তাহাজ্জুদ নামায পড়ার নিয়ম কি
Salah-Prayer · Hanafi
Question
Answer
তাহাজ্জুদ নামায পড়ার নিয়ম
ভূমিকা
তাহাজ্জুদ হলো রাতের শেষ প্রহরে (ইশার পর থেকে সুবহে সাদিকের পূর্ব পর্যন্ত, বিশেষত রাতের শেষ তৃতীয়াংশে) ঘুম থেকে উঠে পড়া নফল নামায। এটি অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ ইবাদত। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمِنَ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ نَافِلَةً لَّكَ عَسَىٰ أَن يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحْمُودًا
"আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ পড়ুন, এটি আপনার জন্য অতিরিক্ত (নফল); আশা করা যায় আপনার প্রতিপালক আপনাকে মাকামে মাহমুদে (প্রশংসিত স্থানে) প্রতিষ্ঠিত করবেন।" — (সূরা বনী ইসরাইল: ৭৯)
তাহাজ্জুদের সময়
তাহাজ্জুদের সময় শুরু হয় ইশার নামাযের পর এবং শেষ হয় সুবহে সাদিক (ফজরের ওয়াক্ত শুরু) হওয়ার পূর্বে। তবে সর্বোত্তম সময় হলো রাতের শেষ তৃতীয়াংশ। হাদীসে এসেছে, আল্লাহ তাআলা প্রতি রাতে রাতের শেষ তৃতীয়াংশে দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং বলেন:
"কে আছে যে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আছে যে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দান করব? কে আছে যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব?" — (সহীহ বুখারী: ১১৪৫, সহীহ মুসলিম: ৭৫৮)
নামাযের রাকআত সংখ্যা
তাহাজ্জুদ নামাযের নির্দিষ্ট কোনো রাকআত সংখ্যা নেই। রাসূলুল্লাহ ﷺ সাধারণত ৮ থেকে ১২ রাকআত পড়তেন। কমপক্ষে ২ রাকআত পড়া যায়। তবে সর্বোচ্চ কোনো সীমা নেই। সাধারণত ২ রাকআত করে পড়া উত্তম।
হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ রাতে ১১ রাকআত পড়তেন (তাহাজ্জুদ ও বিতরসহ)। — (সহীহ বুখারী: ১১৪৭)
তাহাজ্জুদ নামাযের নিয়ম (ধাপে ধাপে)
১. নিয়ত (মনে সংকল্প করা)
নিয়ত অর্থ মনের ইচ্ছা ও সংকল্প। মুখে আরবিতে বলা জরুরি নয়; বরং অন্তরে সংকল্প করাই যথেষ্ট। মনে এই ইচ্ছা করবে যে—
"আমি কেবলামুখী হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুই রাকআত তাহাজ্জুদ নামায আদায় করছি।"
উল্লেখ্য: নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা সুন্নত নয়; অন্তরের সংকল্পই যথেষ্ট। (রাদ্দুল মুহতার: ১/৪৪৩)
২. তাকবীরে তাহরীমা
"আল্লাহু আকবার" বলে নামায শুরু করবে, হাত কান পর্যন্ত উঠাবে।
৩. ছানা পড়া
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَتَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَالَى جَدُّكَ وَلَا إِلَهَ غَيْرُكَ
৪. তাআউউয ও তাসমিয়া
أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
৫. সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা
সূরা ফাতিহার পর যে কোনো সূরা বা কমপক্ষে তিন আয়াত পড়বে। তাহাজ্জুদে দীর্ঘ কিরাআত পড়া উত্তম।
৬. রুকু, সিজদা ও অন্যান্য
সাধারণ নামাযের মতোই রুকু, সিজদা, তাশাহহুদ, দরুদ, দুআ ও সালাম। প্রতি দুই রাকআত পর তাশাহহুদ পড়ে সালাম ফিরিয়ে নতুন করে নিয়ত করে পরবর্তী দুই রাকআত পড়বে।
গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা
| বিষয় | বিধান | |------|------| | জামাআতে তাহাজ্জুদ | নফল নামায জামাআতে পড়া মাকরূহ (তবে রমযানে তারাবীহ ছাড়া) | | কাজা হওয়া তাহাজ্জুদ | পড়া উত্তম, তবে ফরয নয় | | ঘুম না ভাঙলে | তাহাজ্জুদ ছুটে গেলে গুনাহ নেই, তবে আফসোস করা উচিত | | তাহাজ্জুদের পর বিতর | যদি আগে বিতর পড়া না হয়, তাহলে তাহাজ্জুদের পর বিতর পড়বে | | কিরাআত | দীর্ঘ কিরাআত উত্তম, তবে বেশি দীর্ঘ করে কষ্ট না করা |
ফযীলত
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"রমযানের পর সর্বোত্তম রোযা হলো আল্লাহর মাস মুহাররমের রোযা, আর ফরয নামাযের পর সর্বোত্তম নামায হলো রাতের নামায (তাহাজ্জুদ)।" — (সহীহ মুসলিম: ১১৬৩)
"যে ব্যক্তি রাতে উঠে নামায পড়ে এবং নিজের স্ত্রীকেও জাগায়, তারা উভয়েই আল্লাহর যিকিরকারীদের অন্তর্ভুক্ত।" — (সুনানে আবু দাউদ: ১৩০৯)
উপসংহার
তাহাজ্জুদ নামায নফল হলেও এর ফযীলত অপরিসীম। নিয়ত অন্তরে করাই যথেষ্ট, মুখে বলা জরুরি নয়। দুই রাকআত করে পড়া উত্তম, তবে একসাথে চার রাকআতও পড়া যায়। রাতের শেষ তৃতীয়াংশে পড়া সর্বোত্তম। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাহাজ্জুদ পড়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।
📚 তথ্যসূত্র
- আল-কুরআন: সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত ৭৯
- সহীহ বুখারী: হাদীস ১১৪৫, ১১৪৭
- সহীহ মুসলিম: হাদীস ৭৫৮, ১১৬৩
- সুনানে আবু দাউদ: হাদীস ১৩০৯
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): ১/৪৪৩
- ফাতাওয়া উসমানী
- ইমদাদুল ফাতাওয়া
- বেহেশতী যেওর
- মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শাফী রহ.)