ইসলামী দৃষ্টিতে বেনামাজি ব্যক্তির মুখের কথা সত্য হওয়ার অর্থ কী?
Miscellaneous Fiqh · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
উত্তর:
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله وحده، والصلاة والسلام على من لا نبي بعده، وعلى آله وصحبه أجمعين، أما بعد:
প্রথমেই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া জরুরি—বেনামাজি হওয়া কুফরি। কুরআন, হাদিস এবং সাহাবিদের ইজমা (ঐকমত্য) অনুযায়ী, যে ব্যক্তি অলসতা বা অবহেলায় নামাজ ছেড়ে দেয়, সে কাফির। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, ইমাম ইবনুল কাইয়িম, শাইখ ইবন বাজ, শাইখ আলবানী, শাইখ উসাইমীন প্রমুখ মুহাদ্দিস ও ফকীহগণ এই মত পোষণ করেছেন।
দলিল:
- কুরআনে আল্লাহ বলেন: “যখন তারা নামাজ ত্যাগ করল এবং নিজেদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করল, তখন তারা ধ্বংসের মুখে পড়ল।” (সূরা মারইয়াম, ১৯:৫৯)
- রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “আমাদের এবং তাদের (মুনাফিকদের) মধ্যে যে চুক্তি, তা হল নামাজ। যে ব্যক্তি তা ত্যাগ করল, সে কাফির হয়ে গেল।” (তিরমিযি, হাদিস ২৬২১; সহিহ ইবন হিব্বান)
- অন্য হাদিসে বলেন: “মানুষের মধ্যে কুফরি ও শিরকের সীমা হলো নামাজ ত্যাগ করা।” (মুসলিম, হাদিস ৮২)
সুতরাং আপনার শাশুড়ি যদি জেনে-বুঝে নামাজ ত্যাগ করেন এবং এটাকে হালকা মনে করেন, তবে তিনি কারো কারো মতে কুফরি অবস্থায় জীবিত। তার মুখের কথায় যা বাস্তবে পরিণত হয়, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো সম্মান নয়, বরং এটি তাঁর কুদরত ও তাকদিরের অংশ এবং কখনো কখনো অত্যাচারিত ব্যক্তির বদদোয়া কবুল হওয়ার মতো বিষয়।
তার কথা সত্য বলে ঘটে যাওয়া এটি অনেকক্ষেত্রে কাকতালীয় বিষয়। অনেকক্ষেত্রে পরিপার্শ্বিক বিষয় বিবেচনা করে সে হয়তোবা বলে,যাহা মিলে যায়।
এটি এমন নয় যে তার বলার কারনেই এমনটি হয়েছে।
১. বেনামাজি ব্যক্তির কথায় সত্য হওয়ার কারণ কী?
ইসলামি আকিদায় বলার অপেক্ষা রাখে না যে একমাত্র আল্লাহই সব বিষয় নিয়ন্ত্রণ করেন। কোনো বেনামাজি বা পাপী ব্যক্তির মুখের কথা সত্য হওয়া তার পুণ্যের কারণে নয়; বরং তা হতে পারে:
- আল্লাহর কুদরত ও তাকদিরের প্রকাশ।
- অত্যাচারিত ব্যক্তির দোয়া বা বদদোয়া কবুল (যেমন আপনার ননদকে কষ্ট দেওয়ার পর শাশুড়ির কথায় ডিভোর্স হওয়া)। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “জালিমের বদদোয়া থেকে বেঁচে থাকো, কারণ তার ও আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা থাকে না।” (বুখারি, হাদিস ১৪৯৭)
- কখনো কখনো অমুসলিম বা পাপীদেরও কিছু কাজে ‘কাশফ’ বা ‘ইলহাম’ হতে পারে, কিন্তু তা তাদের মর্যাদার নয়, বরং পরীক্ষাস্বরূপ।
তবে এটি মনে রাখা জরুরি: যে ব্যক্তি নামাজ ত্যাগ করে আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার মুখোমুখি হবে, তার মুখের কথা সত্য হলেও আখিরাতে তার কোনো কল্যাণ নেই। বরং এই ‘অলৌকিকতা’ তাকে ধোঁকায় ফেলতে পারে, যেমন ফেরাউনের জাদুকরদের কাজ সত্য মনে হতো, কিন্তু তারা ছিল পথভ্রষ্ট।
২. আপনার শাশুড়ির অজুহাত (আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করবেন) কি গ্রহণযোগ্য?
কখনোই নয়। যে ব্যক্তি নামাজ ত্যাগ করে তার জন্য কোনো ওজর নেই। আল্লাহ কুরআনে বলেন: “আমি জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি শুধু আমার ইবাদতের জন্য।” (সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:৫৬) নামাজ ইবাদতের মূল স্তম্ভ। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে একটি নামাজ ছেড়ে দেয়, তার কাজটি হতাশাজনক।” (আবু দাউদ, হাসান)
শাইখ ইবন উসাইমীন বলেন: “নামাজ ছেড়ে দেওয়া ব্যক্তি কাফির, সে যতই সৎকর্ম করুক না কেন।”
অতএব, তাঁর এই অজুহাত সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। উচিত ছিল তাকে নম্রভাবে বোঝানো, দলিল দিয়ে উপস্থাপন করা, এবং তার জন্য দোয়া করা। তবে আপনি তার প্রতি ভালো আচরণ করবেন قطعاً (নিশ্চিতভাবে) কারণ ইসলাম পিতা-মাতা ও শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু তাদের দোয়া বা বদদোয়ার ভয়ে নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।
৩. আপনার নিজের আমলে ফিরে আসার উপায়
আপনি বলেছেন যে আপনি আগে ‘মুস্তাজাবুদ দাওয়া’ ছিলেন (অর্থাৎ দোয়া কবুল হতো) কিন্তু বিবাহের পরে আমলে দুর্বল হয়ে গেছেন। সমাধান:
প্রথম: তাওবা করার জন্য দেরি না করা। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “যে ব্যক্তি গুনাহ থেকে তাওবা করে, সে যেন গুনাহ করেনি।” (ইবন মাজাহ, হাসান)
দ্বিতীয়: সালাতুল ফজর থেকে শুরু করে সব ওয়াক্তের নামাজ কাযা না করে আদায় করা। যদি কোনো নামাজ ছুটে যায়, তাহলে সাথে সাথে কাজা করে নেওয়া।
তৃতীয়: ইস্তিগফার বেশি করে পড়া (আস্তাগফিরুল্লাহ) এবং লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, সুবহানাল্লাহ ইত্যাদি জিকির করা।
চতুর্থ: ছোট ছোট আমল দিয়ে শুরু করা, যেমন প্রতি রাতে দুই রাকাত তাহাজ্জুদ বা সকাল-সন্ধ্যার জিকির।
পঞ্চম: আল্লাহর কাছে কান্না করে সাহায্য চাওয়া, কারণ তিনি বলেন: “আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।” (সূরা আল-মু’মিন, ৪০:৬০)
ষষ্ঠ: দূরে থাকা শয়তানের প্ররোচনা থেকে, এবং মনে রাখা যে সালাতই পরিত্রাণের পথ।
৪. আপনার ভয়—তাদের দোয়া না পাওয়া
প্রথম কথা: ভালো ব্যবহার করা উচিত পরিবারের সবার সাথে, বিশেষ করে শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন প্রতিবেশীকে সম্মান করে।” (বুখারি ও মুসলিম)
কিন্তু আপনি কেবলমাত্র আল্লাহকে ভয় করুন। আপনি যদি তাওবা করে নামাজ-ইবাদতে ফিরে আসেন, তাহলে আপনার আমলই আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে, আর আপনার স্ত্রী-পরিবারের দোয়া আপনার জন্য বরকতের হবে। বেনামাজিদের দোয়া সম্পর্কে সতর্ক থাকুন—তারা যদি আপনার প্রতি জুলুম করে, তাহলে তাদের বদদোয়া কবুল হওয়ার আশঙ্কা আছে (ইসলাম এই বিপদ থেকে সতর্ক করে)। কিন্তু আপনি তো তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করেন, তাই তাদের বদদোয়া পাওয়ার কোনো কারণ নেই। বরং আপনি তাদের জন্য দোয়া করুন, হয়তো আল্লাহ তাদের হেদায়াত দেবেন।
সংক্ষেপে:
- বেনামাজি হওয়া কুফরি, এ ব্যাপারে কোনো শিথিলতা নেই।
- তাদের মুখের কথা সত্য হওয়া কোনো গুণ নয়, বরং আল্লাহর তাকদিরের অংশ বা অত্যাচারিতের দোয়া কবুল।
- আপনি নিজের আমলে ফিরে আসতে চান—এর একমাত্র উপায় তাওবা, সালাত কাযা করা, ইস্তিগফার ও ধারাবাহিকভাবে ইবাদত শুরু করা।
- শাশুড়ির সাথে ভালো ব্যবহার করুন, কিন্তু তার অজুহাত মেনে নেবেন না। নম্রভাবে তাকে নামাজের গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করুন এবং তার জন্য দোয়া করুন।
রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুন্যা হাসানাতা ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাতা ওয়া কিনা আযাবান্নার।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন।