স্বামীর ভালো দিক মানুষকে বলা যাবে কি

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 5256
Questioner: Adiba Binte Azad
Question Asked: 10 Sep 2026, 09:54 PM
Reviewed & Published: 10 Sep 2026, 10:38 PM
Views: 10
Tokens: 4,654
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আস্সালামু আলাইকুম।
কেন জানি আমার স্বামীর প্রশংসা মানুষের কাছে বলতে ভালো লাগে। এই যে মন আলহামদুলিল্লাহ আমার স্বামী অনেক কেয়ারিং দিনের ক্ষেত্রে আমাকে বুঝে। আমার স্বামী ঢাকা কলেজ থেকে মাস্টার্স ২ করেছে। ঢাকা কলেজে পড়তে অনেকের পক্ষে সম্ভব না কারণ এখানের মেধা ছাড়া টিকা খুবই কঠিন। তাই এটা নিয়ে অনেকের কাছে প্রাউড ফিল করি। অনেকে জিজ্ঞেস করলে ডিরেক্ট সিভি দেখাযই যাতে বিশ্বাস করে। কথায় প্রশংসা করতে ইচ্ছা করে। শ্বশুরবাড়ির ভালো লাগে।
কথা উঠলে বলতেই থাকি ওর ভালো দিকগুলা। এটা কি কোন প্রকার গুনাহ?

Answer

উত্তর (সংক্ষিপ্ত):

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته।

প্রশ্নের সারমর্ম: স্বামীর প্রশংসা মানুষকে বলা, তাঁর ভালো দিক তুলে ধরা, এমনকি প্রমাণ হিসেবে সিভি দেখানো—এসব কি গুনাহ? এখানে কয়েকটি দিক আলাদা করে বুঝতে হবে।


১. স্বামীর প্রশংসা করা নিজে থেকে গুনাহ নয়

স্ত্রীর জন্য স্বামীর ভালো গুণের কথা বলা, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং আল্লাহর শোকর আদায় করা—এটি মূলত জায়েয, বরং অনেক ক্ষেত্রে প্রশংসনীয়। হাদিসে স্ত্রীর জন্য স্বামীর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকার নির্দেশ এসেছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«لَا يَنْظُرُ اللَّهُ إِلَى امْرَأَةٍ لَا تَشْكُرُ لِزَوْجِهَا…» “আল্লাহ সেই নারীর দিকে (রহমতের দৃষ্টিতে) তাকাবেন না, যে তার স্বামীর প্রতি কৃতজ্ঞ নয়…”
— (সুনানে নাসাঈ, হাদিস: ৯০১; মুসনাদে আহমাদ)

তবে এখানে শর্ত হলো—প্রশংসা সত্য হওয়া, অহংকার বা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে না হওয়া, এবং তাতে নিজের বা স্বামীর অহমিকা প্রকাশ না পাওয়া।


২. যে বিষয়গুলো গুনাহ হতে পারে

নিচের অবস্থাগুলো দেখা দিলে তা গুনাহ বা অন্তত নিন্দনীয় হবে:

(ক) রিয়া বা লোক দেখানো (অহংকার):
যদি উদ্দেশ্য হয় “আমি বড়, আমার স্বামী বড়, আমরা অন্যের চেয়ে উত্তম”—এমন অহংকার ও আত্মপ্রশংসা, তাহলে তা নিন্দনীয়। কুরআনে আল্লাহ বলেন:

«فَلَا تُزَكُّوا أَنْفُسَكُمْ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنِ اتَّقَىٰ» “তোমরা নিজেদের পবিত্র বলে দাবি করো না; তিনি ভালো জানেন কে মুত্তাকি।”
— (সূরা আন-নাজম: ৩২)

হাদিসে আছে, রাসূল ﷺ বলেছেন:

«مَنْ سَمَّعَ سَمَّعَ اللَّهُ بِهِ، وَمَنْ رَاءَى رَاءَى اللَّهُ بِهِ» “যে লোক দেখানোর জন্য আমল করে, আল্লাহ তার লোক দেখানো প্রকাশ করে দেন…”
— (সহিহ বুখারি: ৬৪৯৯; সহিহ মুসলিম: ২৯৮৬)

(খ) গর্ব ও অন্যের ছোট করা:
যদি “ঢাকা কলেজে সবাই পড়তে পারে না, আমরা বিশেষ” ধরনের কথা বলে অন্যকে হেয় করা হয়, তাহলে তা গুনাহ। মুসলিমের উচিত অন্যের প্রতি নম্র থাকা।

(গ) মিথ্যা বা অতিরঞ্জন:
প্রশংসায় বাড়িয়ে বলা, না-থাকা গুণ যোগ করা—এটি মিথ্যা, যা হারাম।

(ঘ) স্বামীর গোপন বিষয় প্রকাশ:
স্বামীর ব্যক্তিগত বা পারিবারিক গোপন বিষয়, যা প্রকাশ করা তার জন্য ক্ষতিকর, তা বলা জায়েয নয়।

(ঙ) সিভি দেখানো:
প্রয়োজন ছাড়া শুধু প্রমাণ করার জন্য সিভি দেখানো—এটি অহংকার ও লোক দেখানোর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তবে যদি কেউ সত্যিই জিজ্ঞেস করে এবং স্বাভাবিকভাবে বলা হয়, তাতে দোষ নেই; কিন্তু “বিশ্বাস করানোর” জন্য বারবার দেখানো অহংকারের দিকে যায়।


৩. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে

ইমাম ইবনে আবিদিন রহ. «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন, আত্মপ্রশংসা ও লোক দেখানোর জন্য প্রশংসা করা নিন্দনীয়; কিন্তু কৃতজ্ঞতা ও শোকরের উদ্দেশ্যে সত্য প্রশংসা জায়েয। (রাদ্দুল মুহতার: ৯/৫৩৪ প্রসঙ্গ)

মুফতি তাকি উসমানি সাহেব «ফাতাওয়া উসমানি»-তে বলেন, “নিজের বা পরিবারের প্রশংসা করা যদি অহংকার ও রিয়া থেকে মুক্ত হয় এবং অন্যের ক্ষতি না করে, তবে তা জায়েয; কিন্তু সাধারণত এতে অহংকার জন্মায়, তাই কম করা উত্তম।” (ফাতাওয়া উসমানি: ৩/৫৬২)

আশরাফ আলী থানভী রহ. «বাহিশতী জেওর»-এ বলেন, “নিজের প্রশংসা করা ও লোক দেখানো আমল থেকে বেঁচে থাকা উচিত; কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা ভিন্ন বিষয়।”


৪. বাস্তব পরামর্শ

  1. শোকর ও প্রশংসার মধ্যে পার্থক্য রাখুন:
    “আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমার স্বামীকে ভালো রেখেছেন”—এটি শোকর।
    “আমার স্বামী ঢাকা কলেজে পড়েছে, সবাই পারে না”—এটি গর্বের দিকে যায়।

  2. প্রয়োজন ছাড়া সিভি দেখানো বন্ধ করুন:
    কেউ জিজ্ঞেস করলে সংক্ষেপে বলুন; প্রমাণ করার জন্য বারবার দেখানো অহংকার।

  3. অন্যের অনুভূতির খেয়াল রাখুন:
    যার স্বামী কম পড়াশোনা করেছে বা কষ্টে আছে, তার সামনে এভাবে বলা তাকে কষ্ট দিতে পারে। মুসলিমের উচিত অন্যের মনোভাব বোঝা।

  4. নিয়ত পরীক্ষা করুন:
    প্রশংসা করছি আল্লাহর শোকর হিসেবে, নাকি নিজেকে বড় দেখানোর জন্য? নিয়ত ঠিক থাকলে কথা কম বলুন, বেশি বললে রিয়ার আশঙ্কা।

  5. স্বামীর ভালো দিক নিজের মধ্যে ধরে রাখুন:
    সব ভালো কথা সবাইকে না বলে কিছু নিজের ও পরিবারের মধ্যে রাখা উত্তম।


৫. সারসংক্ষেপ

  • স্বামীর প্রশংসা করা নিজে থেকে গুনাহ নয়; বরং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ জায়েয।
  • কিন্তু যদি তা অহংকার, রিয়া, অন্যের ছোট করা, মিথ্যা বা অতিরঞ্জন, কিংবা গোপন বিষয় প্রকাশের সাথে মিশে যায়—তাহলে গুনাহ হবে।
  • সিভি দেখানো বা বারবার প্রমাণ করার প্রবণতা অহংকারের দিকে নিয়ে যায়, তাই তা কমানো উচিত।
  • নিয়ত পরিষ্কার রাখুন, সংক্ষেপে বলুন, অন্যের অনুভূতির খেয়াল রাখুন, এবং বেশি প্রশংসা পরিহার করুন।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে রিয়া ও অহংকার থেকে হেফাজত করুন। আমিন।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.