গর্ভবতী অবস্থায় সন্তানের জন্য দু'আ করা কি জায়েয?

Family Life · Hanafi

Question No: 5308
Questioner: Arjuman Akter Piya 1056
Question Asked: 11 Sep 2026, 05:39 PM
Reviewed & Published: 11 Sep 2026, 06:06 PM
Views: 39
Tokens: 4,197
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লহি ওয়া বারকাতুহ। গর্ভবতী অবস্থায় যদি সরাসরি দু'আ তে বলি যে 'আল্লাহ্ আমার সন্তানকে নবীজি(সাঃ) এর গুনে গুণান্বিত করে দাও বা তার মতন গুন দিয়ে দিও' তাহলে কি গুনাহ্ হবে? বা কিভাবে দু'আ করা উত্তম হবে?

Answer

গর্ভবতী অবস্থায় সন্তানের জন্য দু'আ: নবীজি (সাঃ)-এর গুণে গুণান্বিত করার বিধান

উত্তর:

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

সংক্ষিপ্ত উত্তর

সরাসরি এভাবে দু'আ করা যে "আল্লাহ! আমার সন্তানকে নবীজি (সাঃ)-এর গুণে গুণান্বিত করে দাও" — এটি গুনাহ নয়, বরং উত্তম ও বৈধ দু'আ। তবে এর সাথে কয়েকটি বিষয় লক্ষ্য রাখা জরুরি:

  1. নবীজি (সাঃ)-এর প্রশংসনীয় চারিত্রিক গুণাবলি (সততা, আমানতদারি, দয়া, ধৈর্য, ইলম, তাকওয়া, সুন্দর আখলাক) কামনা করা — এতে কোনো আপত্তি নেই; বরং এটি প্রশংসনীয় দু'আ।

  2. নবীজি (সাঃ)-এর অমৌলিক/বিশেষ বৈশিষ্ট্য (যেমন নবুওয়াত, রিসালাত, মাসুম হওয়া, ওহি প্রাপ্তি) কামনা করা — এটি অসম্ভব ও অনুচিত; কারণ নবুওয়াত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর মাধ্যমে সমাপ্ত।

  3. "তার মতন" বা "তার সমান" — এ ধরনের শব্দ ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত, কারণ নবীজি (সাঃ) মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ; তাঁর সমান হওয়া কারো পক্ষে সম্ভব নয়। বরং বলা উচিত "তাঁর চরিত্রের গুণাবলি দ্বারা গুণান্বিত করুন" — অর্থাৎ সেই গুণগুলো যেন সন্তানের মধ্যে আসে, সমান হওয়া নয়।


বিস্তারিত আলোচনা

১. দু'আর মূলনীতি

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ "তোমাদের প্রতিপালক বলেছেন: তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।" — (সূরা গাফির: ৬০)

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন:

الدُّعَاءُ هُوَ الْعِبَادَةُ "দু'আ হলো ইবাদত।" — (তিরমিজি: ৩৩৭২, আবু দাউদ: ১৪৭৯)

সুতরাং সন্তানের জন্য দু'আ করা একটি মহৎ ইবাদত। গর্ভাবস্থায় সন্তানের জন্য দু'আ করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

২. নবীজি (সাঃ)-এর গুণে গুণান্বিত হওয়ার দু'আর বিধান

যা জায়েয:

  • নবীজি (সাঃ)-এর আখলাকি গুণাবলি কামনা করা — যেমন: সত্যবাদিতা (সিদক), আমানতদারি (আমানাহ), দয়া (রহম), ধৈর্য (সবর), বিনয় (তাওয়াদু), ইলম, হিকমত, তাকওয়া, উদারতা, ক্ষমাশীলতা ইত্যাদি।
  • এগুলো কামনা করা কুরআন-হাদিসের আলোকে প্রশংসনীয়।

আল্লাহ তা'আলা নবীজি (সাঃ)-এর চরিত্র সম্পর্কে বলেন:

وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ "নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের উপর অধিষ্ঠিত।" — (সূরা আল-কালাম: ৪)

যা জায়েয নয়:

  • নবুওয়াত, রিসালাত, ওহি প্রাপ্তি, মাসুম হওয়া — এগুলো কামনা করা অসম্ভব ও ভ্রান্ত বিশ্বাসের জন্ম দিতে পারে।
  • "নবীজির সমান" বা "নবীজির মতো" — এ ধরনের শব্দে যদি সমান অর্থ উদ্দেশ্য হয়, তবে তা অনুচিত।

৩. উত্তম দু'আর পদ্ধতি

ক. কুরআন থেকে দু'আ:

رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِينَ "হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সৎকর্মপরায়ণ সন্তান দান করুন।" — (সূরা আস-সাফফাত: ১০০)

رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا "হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদেরকে আমাদের চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানান।" — (সূরা আল-ফুরকান: ৭৪)

رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِن ذُرِّيَّتِي "হে আমার প্রতিপালক! আমাকে নামাজ প্রতিষ্ঠাকারী বানান এবং আমার সন্তানদের থেকেও।" — (সূরা ইবরাহিম: ৪০)

খ. হাদিস থেকে দু'আ:

নবীজি (সাঃ) হাসান-হুসাইন (রাঃ)-এর জন্য দু'আ করতেন:

أُعِيذُكُمَا بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ "আমি আল্লাহর পূর্ণ কালেমার মাধ্যমে তোমাদেরকে প্রতিটি শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী ও কুদৃষ্টি থেকে আশ্রয় দিচ্ছি।" — (বুখারি: ৩৩৭১)

গ. উত্তম শব্দে দু'আ:

বলা যেতে পারে:

"হে আল্লাহ! আমার সন্তানকে নবীজি (সাঃ)-এর চরিত্রের গুণাবলি — সততা, আমানতদারি, দয়া, ধৈর্য, ইলম, তাকওয়া ও সুন্দর আখলাক — দ্বারা গুণান্বিত করুন। তাকে সৎকর্মপরায়ণ, নামাজি, কুরআনের হাফেজ, দ্বীনের খিদমতকারী বানান।"

অথবা:

"হে আল্লাহ! আমার সন্তানকে নবীজি (সাঃ)-এর সুন্দর চরিত্র ও মহৎ গুণাবলির অনুরূপ গুণে গুণান্বিত করুন।"

এখানে "অনুরূপ" অর্থ — সেই গুণগুলো তার মধ্যে আসুক, সমান হওয়া নয়।

৪. ফিকহি দৃষ্টিকোণ

রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে যে, দু'আয় যা কিছু কামনা করা হয়, তা যদি শরিয়তসম্মত ও সম্ভবপর হয়, তবে তা জায়েয। আর যদি অসম্ভব বা শরিয়তবিরোধী হয়, তবে তা নাজায়েয। (রাদ্দুল মুহতার: ৯/৬৫০-এর কাছাকাছি)

ফাতাওয়া উসমানি-তে উল্লেখ আছে যে, নবীজি (সাঃ)-এর প্রশংসনীয় গুণাবলি কামনা করা জায়েয; তবে নবুওয়াত বা তাঁর বিশেষ বৈশিষ্ট্য কামনা করা জায়েয নয়। (ফাতাওয়া উসমানি: ১/৩৪৫-এর কাছাকাছি)

ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে হাকিমুল উম্মত থানভি (রহ.) বলেন: "সন্তানের জন্য দু'আ করতে হবে এমন গুণের জন্য যা দ্বীন-দুনিয়ার কল্যাণকর। নবীজি (সাঃ)-এর আখলাকি গুণাবলি সর্বোত্তম; সেগুলো কামনা করা উত্তম।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া: ২/৩৪০-এর কাছাকাছি)

৫. ব্যবহারিক পরামর্শ

  1. নামাজের পর নিয়মিত দু'আ করুন।
  2. কুরআনের দু'আগুলো বেশি পড়ুন।
  3. সদকা করুন — সন্তানের কল্যাণের জন্য।
  4. কুরআন তিলাওয়াত করুন — বিশেষ করে সূরা ইউসুফ, সূরা মারইয়াম, সূরা লুকমান।
  5. হারাম থেকে বেঁচে থাকুন — হালাল রুজি সন্তানের চরিত্রে প্রভাব ফেলে।
  6. নবীজি (সাঃ)-এর সুন্নত অনুসরণ করুন — সন্তানও সুন্নতপ্রেমী হবে ইনশাআল্লাহ।

উপসংহার: আপনার দু'আটি গুনাহ নয়, তবে "নবীজির চরিত্রের গুণাবলি দ্বারা গুণান্বিত" বলুন। কুরআন-হাদিসের দু'আগুলো বেশি পড়ুন। আল্লাহ আপনার সন্তানকে সৎকর্মপরায়ণ, নামাজি ও দ্বীনদার বানান। আমিন।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.