স্বপ্নে মৃত পিতাকে সুস্থ-সবল, ফর্সা ও হাস্যময় দেখা এবং “তুমি যা পাঠাও সব আমি পাই” বলা—এর শরিয়তসম্মত ব্যাখ্যা।
Faith and Belief · Hanafi
Question
আমার আব্বা মারা গেছেন।আমি স্বপ্নে দেখলাম উনার কবর ভেঙ্গে পড়েছে,ভেতরে কাফনের কাপড়ে মোড়ানো লাশ,একদম ঝকঝকে কাপড়।উনাকে অনেক স্বাস্হ্যবান,লম্বা দেখাচ্ছে।খানিক পর আব্বা আমার কাছে আসলেন।কালো,খর্বাকায়।উনাকে দেখে আমি কেঁদে ফেলছি।আমাকে বলছেন--কান্না করো না ,আমি ভালো আছি।তুমি যা পাঠাও সব আমি পাই
কিছুদিন পর,
আব্বার কবর ভাঙ্গা না,বাট কিছুটা আলগা হয়ে আছে।আমি কবরের পাশে দাঁড়ানো,একজন লোক এসে কবরটা দেখলেন আর আমাকে বললেন--উনার কবরের আলামত খুব ভালো,নুর দিয়ে ভরে আছে কবর।
খানিক পর দেখি আব্বার লাশটা খাটিয়ায় শোয়ানো,মুখের অংশ অনাবৃত।আব্বাকে ভীষণ সুন্দর ফর্সা দেখাচ্ছে,উনি মাথার ওপর হাত রেখে মুচকি হাসছেন ।আমাকে বলছেন যা কিছু পাঠাও সব কিছু নুরের থালায় আমাকে দেওয়া হয়।এরপর উনি আমার কাছে কিছু একটা খাবারের কথা জিজ্ঞেস করলেন,সেই সময় আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়।
ব্যাখা জানতে চাই।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ:
আপনার আব্বা ইন্তেকাল করেছেন। আপনি স্বপ্নে দেখেছেন—কবর ভেঙে পড়েছে, ভেতরে কাফনে মোড়ানো ঝকঝকে কাপড়, আব্বা সুস্থ-সবল ও লম্বা; পরে তিনি কালো ও খর্বাকায় অবস্থায় আপনার কাছে এসে বলছেন, “কান্না করো না, আমি ভালো আছি; তুমি যা পাঠাও সব আমি পাই।” আবার কিছুদিন পর স্বপ্নে কবর ভাঙা নয়, কিছুটা আলগা; একজন লোক বলছেন, “উনার কবরের আলামত খুব ভালো, নূরে ভরা কবর।” এরপর আব্বা খাটিয়ায় শোয়ানো, মুখের অংশ অনাবৃত, ভীষণ সুন্দর ফর্সা, মাথায় হাত রেখে মুচকি হাসছেন এবং বলছেন, “যা কিছু পাঠাও সব নূরের থালায় আমাকে দেওয়া হয়।” এরপর তিনি খাবারের কথা জিজ্ঞেস করলে আপনার ঘুম ভেঙে যায়। আপনি এর ব্যাখ্যা জানতে চান।
উত্তর:
প্রিয় প্রশ্নকারী, আপনার স্বপ্নটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং সাধারণত মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া, ইস্তিগফার, কুরআন তিলাওয়াত, সদকা ও ঈসালে সওয়াব-এর প্রতি উৎসাহব্যঞ্জক বলে বিবেচিত হয়। তবে মনে রাখা জরুরি—স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিশ্চিত ওহি বা কুরআন-হাদিসের বিধান নয়; এটি ব্যক্তিগত অনুভূতি ও সম্ভাবনার বিষয়। শরিয়তের দৃষ্টিতে স্বপ্ন তিন প্রকার: (১) আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ, (২) শয়তানের পক্ষ থেকে ভয় দেখানো, (৩) নফসের কল্পনা। (বুখারি, মুসলিম)
আপনার স্বপ্নে কয়েকটি দিক লক্ষণীয়:
১. কবর ভেঙে পড়া বা আলগা হওয়া:
এটি সাধারণত মৃত ব্যক্তির কবরের আজাব বা কষ্টের আলামত নয়; বরং অনেক সময় এটি দেখায় যে, মৃত ব্যক্তির আমলের হিসাব-নিকাশ বা পরীক্ষার একটি পর্যায় অতিক্রান্ত হয়েছে, অথবা তার জন্য বেশি বেশি দোয়া-ইস্তিগফারের প্রয়োজন। ইমাম ইবনে সিরিন (রহ.) ও অন্যান্য মুফাসসিরে স্বপ্নের কিতাবে উল্লেখ করেছেন, কবর ভাঙা বা আলগা হওয়া কখনো কখনো মৃতের ওপর দুনিয়ার সম্পর্ক ছিন্ন হওয়া বা তার জন্য দোয়ার প্রয়োজনীয়তার দিকে ইঙ্গিত করে।
২. কাফন ঝকঝকে, সুস্থ-সবল ও লম্বা দেখা:
এটি খুবই শুভ আলামত। হাদিসে এসেছে, জান্নাতিরা সুস্থ-সবল, সুন্দর ও উন্নত আকৃতির হবেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “জান্নাতিরা জান্নাতে প্রবেশ করবে ত্রিশ বছর বয়সে, সুন্দর আকৃতিতে, গোঁফহীন, টিকলিহীন, চোখে সুরমা লাগানো, দেহ হবে লম্বা ও সুঠাম।” (তিরমিজি, হাদিস: ২৫৪৫)
আপনার স্বপ্নে আব্বাকে সুস্থ-সবল ও লম্বা দেখা—এটি তার জন্য সুসংবাদ যে, আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করেছেন বা তার অবস্থা ভালোর দিকে।
৩. কালো ও খর্বাকায় অবস্থায় আসা:
এটি প্রথম দিকের অবস্থার বিপরীত। স্বপ্নে রূপ পরিবর্তন কখনো কখনো মৃতের আমলের অবস্থার পরিবর্তন বা তার ওপর বিভিন্ন সময়ের প্রভাব নির্দেশ করে। আবার এটি শয়তানের ধোঁকাও হতে পারে। তবে পরবর্তী অংশে আবার তাকে সুন্দর ফর্সা ও হাস্যময় দেখা—এটি পূর্বের কালো অবস্থার চেয়ে বেশি শুভ।
ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) ‘ফাতহুল বারী’তে উল্লেখ করেছেন, স্বপ্নে মৃতকে ভালো অবস্থায় দেখা তার জন্য সুসংবাদ, আর খারাপ অবস্থায় দেখা তার জন্য দোয়ার প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত।
৪. “তুমি যা পাঠাও সব আমি পাই” এবং “নূরের থালায় আমাকে দেওয়া হয়”:
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও শুভ বার্তা। কুরআন-হাদিস ও ফিকহের কিতাবসমূহে স্পষ্টভাবে এসেছে যে, মৃত ব্যক্তির কাছে তার আত্মীয়দের দোয়া, ইস্তিগফার, সদকা, কুরআন তিলাওয়াত ও হজ্জ-উমরাহর সওয়াব পৌঁছায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“আর যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের সন্তান-সন্ততিও ঈমানে তাদের অনুসরণ করেছে, আমি তাদের সন্তানদেরকে তাদের সাথে মিলিত করব এবং তাদের আমল থেকে কোনো কিছু কমাব না।” (সূরা তুর: ২১)
ইবনে আব্বাস (রা.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, “আল্লাহ তাআলা মুমিন সন্তানদেরকে তাদের পিতামাতার মর্যাদায় পৌঁছে দেবেন, যদিও সন্তানরা আমলে কম হবে।” (তাফসিরে ইবনে কাসির)
হাদিসে এসেছে:
“মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি আমল চলতে থাকে: সদকায়ে জারিয়া, এমন ইলম যা থেকে উপকার নেওয়া হয়, এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।” (মুসলিম, হাদিস: ১৬৩১)
হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ কিতাব রাদ্দুল মুহতার (২/২৪৩) ও ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/১৬৬)-তে উল্লেখ আছে, মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া, ইস্তিগফার, সদকা ও কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব পৌঁছানো শরিয়তসম্মত। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) ও ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃতকে পৌঁছানো জায়েজ।
ফাতাওয়া উসমানি (১/৩৩০) ও ইমদাদুল ফাতাওয়া (১/৩০)-তেও এ বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
৫. মুচকি হাসা ও খাবারের কথা জিজ্ঞেস করা:
স্বপ্নে মৃতের হাসিমুখ ও খাবারের কথা জিজ্ঞেস করা—এটি তার ভালো অবস্থার আলামত। খাবার সাধারণত রিজিক, সন্তুষ্টি ও আরামের প্রতীক। তবে স্বপ্নে খাবারের কথা জিজ্ঞেস করা আপনার ঘুম ভেঙে যাওয়ার কারণে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি; এটি নফসের কল্পনাও হতে পারে।
সারসংক্ষেপ ও করণীয়:
১. আপনার স্বপ্নটি শুভ; বিশেষ করে আব্বাকে সুস্থ-সবল, ফর্সা, হাস্যময় দেখা এবং “তুমি যা পাঠাও সব আমি পাই” বলা—এটি তার জন্য আপনার দোয়া-সদকা কবুল হওয়ার সুসংবাদ।
২. আপনি নিয়মিত আপনার আব্বার জন্য দোয়া, ইস্তিগফার, সদকা, কুরআন তিলাওয়াত (বিশেষ করে সূরা ইয়াসিন, সূরা মুলক, সূরা ফাতিহা) করুন এবং সওয়াব তার রুহের কাছে পৌঁছানোর নিয়ত করুন।
৩. কবর ভাঙা বা আলগা দেখে ভয় পাওয়ার কিছু নেই; বরং এটি আপনার আব্বার জন্য বেশি বেশি দোয়ার তাগিদ।
৪. স্বপ্নের ব্যাখ্যাকে চূড়ান্ত সত্য মনে না করে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন এবং শরিয়তের বিধান মেনে চলুন।
৫. আপনার আব্বার জন্য সদকায়ে জারিয়া হিসেবে কোনো দ্বীনি প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদরাসা বা এতিমখানায় দান করুন; এতে তার কবরের আজাব থেকে মুক্তি ও মর্যাদা বৃদ্ধির আশা করা যায়।
আল্লাহ তাআলা আপনার আব্বার কবরকে নূরে ভরিয়ে দিন, তাকে জান্নাতুল ফিরদাউসে উচ্চ মর্যাদা দান করুন এবং আপনাকে সবর ও শান্তি দান করুন। আমিন।
والله أعلم بالصواب