তালাকের শর্ত, শর্তযুক্ত তালাক কি বাইন হয়, দ্বিতীয় তালাকের বিধান এবং ইদ্দতের মধ্যে রুজুর পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চাই?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আসসালামু আলাইকুম সম্মানিত শাইখ আমার প্রশ্ন হলো :*
গতো বছরে আমার আব্বুর সাথে কিছু কারনে আমার স্বামীর কিছু মনোমালিন্য হয়। তখন প্রায় কয়েক মাস আব্বু আমাদের সাথে কথা দেখা সাক্ষাত কিছুই করেননি আমার আব্বু অনেক রাগি একজন মানুষ কিছু ভুল বোঝাবোঝির জন্য এমন হয়েছিল। এই সময় আমার আম্মা বাংলাদেশ এ ছিলেন উল্লেখ্য যে আমরা সবাই আমার হাসবেন্ড আব্বু আম্মু ভাই বোন সবাই কাতারে থাকি। জামেলার সময় আমার আম্মু বাংলাদেশে এ ছিলেন। একদিন আমার আব্বু আম্মুকে দেশে থাকা অবস্তায় ফোন দিয়ে আমাদেরকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এক পর্যায়ে ঝগড়া লেগে যায় তারপর কথা বলার এক পর্যায়ে আব্বু জিজ্ঞাসা করেন তুমার কি ওর(জামাতা-মেয়ের জামাই) কি ফোনে কথা হয়? তখন আম্মু বললেন না, তারপর আব্বু বললেন যদি অর(জামাতা) সাথে তুমি ফোনে কথা বলো তাহলে তুমি তালাক । এর দুই তিনদিন পর আব্বু আম্মুকে আবার জিজ্ঞাসা করেন তোমার কি অর সাথে ফোনে কথা হইছে মনে রেখো যদি অর সাথে কথা বলো তাহলে তুমি ছাড়া উল্লেখ্য যে এই বিষয়টা সংঘটিত হওয়ার সময় আব্বু ও আমার হাসবেন্ড কাতারে ছিলেন আম্মা দেশে ছিলেন। পরে এই ঘটনার প্রায় ২মাস পর আমার আম্মু কাতারে আসলেন কিন্তু আমার আম্মু আমার হাসবেন্ড এর সাথে কোনো কথা বলেননি কারন আব্বু যেহেতু শর্ত দিয়েছিলেন তাই।
তারপর যখন ঈদ আসলো রুজার ঈদ আমার আম্মা আব্বাকে বললেন যে তুমি এমন একটা কাজ করে রাখলা আমি আমার মেয়ে জামাতার সাথে কথাই বলতে পারিনা সাথে সাথে আব্বু উঠে বললেন আমি আবার কি করলাম তুমি কেন কথা বলো না। যেহেতু আব্বু অনেক বেশি রাগি তাই আম্মু আর কথা বাড়ায় নি।
আম্মু আরও দুই তিনবার আব্বুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন আমার হাসবেন্ড এর সাথে কথা বলার প্রসঙ্গে, কখনো এমন হয়েছে যে আব্বু কোন উত্তরই দিতেন না আবার এমনও হয়েছে আব্বু দুই,তিনবার আম্মুকে বলছে আম্মু নাকি আমার হাসবেন্ড এর সাথে কথা বলার জন্য পাগল হয়েগেছে। আর আম্মু কাতার আসার পর সম্পর্ক এবং সবকিছুই নরমাল ও সুন্দর হয়ে যায় আগের মতই আমার আব্বুর সাথে আমার হাসবেন্ড এর।
এখন কি আম্মু উনার জামাতার সাথে কথা বলতে পারবেন সরাসরি, ফোনে কথা বলা ব্যতীত। এই অবস্থায় করণীয় কি?
আপনাদের উত্তর :-
n Fri, Sep 11, 2026, 11:31 IslamQA Pro <[email protected]> wrote:
This answer is according to the Hanafi school of thought.
This answer was reviewed and published by Mufti Oli Ullah.
উত্তর (সংক্ষেপে):
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নে বর্ণিত বিবরণ অনুযায়ী আপনার আব্বু আপনার আম্মুকে বলেছিলেন, যদি অর(জামাতা) সাথে তুমি ফোনে কথা বলো তাহলে তুমি তালাক ।
তার কিছুদিন পর বলেছিলো,
তোমার কি অর সাথে ফোনে কথা হইছে মনে রেখো যদি অর সাথে কথা বলো তাহলে তুমি ছাড়া।
★ এ দুই ধরনের শর্ত দ্বারা বোঝা যাচ্ছে এখানে আপনার আব্বু মূলত আপনার জামাইয়ের সাথে কথা বলতে নিষেধ করছে এবং কথা বলার সাথে তালাকের শর্ত যুক্ত করেছে।
প্রথমবার ফোনে কথার বলার সাথে তালাককে শর্ত যুক্ত করেছে, দ্বিতীয় বার এমনিতেই শুধু কথা বলার সাথে তালাককে সাথে শর্ত যুক্ত করেছে।
সুতরাং আপনার আম্মু যদি আপনার স্বামীর সাথে ফোনে হোক বা এমনিতেই সামনাসামনি হোক কথা বলেন, তাহলে আপনার আম্মুর উপর তালাক পতিত হয়ে যাবে।
এক্ষেত্রে এর থেকে বাঁচার পদ্ধতি হলো, আপনার আম্মু আপনার জামাইয়ের সাথে কথা বলবে, এরপর শর্তমাফিক আপনার আম্মুর উপর একতালাক পতিত হয়ে যাবে।
তারপর ইদ্দত চলাকালীন সময়ের মধ্যে আপনার আব্বু আপনার আম্মুকে ফিরিয়ে নেবে।
মৌখিকভাবে ফিরে নিলাম বললেও হবে, অথবা তার সাথে স্বামী সুলভ দৈহিক আচরণ করলেও হবে।
والله أعلم بالصواب
আমার আবার প্রশ্ন
আসসালামু আলাইকুম ২য় বার যখন বলসিলেন ঠিক আছে উনি বলেছিলেন যে তুমার কি অর সাথে কথা হয় যেহেতু আব্বা ফনেই ছিলেন ফনেই বলসেন তাই অই সময়ে হয়তো ফনের কথা আর উল্লেখ্য হয়নি। যেহেতু আব্বার অনেক রাগ ছিলো আমার স্বামীর উপর। এখন আমার আম্মার তো আর এক তালাক আব্বা দিয়েছিলেন আবার গ্রহন ও করেলিছেন আম্মাকে সময়ের মধ্যে এখন যদি তালাক পতিত হয় তাহলে এইটা ২য় তালাক হবে। আমরা মাসালা জেনেছিলাম যে শর্ত দিয়ে তালাক হলে তালাকে বাইন হয় আবার বিয়ে হতে হবে উনাদের এখন শাইখ এই অবস্তায় করনিয় কি। জাযাকাল্লাহ খাইরান
এখন আমার আম্মা কি কথা বলতে পারবেন বা যদি এক তালাক পতিত হয় এটা ২য় তালাক হবে এর পরে নিয়ম কি বাবাকে মুখে স্বীকার করতে হবে ৩মাসের ভিতর? শাইখ জানাবেন প্লিজ৷ জাযাকাল্লাহু খাইরান
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সম্মানিত প্রশ্নকর্তা, আপনার প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর নিচে প্রদান করা হচ্ছে। প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন, তারপর আপনার নির্দিষ্ট প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া হবে।
প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা : শর্তযুক্ত তালাক কি বাইন হয়?
আপনি লিখেছেন—"আমরা মাসআলা জেনেছিলাম যে শর্ত দিয়ে তালাক হলে তালাকে বাইন হয় আবার বিয়ে হতে হবে।" — এই ধারণাটি সম্পূর্ণ সঠিক নয়।
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, শর্তযুক্ত তালাক (তালাক মুআল্লাক) সাধারণত তালাকে রাজঈ হয়, তালাকে বাইন নয়। অর্থাৎ, শর্ত পূরণ হলে এক তালাকে রাজঈ পতিত হয়, এবং ইদ্দতের মধ্যে স্বামী রুজু (ফিরিয়ে নেওয়া) করতে পারে—নতুন করে বিয়ে ও মোহরের প্রয়োজন হয় না।
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৪৪ — "التعليق بالشرط لا يغير حكم الطلاق، فيكون رجعيا إلا إذا كانت الطلقة ثالثة أو كانت بائنة بلفظ آخر"
- আল-হিদায়া, কিতাবুত তালাক — শর্তযুক্ত তালাকের হুকুম সাধারণ তালাকের মতোই; প্রথম বা দ্বিতীয় তালাক হলে তা রাজঈ।
- ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৫৪ — "إذا علق الطلاق بشرط فوجد الشرط وقع الطلاق رجعيا"
তবে হ্যাঁ, যদি তালাকের সাথে "বাইন" শব্দ বলা হয়, বা তালাকে মুগাল্লাজা (তিন তালাক) হয়, অথবা খুলআ হয়—তাহলে বাইন হবে। আপনার ক্ষেত্রে যেহেতু শুধু "তালাক" শব্দ বলা হয়েছে, তাই এটি তালাকে রাজঈ হবে।
আপনার মূল প্রশ্নের উত্তর
১. আপনার আম্মা কি এখন জামাতার (আপনার স্বামীর) সাথে কথা বলতে পারবেন?
উত্তর: আপনার আব্বু দু'বার শর্ত দিয়েছেন:
| ক্রম | শর্ত | পরিধি | |------|------|--------| | প্রথমবার | "যদি অর (জামাতা) সাথে তুমি ফোনে কথা বলো তাহলে তুমি তালাক" | শুধু ফোনে কথা বলা | | দ্বিতীয়বার | "যদি অর সাথে কথা বলো তাহলে তুমি ছাড়া" | যেকোনো ধরনের কথা বলা (ফোন বা সরাসরি) |
দ্বিতীয় শর্তটি সাধারণ (আম) — এতে "কথা বলা" শব্দটি ব্যাপক, যা ফোন ও সরাসরি উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে। তাই আপনার আম্মা যদি সরাসরি (সামনাসামনি) আপনার স্বামীর সাথে কথা বলেন, তাহলেও শর্ত পূরণ হয়ে তালাক পতিত হবে।
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৪৫ — "إذا علق الطلاق بالكلام فهو عام يشمل كل كلام"
- ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৪২ — শর্তের সাধারণ শব্দ ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য হয়।
সুতরাং: আপনার আম্মা বর্তমানে সরাসরি বা ফোনে—কোনোভাবেই আপনার স্বামীর সাথে কথা বলতে পারবেন না, যতক্ষণ না শর্তমাফিক তালাক পতিত হয়ে রুজু সম্পন্ন হয়।
২. যদি এখন তালাক পতিত হয়, এটি কি দ্বিতীয় তালাক হবে?
উত্তর: হ্যাঁ, এটি দ্বিতীয় তালাক হবে।
কারণ:
- আপনার আব্বু প্রথমে এক তালাক দিয়েছিলেন (শর্ত পূরণ হলে)।
- এরপর ইদ্দতের মধ্যে রুজু করেছেন (ফিরিয়ে নিয়েছেন)।
- এখন আবার শর্ত পূরণ হলে দ্বিতীয় তালাক পতিত হবে।
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৫০ — "الرجعة بعد الطلاق الرجعي لا تبطل عدد الطلاق، فإذا طلق ثانيا كان ثانيا"
- আল-হিদায়া — রুজুর পর নতুন তালাক হলে তা সংখ্যায় যোগ হয়।
৩. দ্বিতীয় তালাক পতিত হলে করণীয় কী? বাবাকে কি মুখে স্বীকার করতে হবে ৩ মাসের ভিতর?
উত্তর: এখানে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন:
(ক) দ্বিতীয় তালাকও তালাকে রাজঈ হবে
যেহেতু এটি দ্বিতীয় তালাক (তালাকে মুগাল্লাজা নয়), তাই এটি তালাকে রাজঈ। অর্থাৎ, ইদ্দতের মধ্যে আপনার আব্বু আবার রুজু করতে পারবেন—নতুন বিয়ে বা মোহরের প্রয়োজন নেই।
(খ) রুজুর পদ্ধতি
রুজু দু'ভাবে হতে পারে:
- মৌখিকভাবে: "আমি তোমাকে ফিরিয়ে নিলাম" বা "রুজু করলাম" বলে দেওয়া।
- দৈহিক সম্পর্ক: স্বামী-স্ত্রীসুলভ আচরণ (সহবাস বা তার ভূমিকা) করলে রুজু হয়ে যায়।
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৫২ — "الرجعة تحصل بالقول أو بالفعل"
- ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৫৬
(গ) ৩ মাসের ভিতর স্বীকার করার বিষয়
এখানে "৩ মাস" বলতে ইদ্দতকাল বোঝানো হয়েছে। ইদ্দত হলো:
- তিন হায়েজ (ঋতু) — যদি আপনার আম্মা ঋতুবতী হন।
- তিন মাস — যদি ঋতু বন্ধ হয়ে গেছে (মেনোপজ)।
- সন্তান জন্মদান — যদি গর্ভবতী হন।
ইদ্দতের মধ্যে রুজু করতে হবে। ইদ্দত শেষ হয়ে গেলে রুজু আর বৈধ হবে না; তখন নতুন করে বিয়ে করতে হবে (নতুন মোহর ও নতুন আকদ সহ)।
রেফারেন্স:
- সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২২৮ — "وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ"
- রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৫৩
(ঘ) "বাবাকে মুখে স্বীকার করতে হবে" — এর অর্থ
আপনার আব্বুকে (স্বামীকে) মুখে রুজু ঘোষণা করতে হবে—অর্থাৎ "আমি তোমাকে ফিরিয়ে নিলাম" বলে দেওয়া। এটি ইদ্দতের মধ্যে করতে হবে। তবে যদি দৈহিক সম্পর্ক হয়, তাহলে মুখে বলার প্রয়োজন নেই—তা দ্বারাও রুজু হয়ে যায়।
সারসংক্ষেপ ও করণীয়
| বিষয় | বিধান | |------|--------| | আপনার আম্মা কি এখন জামাতার সাথে কথা বলতে পারবেন? | না — সরাসরি বা ফোনে কোনোভাবেই নয়, যতক্ষণ না শর্তমাফিক তালাক পতিত ও রুজু সম্পন্ন হয়। | | শর্ত পূরণ হলে কী হবে? | দ্বিতীয় তালাক পতিত হবে (তালাকে রাজঈ)। | | তালাক কি বাইন হবে? | না — শর্তযুক্ত তালাক সাধারণত রাজঈ হয়, বাইন নয় (যদি না "বাইন" শব্দ বলা হয় বা তালাকে মুগাল্লাজা হয়)। | | করণীয় কী? | ইদ্দতের মধ্যে আপনার আব্বু মুখে রুজু করবেন ("ফিরিয়ে নিলাম") অথবা দৈহিক সম্পর্ক করবেন। | | কতদিনের মধ্যে? | ইদ্দতকালের মধ্যে (৩ হায়েজ বা ৩ মাস বা সন্তান জন্ম)। | | ইদ্দত শেষ হলে? | নতুন করে বিয়ে করতে হবে (নতুন আকদ ও মোহর)। |
একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
যেহেতু বিষয়টি অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং আপনার পরিবারের ভবিষ্যৎ সম্পর্কিত, আপনার এলাকার কোনো নির্ভরযোগ্য মুফতি বা দারুল ইফতার কাছে সরাসরি গিয়ে বিস্তারিতভাবে মাসআলা জেনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। অনলাইনে সংক্ষিপ্ত উত্তরের মাধ্যমে সব দিক বিবেচনা করা কঠিন।
বিশেষত:
- আপনার আম্মার বয়স ও ঋতুর অবস্থা
- তালাকের শব্দগুলো হুবহু কী ছিল
- প্রথম তালাকের পর রুজু কীভাবে হয়েছিল
- আপনার আব্বুর নিয়ত কী ছিল
—এসব বিষয় বিবেচনা করে চূড়ান্ত ফতোয়া দেওয়া প্রয়োজন।
والله أعلم بالصواب