জার্মানি যাওয়ার সুযোগ না পাওয়ায় বন্ধুর প্রতি হিংসা, খারাপ স্বপ্ন ও অস্থিরতা।

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 5272
Questioner: Shadek Hossain
Question Asked: 11 Sep 2026, 08:36 AM
Reviewed & Published: 11 Sep 2026, 09:21 AM
Views: 6
Tokens: 4,742
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার এক বন্ধু জার্মানি সুযোগ পাইছে,আমার সুযোগ থাকা সত্বেও যাই নি,,আমার ওকে নি অনেক হিংসা হয়,,আমি এখন ঘুমাইলেও উল্টাপাল্টা সপ্নে দেখি,,কিছুই ভালো লাগে না,,আমি জানি হিংসা করা ঠিক না,কিন্তু কিছুতেই থামাতে পারি না,,আর খালি মনে হয় আমিও যদি যাইতাম,,,এর জন্য আমার সকল শান্তি নষ্ট হয়ে গেছে

Answer

হিংসা (হাসাদ) থেকে মুক্তির উপায় — ইসলামী দৃষ্টিকোণ

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

প্রশ্নকারী জানাচ্ছেন—তাঁর এক বন্ধু জার্মানিতে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে, অথচ তাঁরও সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি যেতে পারেননি। এ কারণে বন্ধুর প্রতি তাঁর প্রচণ্ড হিংসা হয়, রাতে খারাপ স্বপ্ন দেখেন, কোনো কিছুই ভালো লাগে না, মনে শান্তি নেই। তিনি জানেন হিংসা করা ঠিক নয়, কিন্তু থামাতে পারছেন না।


১. হিংসা (হাসাদ) কী এবং কেন নিষিদ্ধ?

হাসাদ অর্থ—অন্যের প্রাপ্ত নিয়ামত ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কামনা করা। এটি হারাম ও কবিরা গুনাহ

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَمِن شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ "আর হিংসুকের অনিষ্ট থেকে (আশ্রয় চাই), যখন সে হিংসা করে।" — (সূরা আল-ফালাক: ৫)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

لَا تَحَاسَدُوا وَلَا تَنَاجَشُوا وَلَا تَبَاغَضُوا وَلَا تَدَابَرُوا "তোমরা পরস্পরে হিংসা করো না, প্রতারণা করো না, পরস্পরে বিদ্বেষ পোষণ করো না, পরস্পর বিমুখ হয়ো না।" — (সহীহ মুসলিম: ২৫৬৩)

إِيَّاكُمْ وَالْحَسَدَ فَإِنَّ الْحَسَدَ يَأْكُلُ الْحَسَنَاتِ كَمَا تَأْكُلُ النَّارُ الْحَطَبَ "তোমরা হিংসা থেকে বেঁচে থাকো; কারণ হিংসা নেক আমলগুলোকে এমনভাবে খেয়ে ফেলে যেমন আগুন কাঠ খেয়ে ফেলে।" — (সুনানে আবু দাউদ: ৪৯০৩)

ইমাম ইবন আবিদীন (রহ.) লিখেন—হাসাদ হলো অন্তরের রোগ, যা ইমানকে দুর্বল করে দেয়। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৯, পৃ. ৫৩৪)


২. হিংসার সাথে "গিবতাহ" (ঈর্ষা) এর পার্থক্য

গিবতাহ (অন্যের নিয়ামত দেখে নিজেও তা পাওয়ার ইচ্ছা করা, অন্যের ধ্বংস কামনা না করা) — এটি জায়েজ, যদি তা দ্বীনি বিষয়ে হয়।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

لَا حَسَدَ إِلَّا فِي اثْنَتَيْنِ: رَجُلٌ آتَاهُ اللَّهُ الْقُرْآنَ فَهُوَ يَقُومُ بِهِ آنَاءَ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ، وَرَجُلٌ آتَاهُ اللَّهُ مَالًا فَهُوَ يُنْفِقُهُ فِي الْحَقِّ "দুই ব্যক্তি ছাড়া (অন্য কারো প্রতি) হিংসা করা যায় না—একজন যাকে আল্লাহ কুরআন দিয়েছেন, সে দিন-রাত তা নিয়ে দাঁড়ায়; আরেকজন যাকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন, সে তা সঠিক পথে ব্যয় করে।" — (সহীহ বুখারী: ৫০২৮)

কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে বন্ধুর দুনিয়াবি সুযোগ নিয়ে যে কষ্ট হচ্ছে—এটি দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তির ফল, যা পরিহার করা কর্তব্য।


৩. হিংসার ক্ষতিকর প্রভাব

  1. নেক আমল ধ্বংস হয় — হাদিসে আগুনের সাথে তুলনা করা হয়েছে।
  2. অন্তরের শান্তি নষ্ট হয় — যেমন আপনার হয়েছে।
  3. খারাপ স্বপ্ন ও অস্থিরতা — শয়তানের প্রভাব বেড়ে যায়।
  4. ইমান দুর্বল হয় — কেননা হিংসা আল্লাহর ফয়সালার প্রতি অসন্তুষ্টির নামান্তর।

ইমাম গাজালী (রহ.) বলেন—হাসাদ মূলত আল্লাহর কাদার (তাকদীর) প্রতি অসন্তোষ, যা ইমানের পরিপন্থী। (ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন, খণ্ড ৩)


৪. হিংসা থেকে মুক্তির ব্যবহারিক উপায়

(ক) তাওবা ও ইস্তিগফার

আন্তরিকভাবে তাওবা করুন। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান এবং দৃঢ় সংকল্প করুন যে হিংসা করবেন না।

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদেরও ভালোবাসেন।" — (সূরা আল-বাকারা: ২২২)

(খ) বন্ধুর জন্য দুআ করা

হিংসার সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা—হিংসার পাত্রের জন্য কল্যাণের দুআ করা। এটি অন্তরকে পরিষ্কার করে।

إِذَا أَحَبَّ أَحَدُكُمْ أَخَاهُ فَلْيُخْبِرْهُ أَنَّهُ يُحِبُّهُ — (সুনানে আবু দাউদ: ৫১২)

বন্ধুকে ফোন করুন, শুভকামনা জানান, তার জন্য দুআ করুন—"আল্লাহ তোমাকে সেখানে হেফাজত করুন, সফল করুন।"

(গ) তাকদীরে সন্তুষ্ট থাকা (রিদা বিল-কাদা)

আল্লাহ যা দেননি, তা হয়তো আপনার জন্য কল্যাণকর ছিল না।

وَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ۖ وَعَسَىٰ أَن تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ ۗ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ "হয়তো তোমরা কোনো কিছু অপছন্দ করছ, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর; আর হয়তো কোনো কিছু ভালোবাসছ, অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।" — (সূরা আল-বাকারা: ২১৬)

মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) এই আয়াতের তাফসীরে বলেন—বান্দার উচিত আল্লাহর প্রতিটি ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা; কারণ আল্লাহ সর্বজ্ঞ। (মা'আরিফুল কুরআন, খণ্ড ১, পৃ. ৩৮৫)

(ঘ) নিজের নিয়ামতের কথা স্মরণ করা

আপনার জীবনে আল্লাহ যা দিয়েছেন—সুস্থতা, ইমান, পরিবার, দ্বীন—তা গুনে দেখুন। কৃতজ্ঞতা হিংসাকে দূর করে।

وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ "যখন তোমাদের প্রতিপালক ঘোষণা করলেন—যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও, আমি অবশ্যই তোমাদের বাড়িয়ে দেব।" — (সূরা ইবরাহীম: ৭)

(ঙ) খারাপ স্বপ্নের চিকিৎসা

রাসূলুল্লাহ ﷺ শিখিয়েছেন—খারাপ স্বপ্ন দেখলে:

  1. বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলুন (শুকনো)।
  2. আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম পড়ুন।
  3. যে পাশে ছিলেন, উল্টো পাশে ফিরে শুয়ে পড়ুন।
  4. কারো কাছে খারাপ স্বপ্নের কথা বলবেন না।

— (সহীহ বুখারী: ৫৭৪৭, সহীহ মুসলিম: ২২৬২)

(চ) নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত ও যিকির

সকাল-সন্ধ্যার আযকার পড়ুন। বিশেষ করে সূরা আল-ফালাক, সূরা আন-নাস, আয়াতুল কুরসি নিয়মিত পড়ুন।

(ছ) রুকইয়াহ ও দুআ

নিম্নোক্ত দুআ বেশি পড়ুন:

اللَّهُمَّ أَذْهِبْ عَنِّي الْهَمَّ وَالْحَزَنَ "হে আল্লাহ! আমার দুশ্চিন্তা ও দুঃখ দূর করে দিন।"

حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ "আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক।"


৫. বিশেষ পরামর্শ

  1. বন্ধুর সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখুন — তাকে এড়িয়ে যাবেন না, বরং তার সফলতার জন্য দুআ করুন।
  2. নিজের জন্য দুআ করুন — "হে আল্লাহ! আমাকেও হালাল উপায়ে উত্তম সুযোগ দিন।"
  3. সোশ্যাল মিডিয়া কম ব্যবহার করুন — বন্ধুর জার্মানির ছবি/পোস্ট দেখে হিংসা বাড়ে; এড়িয়ে চলুন।
  4. নামাজে মনোযোগ বাড়ান — বিশেষ করে তাহাজ্জুদে দুআ করুন।
  5. কোনো বিশ্বস্ত আলেমের পরামর্শ নিন — যদি হিংসা নিয়ন্ত্রণে না আসে।
  6. নিজেকে ব্যস্ত রাখুন — হালাল কাজ, পড়াশোনা, দ্বীনি ইলম অর্জনে।

৬. উপসংহার

হিংসা একটি মারাত্মক অন্তরের রোগ, যা ইমান ও আমল ধ্বংস করে এবং শান্তি কেড়ে নেয়। এর একমাত্র চিকিৎসা—তাওবা, তাকদীরে সন্তুষ্টি, বন্ধুর জন্য দুআ, কৃতজ্ঞতা ও যিকির-আযকার। আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন; তিনি যা করেন, তা কল্যাণের জন্যই করেন।

وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ "যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।" — (সূরা আত-তালাক: ৩)

আল্লাহ আমাদের সবাইকে হিংসা থেকে হেফাজত করুন এবং অন্তরে শান্তি দান করুন। আমীন।


References (মূল আরবি কিতাব)

| কিতাব | স্থান | |---|---| | রাদ্দুল মুহতার (ইবন আবিদীন) | খণ্ড ৯, পৃ. ৫৩৪ | | মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি শফী) | খণ্ড ১, পৃ. ৩৮৫ | | ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন (ইমাম গাজালী) | খণ্ড ৩ | | ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী) | খণ্ড ৩, পৃ. ৪৭২ | | ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী) | খণ্ড ৪, পৃ. ৩২১ | | সহীহ বুখারী | হাদিস ৫০২৮, ৫৭৪৭ | | সহীহ মুসলিম | হাদিস ২৫৬৩, ২২৬২ | | সুনানে আবু দাউদ | হাদিস ৪৯০৩, ৫১২ |


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.