জয়েন ফ্যামিলিতে টাকা পাঠানোর বিধান।

Family Life · Hanafi

Question No: 5383
Questioner: sadia ahmed
Question Asked: 13 Sep 2026, 06:27 AM
Reviewed & Published: 13 Sep 2026, 07:49 AM
Views: 9
Tokens: 7,477
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম। আমার শশুর পেনশনের টাকা পায়, চাষাবাদ করে তারা তাদের খরচ চালাতে সক্ষম কিন্তু জয়েন ফ্যামেলি হওয়াতে তারা চায় আমার হাজবেন্ড বিয়ের আগের মতো পরিবারে টাকা পাঠাক + সময় দেক। আমার হাসবেন্ডের ঋণ আছে সেটা তারা বুঝার চেষ্টা করে না। আমার হাসবেন্ডের বেতন ৬৫০০০ হাজার সে মাসে ৭০০০ টাকা ঋণ দেয়। আমি ৫/৬ মাস ধরে একটি শাড়ি চাচ্ছি সে কিনে দিতে পারছে না। যদিও আমার প্রয়োজনীয় অনেক বিষয় তার কাছে চাই না সবর করি, কিন্তু এখন আমি ক্লান্ত। তার কথা তার বাবা মাকে সন্তুষ্ট করতে তার খরচ বেশি দিতে হবে বাড়িতে।

প্রশ্ন: বাবা মাকে সন্তুষ্ট করতে জয়েন ফ্যামিলিতে টাকা পাঠানোর বিধান কি? আমার ভাসুর বিদেশ থাকে কিন্তু তিনি বাড়িতে টাকা পাঠায় না বৌ সন্তানের খরচ ও দেন না টাকা জমিয়ে জমি কিনেন ও ব্যবসার জন্য টাকা জমান। এখন তার ছেলের পড়াশোনার খরচ ও আমার হাসবেন্ডকে দিতে হয় এটার বিধান ইসলামে কি? ভাসুরের ছেলের খরচ দেওয়া সম্পর্কে ইসলাম কি বলে? আর এসব বিষয় নিয়ে আমাকে একটু নসিহত করলে মুনাসিব হতো।

Answer

পরিবারিক সমস্যা: জয়েন ফ্যামিলিতে টাকা পাঠানো ও ভাসুরের সন্তানের খরচ দেওয়ার বিধান

উত্তর (সংক্ষেপে):

আপনার প্রশ্নের মূল বিষয়গুলো নিম্নরূপ:

১. পিতা-মাতার ভরণপোষণ (নাফাকা): ইসলামে পিতা-মাতার ভরণপোষণ সন্তানের উপর ওয়াজিব (ফরজ), তবে শর্ত হলো—সন্তান সামর্থ্যবান হবে এবং পিতা-মাতা অভাবী/অসহায় হবে। আপনার শ্বশুর-শাশুড়ি পেনশন পান এবং চাষাবাদ করে নিজেদের খরচ চালাতে সক্ষম। তাই তাদের জন্য বাধ্যতামূলক নাফাকা আপনার স্বামীর উপর ওয়াজিব নয়। তবে সদকা ও সিলাতুর রহম (আত্মীয়তা রক্ষা) হিসেবে সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করা উত্তম ও সওয়াবের কাজ।

২. স্ত্রীর ভরণপোষণ (নাফাকা): স্ত্রীর ভরণপোষণ স্বামীর উপর ওয়াজিব। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান—সামর্থ্য অনুযায়ী পূর্ণ করা স্বামীর দায়িত্ব। আপনি ৫/৬ মাস ধরে একটি শাড়ি চাচ্ছেন কিন্তু পাচ্ছেন না—এটি স্বামীর দায়িত্বে অবহেলা। তবে আপনার স্বামীর হাতে বাধ্যতামূলক ঋণ পরিশোধের চাপ থাকলে সাময়িক সংকট হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে স্ত্রীর ন্যূনতম প্রয়োজন পূরণ করা তার দায়িত্ব।

৩. ভাসুরের সন্তানের খরচ: ভাসুরের সন্তানের ভরণপোষণ ভাসুরের নিজের দায়িত্ব, আপনার স্বামীর নয়। ভাসুর বিদেশে থেকে টাকা পাঠাচ্ছেন না, জমি কিনছেন, ব্যবসার জন্য জমাচ্ছেন—এটি তার দায়িত্বে অবহেলা। আপনার স্বামী তার ভাইয়ের সন্তানের খরচ দিতে বাধ্য নন। এটি স্বেচ্ছায় করলে সদকা হিসেবে গণ্য হবে, কিন্তু বাধ্যতামূলক নয়।


বিস্তারিত আলোচনা

১. পিতা-মাতার ভরণপোষণ সম্পর্কে ইসলামের বিধান

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا "তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।" (সূরা বনী ইসরাইল: ২৩)

হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

رِضَا الرَّبِّ فِي رِضَا الْوَالِدِ وَسَخَطُ الرَّبِّ فِي سَخَطِ الْوَالِدِ "প্রভুর সন্তুষ্টি পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে এবং প্রভুর অসন্তুষ্টি পিতা-মাতার অসন্তুষ্টিতে।" (তিরমিজি: ১৮৯৯)

তবে ফিকহের মূলনীতি: পিতা-মাতার নাফাকা (ভরণপোষণ) সন্তানের উপর ওয়াজিব হওয়ার জন্য দুটি শর্ত:

  1. সন্তান সামর্থ্যবান হবে (নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক বা প্রয়োজনীয় খরচের অতিরিক্ত আয় থাকবে)।
  2. পিতা-মাতা অভাবী ও অসহায় হবেন—নিজের খরচ চালাতে অক্ষম হবেন।

হানাফি ফিকহের দলিল:

আল্লামা ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ বলেন:

"পিতা-মাতার ভরণপোষণ সন্তানের উপর ওয়াজিব, যখন পিতা-মাতা অভাবী হন এবং সন্তান সামর্থ্যবান হয়।" (রাদ্দুল মুহতার: ৫/২৬০)

ফতোয়ায়ে আলমগিরি-তে আছে:

"যদি পিতা-মাতা সম্পদশালী হন এবং নিজেদের খরচ চালাতে সক্ষম হন, তাহলে সন্তানের উপর তাদের ভরণপোষণ ওয়াজিব নয়।" (ফতোয়ায়ে আলমগিরি: ১/৫৬৪)

আপনার ক্ষেত্রে: আপনার শ্বশুর-শাশুড়ি পেনশন পান এবং চাষাবাদ করে খরচ চালাতে সক্ষম। তাই তাদের ভরণপোষণ আপনার স্বামীর উপর ওয়াজিব নয়। তবে সামর্থ্য থাকলে সাহায্য করা, উপহার দেওয়া, সময় দেওয়া—এসব সদকা ও আত্মীয়তার হক হিসেবে উত্তম।


২. স্ত্রীর ভরণপোষণ (নাফাকা) সম্পর্কে ইসলামের বিধান

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَعَلَى الْمَوْلُودِ لَهُ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ "সন্তানের পিতার দায়িত্ব হলো ন্যায়সংগতভাবে তাদের (স্ত্রীদের) খাদ্য ও বস্ত্রের ব্যবস্থা করা।" (সূরা বাকারা: ২৩৩)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

وَلَهُنَّ عَلَيْكُمْ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ "তোমাদের উপর তাদের (স্ত্রীদের) খাদ্য ও বস্ত্রের দায়িত্ব ন্যায়সংগতভাবে রয়েছে।" (সহিহ মুসলিম: ১২১৮)

হানাফি ফিকহ: স্ত্রীর নাফাকা স্বামীর উপর ওয়াজিব—যদি স্ত্রী স্বামীর ঘরে থাকে এবং স্বামী সামর্থ্যবান হয়। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান—সামর্থ্য অনুযায়ী পূর্ণ করা আবশ্যক।

ইমাম তাহাবি (রহ.) তার শরহু মাআনিল আসার-এ উল্লেখ করেন:

"স্ত্রীর ভরণপোষণ স্বামীর উপর ওয়াজিব, কারণ আল্লাহ বলেছেন—'তোমাদের উপর তাদের খাদ্য ও বস্ত্রের দায়িত্ব রয়েছে।'"

আপনার ক্ষেত্রে: আপনার স্বামীর বেতন ৬৫,০০০ টাকা, কিন্তু মাসে ৭,০০০ টাকা ঋণ পরিশোধ করতে হয়। অবশিষ্ট ৫৮,০০০ টাকা দিয়ে সংসার চালানো সম্ভব। আপনি ৫/৬ মাস ধরে একটি শাড়ি চাচ্ছেন—এটি আপনার ন্যূনতম প্রয়োজন। স্বামীর উপর আপনার প্রয়োজন পূরণ করা ওয়াজিব। তবে ঋণ পরিশোধের চাপ থাকলে সাময়িক সংকট হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে স্ত্রীর ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করা তার দায়িত্ব।

পরামর্শ: আপনার স্বামীর সাথে শান্তভাবে আলোচনা করুন। তাকে বুঝান যে, পিতা-মাতার সন্তুষ্টি ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু স্ত্রীর হক আদায় করাও তার দায়িত্ব। উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা প্রয়োজন।


৩. ভাসুরের সন্তানের খরচ দেওয়া সম্পর্কে ইসলামের বিধান

মূলনীতি: সন্তানের ভরণপোষণ পিতার দায়িত্ব। আল্লাহ বলেন:

وَعَلَى الْمَوْلُودِ لَهُ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ "সন্তানের পিতার দায়িত্ব হলো ন্যায়সংগতভাবে তাদের খাদ্য ও বস্ত্রের ব্যবস্থা করা।" (সূরা বাকারা: ২৩৩)

হানাফি ফিকহ:

  • সন্তানের নাফাকা পিতার উপর ওয়াজিব, যদি পিতা সামর্থ্যবান হয়।
  • পিতার অবর্তমানে দাদা, চাচা—এদের উপর ওয়াজিব হতে পারে, তবে নির্দিষ্ট শর্তে।
  • ভাইয়ের সন্তানের খরচ চাচার উপর ওয়াজিব নয়—যদি না পিতা মৃত বা সম্পূর্ণ অসহায় হয় এবং চাচা সামর্থ্যবান হয়।

ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:

"সন্তানের ভরণপোষণ পিতার উপর ওয়াজিব। পিতা উপস্থিত থাকলে অন্য কারো উপর ওয়াজিব নয়।" (রাদ্দুল মুহতার: ৫/২৬৫)

আপনার ক্ষেত্রে: আপনার ভাসুর বিদেশে থাকেন, টাকা জমিয়ে জমি কিনছেন, ব্যবসার জন্য জমাচ্ছেন—কিন্তু নিজের সন্তানের খরচ দিচ্ছেন না। এটি তার দায়িত্বে অবহেলা। আপনার স্বামী তার ভাইয়ের সন্তানের খরচ দিতে বাধ্য নন। এটি স্বেচ্ছায় করলে সদকা হিসেবে গণ্য হবে, কিন্তু বাধ্যতামূলক নয়।

তবে: যদি আপনার স্বামী স্বেচ্ছায় তার ভাইয়ের সন্তানের খরচ দেন, তবে তা সদকা হিসেবে কবুল হবে এবং আত্মীয়তার হক আদায় হবে। কিন্তু নিজের স্ত্রীর হক আদায় না করে অন্যের সন্তানের খরচ দেওয়া অন্যায়


৪. নসিহত ও পরামর্শ

আপনার প্রতি নসিহত:

১. ধৈর্য ধরুন: আল্লাহ বলেন—"নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" (সূরা বাকারা: ১৫৩)

২. স্বামীর সাথে শান্তভাবে আলোচনা করুন: রাগ বা অভিযোগের সুরে নয়, বরং ভালোবাসা ও সম্মানের সাথে। তাকে বুঝান যে, পিতা-মাতার সন্তুষ্টি ও স্ত্রীর হক—উভয়ই তার দায়িত্ব।

৩. নিজের হক সম্পর্কে সচেতন থাকুন: ইসলামে স্ত্রীর নাফাকা স্বামীর উপর ওয়াজিব। আপনি যদি অভাবী হন এবং স্বামী সামর্থ্যবান হয়, তবে আপনার প্রয়োজন পূরণ করা তার দায়িত্ব। এটি চাওয়া আপনার অধিকার।

৪. অতিরিক্ত দাবি করবেন না: আপনার স্বামীর ঋণ আছে—এটি বিবেচনায় রাখুন। তবে ন্যূনতম প্রয়োজন (খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান) পূরণ করা তার দায়িত্ব।

৫. আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন: আল্লাহ বলেন—"যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন।" (সূরা তালাক: ২)

আপনার স্বামীর প্রতি নসিহত (যদি তিনি শোনেন):

১. পিতা-মাতার সন্তুষ্টি: ইসলামে পিতা-মাতার সন্তুষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে তাদের সন্তুষ্টি অর্জনের অর্থ এই নয় যে স্ত্রীর হক নষ্ট করবেন।

২. স্ত্রীর হক: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—"তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীর সাথে সর্বোত্তম ব্যবহার করে।" (তিরমিজি: ৩৮৯৫)

৩. ভারসাম্য রক্ষা করুন: পিতা-মাতা, স্ত্রী, সন্তান—সবার হক আদায় করুন। কারো হক নষ্ট করে কারো সন্তুষ্টি অর্জন করা ইসলামে অনুমোদিত নয়।

৪. ভাইয়ের সন্তানের খরচ: এটি আপনার বাধ্যতামূলক দায়িত্ব নয়। আপনার ভাই নিজের সন্তানের দায়িত্বে অবহেলা করছেন—এটি তার গুনাহ। আপনি স্বেচ্ছায় সাহায্য করতে পারেন, কিন্তু নিজের পরিবারের হক নষ্ট করে নয়।


৫. সারসংক্ষেপ

| বিষয় | বিধান | |------|--------| | শ্বশুর-শাশুড়ির ভরণপোষণ | তারা সক্ষম হলে ওয়াজিব নয়; সদকা হিসেবে সাহায্য করা উত্তম | | স্ত্রীর ভরণপোষণ | স্বামীর উপর ওয়াজিব (সামর্থ্য অনুযায়ী) | | ভাসুরের সন্তানের খরচ | ভাসুরের দায়িত্ব; আপনার স্বামীর উপর ওয়াজিব নয় | | জয়েন ফ্যামিলিতে টাকা পাঠানো | বাধ্যতামূলক নয়; স্বেচ্ছায় সদকা হিসেবে করা যাবে | | ভারসাম্য | পিতা-মাতা ও স্ত্রীর হক উভয়ই আদায় করা প্রয়োজন |


উপসংহার: আপনার স্বামীর উপর পিতা-মাতার ভরণপোষণ ওয়াজিব নয়, কারণ তারা সক্ষম। তবে তাদের সন্তুষ্টি অর্জন করা ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ—কিন্তু তা স্ত্রীর হক নষ্ট করে নয়। আপনার স্বামীর উপর আপনার ন্যূনতম প্রয়োজন পূরণ করা ওয়াজিব। ভাসুরের সন্তানের খরচ দেওয়া আপনার স্বামীর দায়িত্ব নয়। আপনি ধৈর্য ধরুন, স্বামীর সাথে শান্তভাবে আলোচনা করুন, এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। আল্লাহ আপনার পরিবারে বরকত দান করুন। আমিন।

রেফারেন্স:

  • রাদ্দুল মুহতার: ৫/২৬০, ৫/২৬৫
  • ফতোয়ায়ে আলমগিরি: ১/৫৬৪
  • শরহু মাআনিল আসার (ইমাম তাহাবি)
  • সহিহ মুসলিম: ১২১৮
  • তিরমিজি: ১৮৯৯, ৩৮৯৫
  • সূরা বাকারা: ২৩৩
  • সূরা বনী ইসরাইল: ২৩
  • সূরা তালাক: ২

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.