খাবার অন্য কে দেওয়া হালাল হবে কিনা
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
জন্য আমাদের হস্পিটালে আসছিলো। তো যাবতীয় হেল্প আমি
করছি আলহামদুলিল্লাহ। কোথাও ওনাদের টাইম ওয়েস্ট করতে
হয় নি। উনি আমার জন্য অনেক গুলো বিস্কুট চানাচুর কিনে
আনছেন। আমি রুমে আসার পর ক্ষুধা লাগায় অল্প কিছু খাইছি।
বাকিগুলো বয়ামে রাখছি। পরে খাইতে খাইতেই আমার মনে
পড়লো উনি ব্যাংকে জব করেন। এখন আর যাই হোক বাকি
খাবার গুলো আমি খাবো না ইনশাআল্লাহ এটা শিওর।
তাই চাচ্ছি আমার অন্য কোনো পরিচিত বোন কে এগুলো দিয়ে দিতে। সে অনেক হার্ড ওয়ার্কার & নিডি ও। নিজেই নিজের পড়াশোনার খরচ চালায়+বাসায় ও সাপোর্ট করে। আর সবার তো এতো নাস্তা পানি কিনে খাওয়ার সুযোগ হয় না।
তো এখন আমি জানতে চাচ্ছি ওকে এগুলো দেয়া জায়েজ হবে কিনা। কেননা আমি নিজের জন্য যেটা খাওয়া পছন্দ করছি না সেটা অন্যকে দেয়া ঠিক হবে কি? সে হয়তো এগুলো নিয়ে এতো কন্সার্ন না।
বরং এটা তো আমার দায়িত্ব যে অন্যদেরকেও এই বিষয়ে সচেতন করা যে আমাদের যদি জানা থাকে যে, অমুকের ইনকামের পুরোটা বা বেশিরভাগ হারাম তাহলে সেটা এভয়ড করা যেহেতু হালাল খাবার ইবাদত কবুল হওয়ার শর্ত।
অবশ্যই আমি কেন খাচ্ছি না সেটা ক্লিয়ারলি ওকে জানিয়েই দিবো & ওকেও এটা বলবো যে, তারও উচিত এ বিষয়ে সচেতন হওয়া, না খাওয়া
তো এই খাবার গুলো তো নষ্ট করা সমীচীন হবে না। আবার কিভাবে কাকে দিবো সে ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না
Answer
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
আপনার প্রশ্নের মূল বিষয়গুলো হলো:
- প্রেক্ষাপট: এক আত্মীয় (যিনি ব্যাংকে চাকরি করেন) তার মেয়ের দাঁতের চিকিৎসার জন্য আপনার হাসপাতালে এসেছিলেন। আপনি যাবতীয় সাহায্য করেছেন। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তিনি আপনাকে বিস্কুট-চানাচুর কিনে দিয়েছেন।
- সমস্যা: আপনি কিছু খেয়েছেন, বাকিটা বয়ামে রেখেছেন। পরে মনে পড়লো যে তিনি ব্যাংকে চাকরি করেন (যা ইসলামি দৃষ্টিতে সূদভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি হওয়ায় তার আয় সম্পূর্ণ হালাল নয়)। তাই বাকি খাবার আপনি খাবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
- প্রশ্নসমূহ:
- বাকি খাবার কি অন্য কোনো পরিচিত (নিঃস্বার্থ/নিম্ন আয়ের) বোনকে দেওয়া জায়েজ হবে?
- যে খাবার নিজে খেতে পছন্দ করছেন না, তা অন্যকে দেওয়া কি ঠিক?
- হারাম/সন্দেহজনক আয়ের বিষয়ে অন্যদের সচেতন করা কি আপনার দায়িত্ব?
- খাবার নষ্ট না করে কীভাবে এবং কাকে দেওয়া উচিত?
বিস্তারিত ফিকহি আলোচনা
আপনার জিজ্ঞাসিত বিষয়টির শরয়ী সমাধান হানাফী ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহের আলোকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বরসহ নিচে বিস্তারিত পেশ করা হলো:
১. ব্যাংক বা অধিকাংশ হারাম উপার্জনের ব্যক্তির হাদিয়ার শরয়ী বিধান:
ইসলামি শরীয়তের মূলনীতি হলো—কোনো ব্যক্তির আয়ের মূল উৎস যদি ব্যাংক (সুদী চাকরি) বা অধিকাংশ উপার্জন হারাম হয়, তবে তার দেওয়া হাদিয়া, উপহার বা খাবার গ্রহণ করা এবং তা খাওয়া শরীয়তের দৃষ্টিতে অনুমোদিত বা জায়েয নয় । তবে যদি সে সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করে যে এই খাদ্য বা উপহারটি তার হালাল কোনো ফান্ড (যেমন: নেওয়া ঋণ, আমানত বা ওয়ারিশ সূত্রে প্রাপ্ত টাকা) থেকে কেনা হয়েছে, তবেই কেবল তা খাওয়া জায়েয হবে।
- কিতাব ও পৃষ্ঠা সূত্র:
- দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা ১৯৯ (অধ্যায়: হারাম অর্থ-সম্পদ — অধিকাংশ হারাম উপার্জনের হাদিয়া ও দাওয়াতে অংশগ্রহণ)।
- ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১৮শ খণ্ড): পৃষ্ঠা ১৬২–১৬৪ ও ১৭২ (অধ্যায়: ব্যাংক ও সুদে জড়িত ব্যক্তির হাদিয়া ও খাবারের হুকুম) ।
২. নিজের জন্য না খাওয়া খাবার অন্যকে দেওয়া জায়েয কি না?
শরীয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি হলো— "الحرمة تتعدى في الأموال مع العلم بها" (অর্থাৎ, কোনো মাল হারাম বা নাজায়েয হওয়া সম্পর্কে জানা সত্ত্বেও তা অন্য কারো কাছে হস্তান্তর করা হলে তার হুরমত বা অনভিপ্রেত বিধানও হাতবদল হতে থাকে)।
এই মূলনীতির আলোকে আপনার প্রশ্নের উত্তর দুইভাবে বিভক্ত:
-
সাধারণ প্রীতি-উপহার বা হাদিয়া হিসেবে দেওয়া: আপনি যে খাবারটিকে ব্যাংক বা হারাম আয়ের সন্দেহ/অনিশ্চয়তার কারণে নিজের জন্য নাজায়েয বা অপছন্দনীয় মনে করছেন, তা অন্য কাউকে সাধারণ বন্ধুত্বপূর্ণ হাদিয়া বা প্রীতি-উপহার হিসেবে দেওয়া নাজায়েয। কারণ যা নিজে উপহার হিসেবে গ্রহণ করা বা খাওয়া থেকে বিরত থাকা আবশ্যক, তা অন্য মুসলিম ভাইকে ভালো উপহার হিসেবে পরিবেশন করা যায় না।
-
প্রয়োজনগ্রস্তকে 'সদকা' হিসেবে দেওয়ার নিয়ম: যেহেতু খাবারটি নষ্ট করা অপচয় (ইসরাফ) এবং শরীয়তে তা বর্জনীয়, সেহেতু যদি আপনার সেই পরিচিত বোনটি বাস্তবেই দরিদ্র বা অর্থকষ্টে থাকা প্রয়োজনগ্রস্ত (ফকীর/নিডি) হন, তবে তাকে খাবারটি সাধারণ হাদিয়া হিসেবে না দিয়ে ‘সওয়াবের আশা ছাড়া সদকা’ (বراءة الذمة বা নিছক হাত খালি করে দায়মুক্ত হওয়ার নিয়তে) হিসেবে দেওয়া জায়েয হবে।
-
কিতাব ও পৃষ্ঠা সূত্র:
- দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা ৪০৮ (অপচয় ও অপব্যয় বর্জনের শরয়ী মূলনীতি)।
- দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা ১৮৪–১৮৫ ও ১৮৯ (অধ্যায়: অমালিকানাধীন হারাম মালের হস্তান্তরের হুকুম ও সওয়াবের নিয়ত ছাড়া ফকীরকে সদকা করার নিয়ম)।
- কাওয়াইদুল ফিক্বহ: পৃষ্ঠা ১১৫ (সওয়াবের আশা ছাড়া দায়মুক্তির নিয়তে সদকা করা)।
৩. দ্বীনি বোনকে সচেতন করা ও বিস্তারিত জানিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব:
আপনার চিন্তাটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় এবং শরীয়তসম্মত। অন্যকে সৎকাজে উৎসাহিত করা ও অসৎ/হারাম কাজ থেকে বেঁচে থাকার ব্যাপারে সচেতন করা প্রতিটি মুমিনের ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব (আমর বিল মা'রূফ ও নাহী আনিল মুনকার)।
আপনি তাকে খাবারটি দেওয়ার সময় নম্র ও স্নেহশীল ভাষায় বিস্তারিত খুলে বলবেন:
"এই খাবারগুলো একজন আত্মীয় এনেছেন, যার ইনকাম মূলত ব্যাংককেন্দ্রিক (সুদী)। তাই দ্বীনি সচেতনতা ও তাকওয়ার তাগিদে আমি নিজে এটি খাওয়া থেকে বিরত থাকছি। তবে খাবার নষ্ট না করে, সওয়াবের আশা ছাড়া কেবল একটি দান/সদকা হিসেবে তোমাকে দিচ্ছি, যেন তোমার কাজে আসে। তবে আমাদের সবারই উচিত এরকম হারাম বা সন্দেহজনক উপার্জনের খাবার এড়িয়ে চলা, কারণ হালাল খাবার ইবাদত কবুলের পূর্বশর্ত।"
এতে করে দুটি ফায়দা হবে: প্রথমত, সে বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন হবে এবং দ্বিতীয়ত, তার মনে এই ভুল ধারণা তৈরি হবে না যে আপনি আপনার নিজের জন্য অনাকাঙ্ক্ষিত খাবার তাকে উপহার হিসেবে দিয়ে ছোট করছেন।
- কিতাব ও পৃষ্ঠা সূত্র:
- দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা ৪২১–৪২৩ (অধ্যায়: আমর বিল মা'রূফ ও নাহী আনিল মুনকার — দাওয়াতের আদাব ও নম্রতার বিবরণ)।
সারসংক্ষেপ:
খাবারগুলো নষ্ট না করে আপনার সেই প্রয়োজনগ্রস্ত পরিচিত বোনকে দিতে পারেন। তবে তা প্রীতি-উপহার (Hadiah) হিসেবে দেবেন না; বরং নিজের জন্য না খাওয়ার শরয়ী কারণ ক্লিয়ারলি বুঝিয়ে বলে সওয়াবের আশা ছাড়া সদকা/দান হিসেবে বুঝিয়ে দেবেন।
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
১. দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৪০৮ *(অপচয় ও অপব্যয়ের নিষেধাজ্ঞা)।
- পৃষ্ঠা: ৪২১–৪২৩ (সৎ কাজে আদেশ ও দ্বীনি সচেতনতার আদাব)।
২. দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১৮৪–১৮৫ (হারাম সম্পদ হস্তান্তর ও তার শরয়ী হুকুম)।
- পৃষ্ঠা: ১৮৯ (সওয়াবের নিয়ত ছাড়া সদকা করার নিয়ম)।
- পৃষ্ঠা: ১৯৯ (অধিকাংশ হারাম উপার্জনের ব্যক্তির হাদিয়া বর্জন)।
৩. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১৮শ খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১৬২–১৬৪ ও ১৭২ (সুদী ও ব্যাংক কর্মকর্তার হাদিয়া গ্রহণ ও বর্জনের বিবরণ)।
৪. কাওয়াইদুল ফিক্বহ:
- পৃষ্ঠা: ১১৫ (নাজায়েয মালের সদকা ও দায়মুক্তির বিবরণ)।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।