বেনামাজী ব্যক্তির ভবিষ্যত বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি মিলে যাওয়া ইসলামিক কারণ কি ?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 538
Questioner: Najifa Meem
Question Asked: 22 May 2026, 04:19 PM
Reviewed & Published: 22 May 2026, 04:29 PM
Views: 29
Tokens: 3,244
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার শাশুড়ী মানুষটা বেনামাজি | বেনামাজী হলেও আল্লাহর প্রতি তার অগাধ বিশ্বাস | সে মানুষের হক নষ্ট করে না | তবে সে তার মুখ দিয়ে ভালো বা মন্দ যেটাই বের করে সেটাই সত্য হয় | যেমন আমি বললাম আমি এখন রান্নার কাজে যাবো | সে বললো এখন না ৪ টার পর যেও | ঠিকই ঠিকই আমি কোনো ভাবেই ৪টার আগে রান্নার ঢুকতে পারি না | কোনো না কোনো জরুরত এসে হাজির হয় | আমি জাস্ট এটা উদাহরণ দিলাম | এই রকম ছোটো বড় বহু ঘটনা আছে | আবার আমার চাচাতো ননদ তার বিয়ের আগে , আমার শাশুড়ী আম্মুকে অন্যায় ভাবে মানসিক কষ্ট দেয় | সে তখন বলেছিল এই মেয়ে এখানে সংসার করতে পারবে না | ঠিকই ১ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তার ডিভোর্স হয় | আবার আমার দাদাও এমন ছিলেন | তিনিও বেনামাজী + খারাপ চরিত্রের ছিলেন | তবুও তিনি মুখ দিয়ে যা বলতেন তাই হয়ে যেত | ইসলাম এই বিষয়ে কি বলে ?

Answer

প্রশ্নের উত্তর:

আপনার শাশুড়ী ও দাদার ব্যাপারে যে ঘটনাগুলো বলেছেন—তারা বেনামাজি হওয়া সত্ত্বেও তাদের মুখের কথার সত্যতা পাওয়া—এ নিয়ে ইসলাম কী বলে, তা নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করছি।

১. বেনামাজি হওয়া একটি গুরুতর গুনাহ

প্রথমেই বুঝতে হবে, নামাজ ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত। ইচ্ছাকৃতভাবে নামাজ ত্যাগ করা কবিরা গুনাহ এবং অনেক আলিমের মতে, নামাজ ছেড়ে দিলে ব্যক্তি ইসলামের সীমারেখা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কুরআন ও হাদিসে নামাজ ত্যাগকারীদের জন্য কঠিন শাস্তির কথা এসেছে।

  • কুরআন: "নিশ্চয়ই নামাজ মুমিনদের জন্য নির্ধারিত সময়ে ফরজ করা হয়েছে।" (সূরা নিসা: ১০৩)
  • হাদিস: "নামাজ ও ইসলামের মধ্যে পার্থক্য হলো নামাজ ছেড়ে দেওয়া।" (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৬১৮)

সুতরাং, বেনামাজি অবস্থায় কোনো ব্যক্তি ভালো কাজ করলেও তা তার নামাজ ত্যাগের গুনাহ ক্ষমা করে না। তবে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও মানুষের হক নষ্ট না করাটা ভালো গুণ হলেও তা নামাজের বিকল্প নয়।

২. মুখের কথার সত্যতা পাওয়ার কারণ কী?

আপনার শাশুড়ী ও দাদার বক্তব্য সত্য হওয়ার পেছনে কয়েকটি সম্ভাবনা থাকতে পারে:

ক) আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ জ্ঞান:
কখনো কখনো আল্লাহ তাআলা তাঁর কোনো বান্দাকে বিশেষ অন্তর্দৃষ্টি দেন, এমনকি যদি ব্যক্তি পাপীও হয়, তবুও দুনিয়াবী কিছু বিষয়ে তার কথা সত্য হতে পারে। এটি কোনো মর্যাদার পরিচয় নয়, বরং পরীক্ষাস্বরূপ হতে পারে। যেমন কুরআনে বলা হয়েছে:
"তারা কি জানে না যে, আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা রিজিক প্রশস্ত করেন এবং সংকীর্ণ করেন? নিশ্চয়ই এতে নিদর্শন রয়েছে ঈমানদারদের জন্য।" (সূরা রুম: ৩৭)
তবে এটি আল্লাহর ইচ্ছাধীন, আর ব্যক্তি নিজে এতে গর্ব করলে তা বিপজ্জনক।

খ) ‘ইস্তিদরাজ’— ধীরে ধীরে শাস্তি:
কখনো আল্লাহ কিছু পাপী লোককে দুনিয়ায় কিছু অলৌকিক ক্ষমতা বা সফলতা দিয়ে থাকেন, যাতে তারা আরও গুনাহে লিপ্ত হয় এবং আখিরাতে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হয়। এটি একটি বিশেষ নিয়ম, যাকে ‘ইস্তিদরাজ’ বলে। হাদিসে আছে:
"যখন তুমি দেখো যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাকে গুনাহ করতেও দিচ্ছেন এবং দুনিয়ার নিয়ামত দিচ্ছেন, তখন বুঝে নাও এটি ইস্তিদরাজ।" (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২১০২৩)
সুতরাং, আপনার শাশুড়ী ও দাদার কথা সত্য হওয়া আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের জন্য ইস্তিদরাজ বা ধীরে ধীরে শাস্তি হতে পারে—বিশেষ করে যেহেতু তারা নামাজ ছেড়ে দিয়েছে।

গ) কখনো কখনো তা কেবল কাকতালীয় বা মানুষের দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের ফল:
মানুষের দৃঢ় বিশ্বাস বা শক্ত মনোযোগ অনেক সময় ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হওয়ার বাহ্যিক কারণ হতে পারে। তবে ইসলামী দৃষ্টিতে কোনো ব্যক্তির কথার স্বয়ংক্রিয় শক্তি নেই; সব আল্লাহর ইচ্ছাধীন।

৩. ইসলামের বিধান: নামাজ ত্যাগকারীর ব্যাপারে করণীয়

আপনার শাশুড়ী বেনামাজি—এটি একটি বড় অপরাধ। তার প্রতি আপনার দায়িত্ব হলো:

  • তাকে নরম ভাষায় নামাজের গুরুত্ব বোঝানো।
  • নিজে নামাজি হয়ে তার জন্য দোয়া করা।
  • তাকে সম্মান ও স্নেহের সাথে বুঝানো যে, নামাজ ছাড়া কোনো কল্যাণ নেই।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"বান্দার এবং কুফরের মাঝে পার্থক্য হলো নামাজ ত্যাগ করা।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৮২)

৪. আপনার এ উদ্বেগ ও সতর্কতা

আপনি যা বলছেন—আপনার শাশুড়ী ও দাদার মুখের কথা সত্য হওয়া দেখে আপনি হয়তো তাদের বিশেষ কোনো শক্তি বা বরকতের কথা ভাবছেন। কিন্তু ইসলামে এটি কোনো কৃতিত্বের বিষয় নয়; বরং তাদের নামাজের মতো ফরজ ইবাদত পরিত্যাগের কারণে তাদের জন্য এটি একটি বড় বিপদ। আপনার কর্তব্য হলো তাদের গুনাহ থেকে বিরত রাখতে চেষ্টা করা এবং নিজে দ্বীনের উপর অটল থাকা।

৫. কুরআন ও হাদিসের দৃষ্টিতে নামাজের গুরুত্ব

  • আল্লাহ বলেন: "নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীল ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখে।" (সূরা আনকাবুত: ৪৫)
  • নামাজ বর্জনের শাস্তি: "আমি তাদের কিছু শাস্তি দুনিয়াতেও দেব এবং আখিরাতের শাস্তি আরও কঠিন।" (সূরা রাদ: ৩৪)

৬. উপসংহার ও পরামর্শ

  • আপনার শাশুড়ী ও দাদার মুখের কথা সত্য হওয়া আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো মর্যাদা নয়, বরং এটি তাদের জন্য ইস্তিদরাজ বা পরীক্ষা হতে পারে।
  • নামাজ ত্যাগের গুনাহ এতটাই বড় যে, অন্য ভালো কাজ তা পূরণ করতে পারে না।
  • আপনি নিজে নামাজে যত্নবান হন এবং তাদের জন্য দোয়া করুন।
  • তাদের সাথে সুন্দর আচরণ করুন, কিন্তু তাদের বেনামাজি অবস্থাকে সমর্থন বা বৈধতা দেবেন না।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে নামাজের প্রতি যত্নবান করুন এবং কবিরা গুনাহ থেকে হেফাজত করুন। আমীন।

রেফারেন্স:

  • ফতোয়া উসমানী (২/৩৪৭-৩৪৮)
  • রদ্দুল মুহতার (২/৪৫২-৪৫৩)
  • ইমদাদুল ফতোয়া (২/২২৫-২২৬)
  • বাহিশতি জেওর (পৃষ্ঠা ৬৩-৬৫)
  • সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৮২
  • সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৬১৮

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.