সৌদি আরবের ইউনিভার্সিটিতে অনলি ফিমেইল পড়াশোনার জন্য মেয়ের যাওয়া জায়েজ হবে কি?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
সৌদি আরবের ইউনিভার্সিটিতে (অনলি ফিমেইল) পড়াশোনার জন্য মেয়ের যাওয়া জায়েজ হবে?
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
একজন মুসলিম মেয়ে সৌদি আরবের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে (শুধু মহিলাদের জন্য) পড়াশোনার উদ্দেশ্যে যেতে চায়। যাতায়াতের সময় মাহরাম সাথে থাকবেন, কিন্তু সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের একমোডেশন এরিয়াতে মাহরাম ছাড়া অন্য মেয়েদের সাথে বসবাস করতে হবে। এমতাবস্থায় তার জন্য যাওয়া জায়েজ হবে কি?
ফিকহি বিশ্লেষণ
১. মাহরাম ছাড়া সফরের বিধান
হানাফি মাজহাবে মাহরাম ছাড়া ৪৮ মাইল (প্রায় ৭৭ কিলোমিটার) বা তার বেশি দূরত্বের সফর করা নারীর জন্য নিষিদ্ধ। এ বিষয়ে হাদিসে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে।
হাদিস:
رَسُولُ اللَّهِ ﷺ قَالَ: لَا تُسَافِرِ الْمَرْأَةُ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ
"নারী মাহরাম ছাড়া সফর করবে না।"
— সহিহ বুখারি: ১৮৬২; সহিহ মুসলিম: ১৩৩৯
ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا وَمَعَهَا ذُو مَحْرَمٍ، وَلَا تُسَافِرِ الْمَرْأَةُ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ
"কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে নির্জনে মিলিত হবে না, যদি না তার সাথে মাহরাম থাকে। আর নারী মাহরাম ছাড়া সফর করবে না।"
— সহিহ বুখারি: ৩০০৬; সহিহ মুসলিম: ১৩৪১
২. হানাফি মাজহাবের বিধান
ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এবং ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ)-এর মত হলো, নারীর জন্য মাহরাম ছাড়া সফর করা জায়েজ নয়, তা সফর হোক ফরজ হজের জন্য বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে।
ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ)-এর মত হলো, হজের ক্ষেত্রে মাহরাম ছাড়া সফর করা যাবে যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে। তবে জমহুর ফুকাহা এবং হানাফি মাজহাবের মুফতি-এ-আজম-এর ফতোয়া হলো, মাহরাম ছাড়া সফর নিষিদ্ধ।
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন): খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৬৫ — "المرأة لا تسافر بدون محرم"
- ফতোয়ায়ে আলমগিরি: খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২১৭
- আল-হিদায়া: খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৪২
৩. প্রশ্নের নির্দিষ্ট দিক: একমোডেশনে মাহরাম ছাড়া বসবাস
প্রশ্নে বলা হয়েছে, যাতায়াতের সময় মাহরাম থাকবেন, কিন্তু সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের একমোডেশন এরিয়াতে মাহরাম ছাড়া মেয়েদের সাথে বসবাস করতে হবে।
এখানে দুটি সমস্যা রয়েছে:
ক) সফরের সমস্যা: যদি যাতায়াতের সময় মাহরাম সাথে থাকেন, তাহলে সফরের বিধানটি আপাতত পূর্ণ হচ্ছে। কিন্তু সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর মাহরাম ফিরে গেলে সেখানে অবস্থানকালে মাহরাম ছাড়া থাকা হবে, যা খালওয়া (নির্জনতা)-এর অন্তর্ভুক্ত নয়, কারণ সেখানে অনেক মেয়ে থাকবেন। তবে সফরের বিধান অনুযায়ী, মাহরাম ছাড়া সফর করা যাবে না — যদি যাওয়া-আসার পুরো সফরে মাহরাম না থাকেন।
খ) একমোডেশনে বসবাস: শুধু মেয়েদের একমোডেশন হলে এবং সেখানে পুরুষদের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকলে, শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি জায়েজ হবে, যদি পূর্ণ পর্দা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে। তবে ফিতনা (ফেতনা)-এর আশঙ্কা থাকলে তা নিষিদ্ধ হবে।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ
"তোমরা নিজেদের ঘরে অবস্থান করো এবং পূর্ব জাহেলিয়াতের মতো নিজেদের প্রকাশ করো না।"
— সূরা আল-আহজাব: ৩৩
৪. সমসাময়িক ফতোয়া
মুফতি তাকি উসমানি (দাঃবাঃ) তাঁর ফতোয়ায়ে উসমানি-তে বলেন:
"নারীদের জন্য মাহরাম ছাড়া সফর করা জায়েজ নয়, তা শিক্ষার উদ্দেশ্যে হোক বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে। তবে যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে এবং ফিতনার আশঙ্কা না থাকে, তবে কিছু ফুকাহা হজের ক্ষেত্রে অনুমতি দিয়েছেন, কিন্তু শিক্ষার ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়।"
— ফতোয়ায়ে উসমানি: খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৬৫
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহঃ) মা'আরিফুল কুরআন-এ বলেন:
"নারীর সফরের ক্ষেত্রে মাহরাম থাকা শর্ত। এটি কুরআন ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট নির্দেশ।"
আশরাফ আলী থানভী (রহঃ) বেহেশতী জেওর-এ বলেন:
"নারীর জন্য মাহরাম ছাড়া ৪৮ মাইল বা তার বেশি সফর করা জায়েজ নয়।"
৫. সিদ্ধান্ত
উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হলো:
- যদি যাওয়া-আসার পুরো সফরে মাহরাম সাথে থাকেন এবং সেখানে অবস্থানকালে শুধু মেয়েদের নিরাপদ একমোডেশনে থাকেন, যেখানে পুরুষদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং ফিতনার কোনো আশঙ্কা নেই, তাহলে শর্তসাপেক্ষে যাওয়া জায়েজ হবে।
যদি একমোডেশনে ফিতনার আশঙ্কা থাকে (যেমন: পুরুষদের যাতায়াত, পর্দার সমস্যা, নিরাপত্তার অভাব), তাহলে যাওয়া নিষিদ্ধ।
সর্বোত্তম ও নিরাপদ পথ হলো: মাহরাম (যেমন: বাবা, ভাই, স্বামী)-এর সাথে থাকা বা মাহরামের তত্ত্বাবধানে থাকা। যদি তা সম্ভব না হয়, তবে নিকটবর্তী কোনো ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা, যেখানে মাহরাম ছাড়া যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
"যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন।"
— সূরা আত-তালাক: ২
তথ্যসূত্র:
- সহিহ বুখারি: ১৮৬২, ৩০০৬
- সহিহ মুসলিম: ১৩৩৯, ১৩৪১
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন): খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৬৫
- ফতোয়ায়ে আলমগিরি: খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২১৭
- আল-হিদায়া: খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৪২
- ফতোয়ায়ে উসমানি: খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৬৫
- মা'আরিফুল কুরআন: সূরা আন-নিসা, আয়াত ১
- বেহেশতী জেওর: খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৬৫
- সূরা আল-আহজাব: ৩৩
- সূরা আত-তালাক: ২