সুদের টাকা দান করার উপায়
Zakat and Charity · Hanafi
Question
Answer
বিস্তারিত উত্তর
১. ইসলামী ব্যাংকের মুনাফার হুকুম
ইসলামী ব্যাংক শরিয়াহভিত্তিক পরিচালিত হলেও, সেভিংস একাউন্টে যে মুনাফা দেওয়া হয়, তা মূলত ব্যাংকের লাভ-ক্ষতির প্রকৃত হিসাবের ভিত্তিতে নয়; বরং একটি নির্দিষ্ট হারে (রেট) দেওয়া হয়। তাই ফকীহগণের অনেকেই এই মুনাফাকে সুদের সন্দেহযুক্ত (শুভহাতে সুদ) বলেছেন।
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন—ইসলামী ব্যাংকের সেভিংস একাউন্টের মুনাফা যদি প্রকৃত লাভ-ক্ষতির অনুপাতে না হয়, বরং নির্দিষ্ট হারে হয়, তাহলে তা সুদেরই শামিল। আর যদি প্রকৃত লাভ-ক্ষতির ভিত্তিতে হয়, তাহলে তা হালাল। (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩৭৫-৩৭৬)
২. সুদের টাকা দান করার বিধান
সুদের টাকা নিজের জন্য রাখা, খাওয়া, ব্যবহার করা হারাম। তবে সুদের টাকা সওয়াবের নিয়ত ছাড়া গরিব-দুঃখীদের দান করে দেওয়া জায়েজ। এতে সুদ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
রদ্দুল মুহতার-এ আছে:
وَيَجُوزُ لِلْمُسْلِمِ أَنْ يَصْرِفَ الرِّبَا إِلَى الْفُقَرَاءِ بِلَا نِيَّةِ الثَّوَابِ অর্থ: মুসলিমের জন্য সুদের টাকা সওয়াবের নিয়ত ছাড়া গরিবদের মধ্যে ব্যয় করা জায়েজ। (রদ্দুল মুহতার, ৫/২৪৭)
ফাতাওয়া আলমগিরি-তে আছে:
الرِّبَا لَا يَحِلُّ لِلْمُسْلِمِ أَخْذُهُ وَلَكِنْ يَتَصَدَّقُ بِهِ অর্থ: সুদ মুসলিমের জন্য গ্রহণ করা হালাল নয়, তবে তা দান করে দেবে। (ফাতাওয়া আলমগিরি, ৩/২২৮)
৩. প্রশ্নের প্রথম অংশ: এখন পর্যন্ত জমা হওয়া মুনাফা দান করলে সুদমুক্ত হবেন কি?
হ্যাঁ, যদি আপনি এখন পর্যন্ত যত মুনাফা এসেছে, তার সমপরিমাণ বা তার চেয়ে বেশি দান করে দেন, তাহলে সেই মুনাফা থেকে সুদমুক্ত হয়ে যাবেন। কারণ সুদের টাকা দান করে দিলে তা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
তবে শর্ত হলো:
- সওয়াবের নিয়ত ছাড়া দান করতে হবে।
- দানের সময় শুধু সুদের টাকা হিসেবে দান করতে হবে, যাকাত হিসেবে নয়।
- যাকাত ফান্ডে দিলে সেটি যাকাত হিসেবে গণ্য হবে না; বরং সুদ দূর করার জন্য দান হিসেবে গণ্য হবে।
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন—সুদের টাকা যাকাতের খাতেই দিলেও তা যাকাত হিসেবে গণ্য হবে না; বরং সুদ দূর করার জন্য দান হিসেবে গণ্য হবে। (মাআরিফুল কুরআন, ১/৩৪৫)
৪. প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশ: ভবিষ্যতের সুদ অগ্রীম দান করা যাবে কি?
অগ্রীম দান করা যাবে না। কারণ যে টাকা এখনো আসেনি, তা এখনো আপনার মালিকানায় আসেনি। সুদ দূর করার জন্য দান করতে হয় সুদ আসার পর। তাই ভবিষ্যতের সুদের জন্য আগে থেকে দান করা ঠিক নয়।
তবে একটি সমাধান আছে—আপনি একটি আলাদা হিসাব রাখতে পারেন, যেখানে সুদের টাকা জমা হবে। যখনই মুনাফা আসবে, তখনই তা দান করে দেবেন। অথবা মাস শেষে বা কয়েক মাস পরপর জমা হওয়া মুনাফা হিসাব করে দান করবেন।
ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে আছে:
الرِّبَا لَا يَجِبُ أَدَاؤُهُ قَبْلَ حُصُولِهِ
অর্থ: সুদ আসার আগে তা আদায় করা ওয়াজিব নয়। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৩/৪৯)
৫. ব্যবহারিক সমাধান
১. প্রতি মাসে মুনাফা আসার পর তা হিসাব করে দান করে দিন। ২. যদি অল্প অল্প আসে, তাহলে কয়েক মাস পরপর জমা করে দান করুন। ৩. দানের সময় সওয়াবের নিয়ত করবেন না; বরং শুধু সুদ থেকে মুক্তি পাওয়ার নিয়ত করবেন। ৪. যাকাত ফান্ডে দিলে তা যাকাত হিসেবে গণ্য হবে না; বরং সুদ দূর করার দান হিসেবে গণ্য হবে। ৫. ভবিষ্যতের সুদের জন্য আগে থেকে দান করবেন না; বরং সুদ আসার পর দান করবেন।
উপদেশ
সুদের টাকা থেকে বাঁচার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো—সেভিংস একাউন্টের বদলে চলতি (কারেন্ট) একাউন্ট ব্যবহার করা, যেখানে কোনো মুনাফা আসে না।