শিরক করার পর পূর্বে নির্ধারিত ফরজ গোসল করে তওবা করলে কি আবার গোসল করতে হবে?
Taharah Purity · Hanafi
Question
Answer
শিরক করার পর পূর্বে নির্ধারিত ফরজ গোসল এবং তওবা সম্পর্কে বিধান
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
কেউ যদি শিরকে লিপ্ত হয়, অতঃপর পূর্বে নির্ধারিত (যেমন হায়েজ-নিফাস বা জানাবাতের কারণে) ফরজ গোসল করে, এবং গোসলের পর শিরকের জন্য তওবা করে — তাহলে তাকে কি আবার ফরজ গোসল করতে হবে?
উত্তর
না, তাকে আবার ফরজ গোসল করতে হবে না। শিরক করা বা শিরক থেকে তওবা করা — কোনোটিই নতুন করে ফরজ গোসল ওয়াজিব হওয়ার কারণ নয়। কারণ ফরজ গোসল (গুসলে ওয়াজিব) কেবল নির্দিষ্ট কিছু কারণেই ওয়াজিব হয়, যেমন:
- জানাবাত (স্বপ্নদোষ, সহবাস ইত্যাদি)
- হায়েজ (মাসিক)
- নিফাস (সন্তান প্রসবের পর রক্ত)
- ইসলাম গ্রহণ (কাফের অবস্থায় থাকাকালীন জানাবাতের অবস্থা থাকলে)
শিরক করা বা শিরক থেকে তওবা করা — এগুলো উপরোক্ত কারণগুলোর অন্তর্ভুক্ত নয়। তাই শিরক করার কারণে বা তওবা করার কারণে নতুন করে গোসল ফরজ হয় না।
দলিল ও ব্যাখ্যা
১. ফরজ গোসলের কারণসমূহ নির্দিষ্ট
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَإِن كُنتُمْ جُنُبًا فَاطَّهَّرُوا "আর যদি তোমরা জানাবাতের অবস্থায় থাকো, তবে পবিত্রতা অর্জন করো।" — (সূরা আল-মায়িদা: ৬)
وَلَا تَقْرَبُوهُنَّ حَتَّىٰ يَطْهُرْنَ "আর তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) নিকটবর্তী হয়ো না যতক্ষণ না তারা পবিত্র হয়।" — (সূরা আল-বাকারা: ২২২)
এই আয়াতগুলোতে গোসলের কারণ হিসেবে জানাবাত, হায়েজ ও নিফাসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। শিরক বা তওবা এখানে উল্লেখিত নয়।
২. হাদিসে গোসলের কারণ
উম্মে সালামা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
جَاءَتْ أُمُّ سُلَيْمٍ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَتْ: يَا رَسُولَ اللهِ، إِنَّ اللهَ لَا يَسْتَحْيِي مِنَ الْحَقِّ، فَهَلْ عَلَى الْمَرْأَةِ مِنْ غُسْلٍ إِذَا هِيَ احْتَلَمَتْ؟ فَقَالَ: نَعَمْ، إِذَا رَأَتِ الْمَاءَ "উম্মে সুলাইম (রাযি.) নবী ﷺ-এর কাছে এসে বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ সত্য বলতে লজ্জা করেন না। স্ত্রীলোকের স্বপ্নদোষ হলে কি তার গোসল করা আবশ্যক? তিনি বললেন: হ্যাঁ, যদি সে বীর্যপাত দেখে।" — (সহিহ বুখারি: ১৩০, সহিহ মুসলিম: ৩১৩)
অন্য হাদিসে আয়েশা (রাযি.) বলেন:
كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَغْتَسِلُ مِنْ أَرْبَعٍ: مِنَ الْجَنَابَةِ، وَيَوْمَ الْجُمُعَةِ، وَمِنَ الْحِجَامَةِ، وَمِنْ غُسْلِ الْمَيِّتِ "নবী ﷺ চারটি কারণে গোসল করতেন: জানাবাত, জুমার দিন, রক্তমোক্ষণ এবং মৃত ব্যক্তিকে গোসল করানোর পর।" — (সুনানে আবু দাউদ: ৩৪৮)
এখানেও শিরক বা তওবার উল্লেখ নেই।
৩. হানাফি ফিকহের মূলনীতি
আল-হিদায়া-তে ইমাম বুরহানুদ্দীন আল-মারগিনানী (রহ.) বলেন:
"গোসল ওয়াজিব হয় তিনটি কারণে: জানাবাত, হায়েজ ও নিফাস।"
রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) বলেন:
"গুসলে ওয়াজিবের কারণগুলো নির্দিষ্ট ও সীমাবদ্ধ; এগুলো ছাড়া অন্য কোন কারণে গোসল ওয়াজিব হয় না।"
ফাতাওয়া আলমগিরি-তে উল্লেখ আছে:
"গোসল ফরজ হয় জানাবাত, হায়েজ ও নিফাস দ্বারা।"
৪. শিরক ও তওবার বিধান
শিরক করা কবিরা গুনাহ এবং তা ইসলাম থেকে বের করে দেয়। তবে শিরক থেকে তওবা করলে আল্লাহ তওবা কবুল করেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করা ক্ষমা করেন না; এছাড়া অন্য সব গুনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।" — (সূরা আন-নিসা: ৪৮)
وَهُوَ الَّذِي يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ "তিনি তাঁর বান্দাদের তওবা কবুল করেন।" — (সূরা আশ-শূরা: ২৫)
তওবার জন্য শর্ত হলো: (১) গুনাহ ছেড়ে দেওয়া, (২) অনুতপ্ত হওয়া, (৩) আর না করার দৃঢ় সংকল্প করা। কারো হক নষ্ট করলে তা ফিরিয়ে দেওয়াও শর্ত। কিন্তু তওবার সাথে নতুন করে গোসল করা শর্ত নয়।
৫. মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.)-এর ফাতাওয়া
ফাতাওয়া উসমানি-তে উল্লেখ আছে:
"গোসল ফরজ হওয়ার কারণগুলো শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত। শিরক, কুফর বা অন্য কোন গুনাহ — এগুলো গোসল ফরজ হওয়ার কারণ নয়। তবে কেউ যদি কুফর অবস্থায় জানাবাতের অবস্থায় থাকে এবং পরে ইসলাম গ্রহণ করে, তাহলে তার গোসল করা ওয়াজিব হবে।"
বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি: যদি শিরক অবস্থায় জানাবাত থাকে
যদি কেউ শিরক করার সময় জানাবাতের অবস্থায় থাকে (যেমন স্বপ্নদোষ হয় বা সহবাস করে), তাহলে জানাবাতের কারণেই গোসল ফরজ হবে — শিরকের কারণে নয়। আর যদি সে শিরক করার আগেই ফরজ গোসল করে ফেলে, তাহলে জানাবাতের কারণ দূর হয়ে যায়, তাই পরে তওবা করলেও নতুন গোসল লাগবে না।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |------|-------| | শিরক করার কারণে গোসল ফরজ হয়? | না | | তওবা করার কারণে গোসল ফরজ হয়? | না | | পূর্বে ফরজ গোসল করা থাকলে পুনরায় গোসল? | না | | জানাবাত/হায়েজ/নিফাস থাকলে? | হ্যাঁ, গোসল ফরজ |
সিদ্ধান্ত: প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থায় — শিরক করার পর পূর্বে নির্ধারিত ফরজ গোসল করে, অতঃপর তওবা করলে — তাকে আবার ফরজ গোসল করতে হবে না। তার তওবা সহিহ হবে এবং পবিত্রতা বহাল থাকবে।
তথ্যসূত্র:
- আল-কুরআনুল কারিম (সূরা আল-মায়িদা: ৬, সূরা আন-নিসা: ৪৮, সূরা আশ-শূরা: ২৫)
- সহিহ বুখারি: ১৩০
- সহিহ মুসলিম: ৩১৩
- সুনানে আবু দাউদ: ৩৪৮
- আল-হিদায়া (ইমাম মারগিনানী)
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী)
- ফাতাওয়া আলমগিরি
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি আশরাফ আলী থানভী)