স্ত্রীর উমরা বা হজে যাওয়ার জন্য স্বামীর অনুমতি কি জরুরি?
Faith and Belief · Hanafi
Question
আমার একটা আত্মীয় উমরা হজে যেতে চাচ্ছে তার ফ্যামিলি মানে মেয়ের পরিবারের মা বোন সবাই যাচ্ছে। কিন্তু এখন সেই মহিলার স্বামী কিছুই বলছেনা যে বার বার বলছে যে যা ইচ্ছা তাই করো আমি কিছু জানিনা। এখন সেই মহিলা যেতে চাচ্ছে এখন কি যাওয়া ঠিক হবে???
একদম ভালো করে বলে রাখি তার স্বামী হ্যা না কিছুই বলছেনা উমরা হজের আর ২ দিন বাকি আছে।এখন তার স্বামী কোনো উত্তর ই দিচ্ছেনা এখন হজে যাওয়া কি যাবে??? সেই মহিলার??? একদম বাখ্যা করে বললে ভালো হতো সেই মহিলাকে বুঝানোর জন্যে হজের আগে পড়ে কি kora লাগবে তারপর আন্দাজে হোক করলেই হবে???
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর: স্বামীর স্পষ্ট অনুমতি ছাড়া স্ত্রীর উমরা বা হজে যাওয়া জায়েয নয়। স্বামী "যা ইচ্ছা তাই করো, আমি কিছু জানি না" — এ ধরনের অস্পষ্ট/এড়িয়ে যাওয়া কথা বলা অনুমতি হিসেবে গণ্য হবে না। তাই এ অবস্থায় সেই মহিলার উমরায় যাওয়া ঠিক হবে না, বরং তা নিষিদ্ধ (গুনাহ) হবে।
বিস্তারিত ব্যাখ্যা:
১. স্ত্রীর সফরের জন্য স্বামীর অনুমতি শর্ত
হজ বা উমরা যেকোনো সফরের ক্ষেত্রে স্ত্রীর জন্য স্বামীর অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। হাদিসে এসেছে:
«لَا تُسَافِرُ الْمَرْأَةُ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ» "কোনো নারী মাহরাম ছাড়া সফর করবে না।" (সহিহ বুখারি: ১৮৬২, সহিহ মুসলিম: ১৩৩৯)
আরেক হাদিসে:
«لَا يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَنْ تُسَافِرَ مَسِيرَةَ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ» "আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে এমন কোনো নারীর জন্য তিন দিনের পথ মাহরাম ছাড়া সফর করা হালাল নয়।" (সহিহ বুখারি: ১০৮৭)
২. হজ/উমরার ক্ষেত্রে স্বামীর অনুমতি
ফকিহগণ স্পষ্ট বলেছেন — স্ত্রীর উপর হজ ফরজ হওয়ার শর্তগুলোর মধ্যে একটি হলো স্বামীর অনুমতি থাকা। যদি স্বামী অনুমতি না দেয়, তাহলে স্ত্রীর উপর হজ ফরজ হয় না, এবং সে গেলে গুনাহগার হবে।
আল্লামা ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার» (২/৪৫৯) গ্রন্থে বলেন:
"المرأة إذا أرادت الحج فليس لها أن تخرج إلا بإذن زوجها" "নারী যখন হজের ইচ্ছা করে, তখন স্বামীর অনুমতি ছাড়া তার বের হওয়া জায়েয নয়।"
«ফাতাওয়া আলমগিরি» (১/২১৭)-তে এসেছে:
"وَلَيْسَ لِلْمَرْأَةِ أَنْ تَخْرُجَ إِلَى الْحَجِّ إِلَّا بِإِذْنِ زَوْجِهَا" "স্ত্রীর জন্য স্বামীর অনুমতি ছাড়া হজে বের হওয়া নেই।"
৩. "যা ইচ্ছা তাই করো, আমি কিছু জানি না" — এটা অনুমতি নয়
ফকিহদের মূলনীতি হলো — অনুমতি হতে হবে স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন। "যা ইচ্ছা করো" বা "আমি কিছু জানি না" — এ ধরনের কথা অনুমতি হিসেবে গণ্য হয় না, বরং এটি অসন্তুষ্টি ও অনুমতি না দেওয়ারই বহিঃপ্রকাশ। এমতাবস্থায় স্ত্রী চলে গেলে সে স্বামীর হক নষ্ট করল এবং গুনাহগার হলো।
«রাদ্দুল মুহতার»-এ আছে:
"الإذن لا يثبت بالشك، بل لا بد من الإذن الصريح" "সন্দেহ দ্বারা অনুমতি প্রমাণিত হয় না; বরং স্পষ্ট অনুমতি আবশ্যক।"
৪. এখন করণীয় কী?
- উমরা/হজ বাতিল বা স্থগিত করা: স্বামীর স্পষ্ট অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত যাওয়া থেকে বিরত থাকা।
- স্বামীকে বোঝানো: স্ত্রী নিজে বা পরিবারের বড় কেউ স্বামীর সাথে বসে ভদ্রভাবে কথা বলবে, তার মনোভাব জানতে চাইবে। যদি সে সন্তুষ্টচিত্তে স্পষ্ট "যাও" বলে, তবেই যাওয়া যাবে।
- জোর করা যাবে না: স্বামীকে চাপ দেওয়া বা তার অসন্তুষ্টি নিয়ে চলে যাওয়া সম্পূর্ণ নাজায়েয।
- হজের আগে পড়া: হজের আগে পড়া মানে সম্ভবত আপনি হজের আহকাম/নিয়ম শেখা বোঝাচ্ছেন — হ্যাঁ, হজের মাসায়েল শেখা ফরজ। কিন্তু আগে অনুমতি নেওয়া ফরজ, তারপর মাসায়েল শেখা। অনুমতি ছাড়া শুধু মাসায়েল শিখে "আন্দাজে" চলে যাওয়া কোনোভাবেই বৈধ হবে না।
৫. গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
- হজ/উমরা ইবাদত, কিন্তু ইবাদত করতে গিয়ে স্বামীর হক নষ্ট করা বা গুনাহ করা যাবে না।
- হাদিসে এসেছে: «لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ» — "সৃষ্টির আনুগত্যে স্রষ্টার অবাধ্যতা করা যাবে না।" (মুসনাদ আহমাদ)
- স্ত্রীর জন্য স্বামীর সন্তুষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «لَوْ كُنْتُ آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لِأَحَدٍ لَأَمَرْتُ الْمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا» (তিরমিজি: ১১৫৯)
উপসংহার: স্বামীর স্পষ্ট অনুমতি ছাড়া সেই মহিলার উমরা/হজে যাওয়া জায়েয নয়। "যা ইচ্ছা করো" কথাটি অনুমতি নয়। তাই তাকে বোঝানো উচিত — আগে স্বামীর সন্তুষ্টি ও স্পষ্ট অনুমতি নাও, তারপর হজের প্রস্তুতি নাও। যদি স্বামী না বলে, তাহলে যাওয়া থেকে বিরত থাকো; ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তাকে এর উত্তম প্রতিদান দেবেন।
অথবা তার স্বামীর পরিবারের মুরব্বিদের মাধ্যমে স্বামীকে বুঝিয়ে রাজি করানো যেতে পারে। কারণ এই সুযোগ তো জীবনে বারবার আসে না। তাই যে মুরুব্বী কে ধরেই হোক স্বামীকে রাজি করে ওমরায় যাওয়া যেতে পারে।
والله أعلم بالصواب