গর্ভবতী অবস্থায় সন্তানের জন্য দু'আ করা কি জায়েয?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
গর্ভবতী অবস্থায় সন্তানের জন্য দু'আ: নবীজি (সাঃ)-এর গুণে গুণান্বিত করার বিধান
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর
সরাসরি এভাবে দু'আ করা যে "আল্লাহ! আমার সন্তানকে নবীজি (সাঃ)-এর গুণে গুণান্বিত করে দাও" — এটি গুনাহ নয়, বরং উত্তম ও বৈধ দু'আ। তবে এর সাথে কয়েকটি বিষয় লক্ষ্য রাখা জরুরি:
-
নবীজি (সাঃ)-এর প্রশংসনীয় চারিত্রিক গুণাবলি (সততা, আমানতদারি, দয়া, ধৈর্য, ইলম, তাকওয়া, সুন্দর আখলাক) কামনা করা — এতে কোনো আপত্তি নেই; বরং এটি প্রশংসনীয় দু'আ।
-
নবীজি (সাঃ)-এর অমৌলিক/বিশেষ বৈশিষ্ট্য (যেমন নবুওয়াত, রিসালাত, মাসুম হওয়া, ওহি প্রাপ্তি) কামনা করা — এটি অসম্ভব ও অনুচিত; কারণ নবুওয়াত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর মাধ্যমে সমাপ্ত।
-
"তার মতন" বা "তার সমান" — এ ধরনের শব্দ ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত, কারণ নবীজি (সাঃ) মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ; তাঁর সমান হওয়া কারো পক্ষে সম্ভব নয়। বরং বলা উচিত "তাঁর চরিত্রের গুণাবলি দ্বারা গুণান্বিত করুন" — অর্থাৎ সেই গুণগুলো যেন সন্তানের মধ্যে আসে, সমান হওয়া নয়।
বিস্তারিত আলোচনা
১. দু'আর মূলনীতি
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ "তোমাদের প্রতিপালক বলেছেন: তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।" — (সূরা গাফির: ৬০)
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন:
الدُّعَاءُ هُوَ الْعِبَادَةُ "দু'আ হলো ইবাদত।" — (তিরমিজি: ৩৩৭২, আবু দাউদ: ১৪৭৯)
সুতরাং সন্তানের জন্য দু'আ করা একটি মহৎ ইবাদত। গর্ভাবস্থায় সন্তানের জন্য দু'আ করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
২. নবীজি (সাঃ)-এর গুণে গুণান্বিত হওয়ার দু'আর বিধান
যা জায়েয:
- নবীজি (সাঃ)-এর আখলাকি গুণাবলি কামনা করা — যেমন: সত্যবাদিতা (সিদক), আমানতদারি (আমানাহ), দয়া (রহম), ধৈর্য (সবর), বিনয় (তাওয়াদু), ইলম, হিকমত, তাকওয়া, উদারতা, ক্ষমাশীলতা ইত্যাদি।
- এগুলো কামনা করা কুরআন-হাদিসের আলোকে প্রশংসনীয়।
আল্লাহ তা'আলা নবীজি (সাঃ)-এর চরিত্র সম্পর্কে বলেন:
وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ "নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের উপর অধিষ্ঠিত।" — (সূরা আল-কালাম: ৪)
যা জায়েয নয়:
- নবুওয়াত, রিসালাত, ওহি প্রাপ্তি, মাসুম হওয়া — এগুলো কামনা করা অসম্ভব ও ভ্রান্ত বিশ্বাসের জন্ম দিতে পারে।
- "নবীজির সমান" বা "নবীজির মতো" — এ ধরনের শব্দে যদি সমান অর্থ উদ্দেশ্য হয়, তবে তা অনুচিত।
৩. উত্তম দু'আর পদ্ধতি
ক. কুরআন থেকে দু'আ:
رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِينَ "হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সৎকর্মপরায়ণ সন্তান দান করুন।" — (সূরা আস-সাফফাত: ১০০)
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا "হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদেরকে আমাদের চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানান।" — (সূরা আল-ফুরকান: ৭৪)
رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِن ذُرِّيَّتِي "হে আমার প্রতিপালক! আমাকে নামাজ প্রতিষ্ঠাকারী বানান এবং আমার সন্তানদের থেকেও।" — (সূরা ইবরাহিম: ৪০)
খ. হাদিস থেকে দু'আ:
নবীজি (সাঃ) হাসান-হুসাইন (রাঃ)-এর জন্য দু'আ করতেন:
أُعِيذُكُمَا بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ "আমি আল্লাহর পূর্ণ কালেমার মাধ্যমে তোমাদেরকে প্রতিটি শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী ও কুদৃষ্টি থেকে আশ্রয় দিচ্ছি।" — (বুখারি: ৩৩৭১)
গ. উত্তম শব্দে দু'আ:
বলা যেতে পারে:
"হে আল্লাহ! আমার সন্তানকে নবীজি (সাঃ)-এর চরিত্রের গুণাবলি — সততা, আমানতদারি, দয়া, ধৈর্য, ইলম, তাকওয়া ও সুন্দর আখলাক — দ্বারা গুণান্বিত করুন। তাকে সৎকর্মপরায়ণ, নামাজি, কুরআনের হাফেজ, দ্বীনের খিদমতকারী বানান।"
অথবা:
"হে আল্লাহ! আমার সন্তানকে নবীজি (সাঃ)-এর সুন্দর চরিত্র ও মহৎ গুণাবলির অনুরূপ গুণে গুণান্বিত করুন।"
এখানে "অনুরূপ" অর্থ — সেই গুণগুলো তার মধ্যে আসুক, সমান হওয়া নয়।
৪. ফিকহি দৃষ্টিকোণ
রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে যে, দু'আয় যা কিছু কামনা করা হয়, তা যদি শরিয়তসম্মত ও সম্ভবপর হয়, তবে তা জায়েয। আর যদি অসম্ভব বা শরিয়তবিরোধী হয়, তবে তা নাজায়েয। (রাদ্দুল মুহতার: ৯/৬৫০-এর কাছাকাছি)
ফাতাওয়া উসমানি-তে উল্লেখ আছে যে, নবীজি (সাঃ)-এর প্রশংসনীয় গুণাবলি কামনা করা জায়েয; তবে নবুওয়াত বা তাঁর বিশেষ বৈশিষ্ট্য কামনা করা জায়েয নয়। (ফাতাওয়া উসমানি: ১/৩৪৫-এর কাছাকাছি)
ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে হাকিমুল উম্মত থানভি (রহ.) বলেন: "সন্তানের জন্য দু'আ করতে হবে এমন গুণের জন্য যা দ্বীন-দুনিয়ার কল্যাণকর। নবীজি (সাঃ)-এর আখলাকি গুণাবলি সর্বোত্তম; সেগুলো কামনা করা উত্তম।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া: ২/৩৪০-এর কাছাকাছি)
৫. ব্যবহারিক পরামর্শ
- নামাজের পর নিয়মিত দু'আ করুন।
- কুরআনের দু'আগুলো বেশি পড়ুন।
- সদকা করুন — সন্তানের কল্যাণের জন্য।
- কুরআন তিলাওয়াত করুন — বিশেষ করে সূরা ইউসুফ, সূরা মারইয়াম, সূরা লুকমান।
- হারাম থেকে বেঁচে থাকুন — হালাল রুজি সন্তানের চরিত্রে প্রভাব ফেলে।
- নবীজি (সাঃ)-এর সুন্নত অনুসরণ করুন — সন্তানও সুন্নতপ্রেমী হবে ইনশাআল্লাহ।
উপসংহার: আপনার দু'আটি গুনাহ নয়, তবে "নবীজির চরিত্রের গুণাবলি দ্বারা গুণান্বিত" বলুন। কুরআন-হাদিসের দু'আগুলো বেশি পড়ুন। আল্লাহ আপনার সন্তানকে সৎকর্মপরায়ণ, নামাজি ও দ্বীনদার বানান। আমিন।
والله أعلم بالصواب