলুম সহ্য করা ওয়াজিব নয়

ইমাম গাজালী (রহ.) বলেন: "স্ত্রীর জন্য স্বামীর আনুগত্য ওয়াজিব, তবে গুনাহের কাজে আনুগত্য নয়। আর স্বামীর আত্মীয়দের জুলুম সহ্য করা স্ত্রীর উপর ওয়াজিব নয়।" — (ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন: ২/৩৫)

৪. আপনার পরিস্থিতির জন্য বিশেষ পরামর্শ

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:

  1. বিয়ের প্রথম দুই বছর: স্বামী অভাবী ছিলেন, আপনি স্বেচ্ছায় সহযোগিতা করেছেন — এটি আপনার ইহসান। শ্বশুরবাড়ির কেউ খোঁজ না নেওয়া তাদের দোষ, তবে তারা আপনার ভরণপোষণ দিতে বাধ্য নয় — এটি স্বামীর দায়িত্ব। — (রাদ্দুল মুহতার: ৩/৫৭৩)

  2. এখন স্বামী সামর্থ্যবান: আপনার ভরণপোষণ দেওয়া তার ওয়াজিব দায়িত্ব। আপনি চাইলে তা দাবি করতে পারেন।

  3. স্বামীর পরিবারের জন্য খরচ: এটি সওয়াবের কাজ, তবে আপনার হক আদায়ের পর। আপনার হক নষ্ট করে তাদের জন্য খরচ করলে তা শরীয়তসম্মত নয়।

  4. আপনার 감정 (মন ভারী হওয়া): আপনার অনুভূতি বৈধ। আপনি আপনার হক সম্পর্কে জানতে চাওয়া আপনার শরীয়তগত অধিকার

  5. সমাধানের পথ:

    • স্বামীর সাথে শান্তিপূর্ণ আলোচনা করুন।
    • আপনার হক (খাওয়া, পোশাক, বাসস্থান) সম্পর্কে স্পষ্টভাবে জানান।
    • প্রয়োজনে পরিবারের বড়দের বা বিশ্বস্ত আলেমের মধ্যস্থতা নিন।
    • ধৈর্য ও দুআ অবলম্বন করুন — আল্লাহ তাআলা বলেন: وَاصْبِرُوا ۚ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ (সূরা আনফাল: ৪৬)

৫. সারসংক্ষেপ

| বিষয় | হুকুম | |------|-------| | স্ত্রীর ভরণপোষণ (খাওয়া, পোশাক, বাসস্থান) | স্বামীর উপর ওয়াজিব | | স্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্পদ | সম্পূর্ণ স্ত্রীর অধিকার | | সদাচরণ ও সম্মান | স্বামীর উপর ওয়াজিব | | পরিবারের জন্য খরচ | সওয়াবের কাজ, তবে স্ত্রীর হক আদায়ের পর | | স্ত্রীর হক দাবি করা | বৈধ অধিকার (সামর্থ্যবান স্বামীর ক্ষেত্রে) | | স্ত্রীর হক ছেড়ে দেওয়া | ইহসান ও সওয়াবের কাজ |

মুফতি মুহাম্মাদ শফী (রহ.) বলেন: "স্ত্রীর হক আদায় করা স্বামীর উপর ফরজ। এটি কোনো দান নয়, বরং দায়িত্ব। আর স্ত্রী যদি স্বেচ্ছায় ছেড়ে দেয়, তবে তা তার ইহসান।" — (মাআরিফুল কুরআন: ১/৫৬৭)

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হক আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.