মানুষের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দান করা যাবে কী?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
১. উস্তাদ মানুষের প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ তো আমানত।অনেক সময় ডাক্তাররা কিডনী পেসেন্টকে কীডনী ট্রান্সপ্ল্যান্ট করতে বলে।আর পেসেন্টের বাবা মা বা ভাই বা নিকট আত্নীয় তাদের থেকে একটা কীডনী দান করেন।এভাবে রোগী আরো বেশি কিছুদিন বাঁচে।
আমার প্রশ্ন হলো এক্ষেত্রে কি কিডনী দেয়া যাবে?অনেকে তো মারা যাওয়ার আগে আবার তাদের চোখ,কীডনী দান করে রেখে যায়। এক্ষেত্রে বিধান কী?
২.আমার হায়েজের সময় তিনদিন ব্লিডিং হয়।তারপর তিন /চারদিন কোনো ব্লিডিং হয় না। কিন্তু ভেতরে টিস্যু দিলে লাল লাল স্রাব আসে।এরকম তিন চারদিন থাকে।
তাহলে এই কয়দিন কি আমার হয়েজের দিনগুলোর মধ্যে পড়বে নাকি?
3.আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহ বলার পর ওয়া মাগফিরতুহু ওয়া জান্নাতুহু বললে কি বিদআত হবে??
Answer
উত্তর
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ
প্রশ্ন ১: অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান করা (কিডনি, চোখ ইত্যাদি) সম্পর্কে বিধান
১. মানবদেহের সম্মান (হুরমাত): আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ "নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে সম্মানিত করেছি।" (সূরা বনী ইসরাইল: ৭০)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
كَسْرُ عَظْمِ الْمَيِّتِ كَكَسْرِ عَظْمِ الْحَيِّ "মৃত ব্যক্তির হাড় ভাঙা জীবিত ব্যক্তির হাড় ভাঙার মতোই (গুনাহ)।" (সুনানে আবু দাউদ: ৩২০৭)
২. হানাফি ফিকহের মূলনীতি:
- মানবদেহ কোনো সম্পদ (মাল) নয়, বরং তা আমানত।
- জীবিত অবস্থায় নিজের অঙ্গ কেটে অন্যের শরীরে লাগানো মূলত জায়েজ নয়, কারণ এতে নিজের দেহকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়।
মৃত্যুর পর অঙ্গ দান:
- মৃত ব্যক্তির অঙ্গ কাটা মূলত জায়েজ নয়
ফতোয়া আলমগিরি ও রাদ্দুল মুহতারে:
لَا يَجُوزُ الِانْتِفَاعُ بِأَعْضَاءِ الْآدَمِيِّ لِأَنَّهُ مُكَرَّمٌ "মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা উপকৃত হওয়া জায়েজ নয়, কারণ সে সম্মানিত।"
প্রশ্ন ২: হায়েজের সময় ব্লিডিং বন্ধ কিন্তু ভেতরে টিস্যুতে লাল স্রাব
সংক্ষিপ্ত উত্তর: হ্যাঁ, এই দিনগুলোও হায়েজের দিনের মধ্যে গণ্য হবে, যদি তা হায়েজের সর্বনিম্ন সময়সীমার (৩ দিন) মধ্যে থাকে এবং ১০ দিনের বেশি না হয়।
বিশ্লেষণ:
হানাফি ফিকহে হায়েজের মূলনীতি:
- হায়েজের সর্বনিম্ন সময়: ৩ দিন ৩ রাত
- সর্বোচ্চ সময়: ১০ দিন ১০ রাত
- দুই হায়েজের মাঝে সর্বনিম্ন পবিত্রতার সময়: ১৫ দিন
গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা: হায়েজের সময় রক্ত বের হওয়া শর্ত নয়; বরং রক্তের স্রাব (discharge) থাকলেই হায়েজ গণ্য হয়। যদি ভেতরে টিস্যু দিলে লাল স্রাব আসে, তবে তা হায়েজের রক্ত হিসেবে গণ্য হবে।
ফতোয়া শামি (রাদ্দুল মুহতার) ও ফতোয়া আলমগিরিতে:
وَالْحَيْضُ هُوَ الدَّمُ الَّذِي يَخْرُجُ مِنْ رَحِمِ الْمَرْأَةِ "হায়েজ হলো সেই রক্ত যা নারীর জরায়ু থেকে বের হয়।"
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত: যদি কোনো নারী ৩ দিন রক্ত দেখেন, তারপর ৩-৪ দিন রক্ত বন্ধ থাকে কিন্তু ভেতরে টিস্যুতে লাল স্রাব থাকে—তাহলে পুরো সময়টাই হায়েজ হিসেবে গণ্য হবে, যদি মোট সময় ১০ দিনের মধ্যে থাকে।
শর্ত:
- মোট সময় ১০ দিনের বেশি হলে, ১০ দিন হায়েজ এবং বাকি দিন ইস্তিহাজা (অসুস্থতার রক্ত)।
- যদি ৩ দিনের কম হয়, তবে তা হায়েজ নয়।
সিদ্ধান্ত: আপনার ক্ষেত্রে—৩ দিন ব্লিডিং + ৩/৪ দিন লাল স্রাব (টিস্যুতে)—মোট ৬/৭ দিন। এটি হায়েজের মধ্যেই পড়বে। এই দিনগুলোতে নামাজ, রোজা, কুরআন তিলাওয়াত, সহবাস—সবই নিষিদ্ধ থাকবে।
প্রশ্ন ৩: "ওয়া মাগফিরাতুহু ওয়া জান্নাতুহু" বলা কি বিদআত?
সালামের সঠিক পদ্ধতি: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
إِذَا سَلَّمَ عَلَيْكُمْ أَحَدٌ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ فَقُولُوا: وَعَلَيْكُمْ "আহলে কিতাবের কেউ সালাম দিলে তোমরা বলো: ওয়া আলাইকুম।" (সহিহ বুখারি: ৬২৫৮)
সাহাবায়ে কেরামের আমল: আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত—তিনি বলতেন:
السَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ "আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।"
"ওয়া মাগফিরাতুহু" সম্পর্কে:
- কিছু রেওয়াতে "ওয়া মাগফিরাতুহু" বর্ণিত আছে, তবে তা সালামের উত্তর হিসেবে নয়, বরং স্বতন্ত্রভাবে।
- "ওয়া জান্নাতুহু"—এটি কোনো সহিহ হাদিসে সালামের উত্তর হিসেবে প্রমাণিত নয়।
ফতোয়া শামি ও ফতোয়া আলমগিরি:
وَالسُّنَّةُ فِي السَّلَامِ أَنْ يَقُولَ: السَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ "সালামের সুন্নত পদ্ধতি হলো: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ বলা।"
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
وَزِيَادَةُ "وَمَغْفِرَتُهُ" أَوْ "وَجَنَّتُهُ" لَمْ تُثْبَتْ فِي السُّنَّةِ "ওয়া মাগফিরাতুহু বা ওয়া জান্নাতুহু—এগুলো সুন্নতে প্রমাণিত নয়।"
সিদ্ধান্ত:
- "ওয়া মাগফিরাতুহু ওয়া জান্নাতুহু" বলা এদিকে কেউ যদি ছওয়াবের বিষয় মনে করে বা দ্বীনের অংশ মনে করে তাহলে বিদআত হবে।