তাবিজ ব্যবহারের পর তাওবা ও করণীয়।
Family Life · Hanafi
Question
আমার বিয়ে হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ 9 বছর চলছে। আমার বিয়ের পরে আমার চারটি সন্তান হয় এমন মারা যায়। দুই বছর আগে আমার কন্যা সন্তান মারা যাওয়ার পরপরই আমার স্বামী বিয়ে করার জন্য পাগল হয়ে ওঠে। তো সে সময় আমি কষ্ট সহ্য করতে না পেরে কি করব বুঝতে না পেরে, ১). সন্তান হারানোর কষ্ট। ২).সেই মুহূর্তে স্বামী অন্য জায়গায় বিয়ে করবে এটা মেনে নিতে না পেরে বই দেখে চিকিৎসা করে ওরকম একজন লোকের কাছে গিয়েছিলাম এবং উনি আমাকে একটা তাবিজ দিয়েছিলেন ওটা ভিজিয়ে আমার স্বামীকে মিষ্টি কোন জুস খাওয়াতে বলেছিল। এমন একটা তাবিজ আমার সাথে রাখতে বলেছিল।আমার স্বামীর মনে মোহাব্বতটা বাড়ে। আমি তাই করেছিলাম। এগুলো আজকে থেকে দুই বছর আগের কথা। এসব শোনার পরে আমার আব্বু আমার স্বামীকে জড়িয়ে ধরে অনেক কান্না করেছে উনাকে বুঝিয়েছে। এখন আমার স্বামী টিকু হয়ে গিয়েছে। কিন্তু, আমার মতে সব সময় অপরাধ কাজ করছে। আমি আল্লাহর কাছে অন্তর থেকে ক্ষমা চাই সব সময় এমন তওবা করেছি হঠাৎ করে এরকম একটা কাজ করার জন্য। তারপরেও আমার অন্তরে সবসময় অপরাধ কাজ করে। সবসময় এটা মনে হয় যে মহাব্বতটা তো আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। কেন হুট করে মোহাব্বত বাড়ানোর তাবিজ নিতে গেলাম। আমি কি করবো বুঝতে পারছিনা।
আমার এখন কি করা উচিত?
Answer
উত্তর: তাবিজ ব্যবহারের পর তাওবা ও করণীয়
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রথমেই আপনার সন্তান হারানোর গভীর শোক ও কষ্টের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। আল্লাহ তাআলা আপনার ধৈর্যের প্রতিদান দিন এবং আপনার মৃত সন্তানদের জান্নাতের পথপ্রদর্শক বানিয়ে দিন। আমিন।
আপনার প্রশ্নের উত্তর কয়েকটি অংশে দেওয়া হচ্ছে:
১. তাবিজ ব্যবহারের বিধান
ক. কুরআনের আয়াত বা দুআর তাবিজ:
যদি তাবিজে কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম, বা মাসনূন দুআ লেখা থাকে এবং তা হারাম কিছু না মিশিয়ে ব্যবহার করা হয় — তবে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে এটি জায়েয। তবে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে মাকরূহ। পরবর্তী হানাফি ফকীহগণ ইমাম আবু হানিফার মতকে প্রাধান্য দিয়ে জায়েয বলেছেন।
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), খণ্ড ৬, পৃ. ৩৬৩
- ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৫৩
খ. কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে সমস্যা:
আপনি যে তাবিজ নিয়েছিলেন, সেটি কোন ধরনের তাবিজ ছিল তা নিশ্চিত নন। যদি সেটিতে:
- কুরআনের আয়াত বা আল্লাহর নাম ছিল → জায়েয (তবে মাকরূহ হওয়ার সম্ভাবনা আছে)
- জিন-শয়তানের নাম, অশ্লীল বাক্য, বা শিরকি কিছু ছিল → হারাম ও কুফরি
- সাধারণ তাবিজ-কবজ (যা আমাদের সমাজে প্রচলিত, যেখানে অজানা শব্দ থাকে) → হারাম
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৬৩
- ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩৪৫
গ. মিষ্টি জুস খাওয়ানোর বিষয়টি:
এটি স্পষ্টতই কোনো জাদু-টোনা বা শিরকি আমল-এর অংশ ছিল। কারণ ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা বাড়ানোর জন্য এ ধরনের পদ্ধতি শরিয়তে নেই। এটি হারাম।
২. আপনার করণীয় (তাওবা ও পরবর্তী পদক্ষেপ)
ক. খাঁটি তাওবা করুন:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবা করো।" — সূরা আত-তাহরিম: ৮
তাওবার শর্ত তিনটি:
- গুনাহ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা
- গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হওয়া
- ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প করা
আপনি যদি না জেনে বা ভুলে করে থাকেন, তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল। তিনি বলেন:
"নিশ্চয়ই আমি ক্ষমাশীল, দয়ালু।" — সূরা আল-হিজর: ৪৯
খ. তাবিজটি ধ্বংস করুন:
যদি তাবিজটি এখনো আপনার কাছে থাকে, তবে তা পুড়িয়ে ফেলুন বা পানিতে ভিজিয়ে মুছে ফেলুন। কারণ তাতে হারাম কিছু থাকতে পারে।
রেফারেন্স: ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩৪৬
গ. স্বামীর প্রতি ভালোবাসা আল্লাহর হাতে:
আপনি ঠিক বলেছেন — ভালোবাসা আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। আল্লাহ বলেন:
"তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি করেছেন।" — সূরা আর-রূম: ২১
তাই তাবিজ-টোনার প্রয়োজন নেই। বরং দুআ করুন:
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ "হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদেরকে আমাদের চোখের শীতলতা দান করুন।" — সূরা আল-ফুরকান: ৭৪
ঘ. স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসার জন্য মাসনূন আমল:
- সূরা আর-রূম: ২১ বেশি পড়ুন
- দরুদ শরিফ বেশি পড়ুন
- "ইয়া ওয়াদূদ" (يَا وَدُودُ) নামটি বেশি পড়ুন
- স্বামীর জন্য দুআ করুন:
اللَّهُمَّ أَلِّفْ بَيْنَنَا وَأَصْلِحْ ذَاتَ بَيْنِنَا
- সালাতুল হাজত পড়ে দুআ করুন
ঙ. আপনার স্বামীর সাথে সম্পর্ক:
আপনার আব্বু যেহেতু বিষয়টি বুঝিয়ে দিয়েছেন এবং আপনার স্বামী এখন ঠিক হয়ে গেছেন — আলহামদুলিল্লাহ। এখন আপনি:
- স্বামীর সাথে সদাচরণ করুন
- ধৈর্য ধারণ করুন
- সন্তান হারানোর কষ্ট আল্লাহর কাছে নিবেদন করুন
- অতীতের কথা তুলবেন না
৩. অন্তরে অপরাধবোধ দূর করার উপায়
আপনি বারবার তাওবা করেছেন, কিন্তু অন্তরে অপরাধবোধ থেকে যাচ্ছে। এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা। শয়তান চায় আপনি হতাশ হয়ে পড়ুন।
আল্লাহর বাণী:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন।" — সূরা আল-বাকারা: ২২২
হাদিস:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি তাওবা করে, সে যেন গুনাহই করেনি।" — ইবনে মাজাহ: ৪২৫০
তাই আপনি নিশ্চিত থাকুন — আল্লাহ আপনার তাওবা কবুল করেছেন। আর অপরাধবোধকে কাজে লাগিয়ে বেশি বেশি ইবাদত করুন।
৪. সংক্ষিপ্ত করণীয় তালিকা
| ক্রম | করণীয় | |------|--------| | ১ | তাবিজটি ধ্বংস করুন | | ২ | খাঁটি তাওবা করুন (শর্তসহ) | | ৩ | বেশি বেশি ইস্তিগফার পড়ুন | | ৪ | স্বামীর সাথে সদাচরণ করুন | | ৫ | সূরা আর-রূম: ২১ ও দরুদ পড়ুন | | ৬ | "ইয়া ওয়াদূদ" বেশি পড়ুন | | ৭ | অতীতের কথা ভুলে যান | | ৮ | সন্তানদের জন্য দুআ করুন | | ৯ | ওয়াসওয়াসা দূর করতে আউযুবিল্লাহ পড়ুন | | ১০ | প্রয়োজনে বিশ্বস্ত আলেমের পরামর্শ নিন |
৫. বিশেষ নোট
আপনার স্বামী যদি এখন ঠিক হয়ে থাকেন এবং সন্তুষ্ট থাকেন, তবে আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু যদি আবার সমস্যা হয়, তবে তাবিজ-টোনার পথে যাবেন না। বরং:
- সালাতুল হাজত পড়ুন
- কুরআন তিলাওয়াত করুন
- সদকা করুন
- বিশ্বস্ত আলেমের পরামর্শ নিন
আল্লাহ তাআলা আপনার সংসারকে সুখী ও শান্তিময় করুন। আপনার সন্তানদের জান্নাতে উচ্চ মর্যাদা দিন। আমিন।
والله أعلم بالصواب