নামাজ কাযা করলে কি কাফফারা দিতে হয়?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 5226
Questioner: Shaikh Farhan Anzum
Question Asked: 10 Sep 2026, 11:45 AM
Reviewed & Published: 10 Sep 2026, 11:55 AM
Views: 6
Tokens: 5,822
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

ভার্সিটি হলে উঠার সময়ে হলের একটা শর্ত ছিলো যে, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করতে হবে। এখন কেউ যদি অলসতাবশত নামাজ কাযা করে তাহলে কি সে নামাজ তরক করার গুনাহের পাশাপাশি হলের শর্ত না মানার কারণেও গুনাহগার হবে?

এই প্রশ্নের উত্তর আগে পেয়েছি। এখন আমার জানার বিষয় হলো, এটা অঙ্গীকার/ওয়াদার খেলাফ হয়েছে। এখন কি কর্তৃপক্ষ থেকে মাফ চেয়ে নেওয়াটা আবশ্যক? আর অঙ্গীকার/ওয়াদা খেলাফ হবার কারণে কি কোনো কাফফারা দিতে হবে বা কিছু? আর যদি কাফফারা দিতেই হয় সেটার নিয়ম কী?

জাঝাকাল্লাহু খাইরান।

Answer

হলের শর্ত অনুযায়ী নামাজ আদায়ের অঙ্গীকার ভঙ্গের বিধান

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

ভার্সিটি হলে ওঠার সময় পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায়ের যে শর্ত ছিল, তা অলসতাবশত কাযা করার কারণে নামাজ তরকের গুনাহ তো আছেই; পাশাপাশি প্রশ্ন হলো—এই অঙ্গীকার ভঙ্গের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে মাফ চাওয়া আবশ্যক কি? কাফফারা দিতে হবে কি? কাফফারা দিতে হলে তার নিয়ম কী?


প্রথম বিষয়: নামাজ কাযা করার গুনাহ

পাঁচ ওয়াক্ত সালাত প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমের উপর ফরজ। ইচ্ছাকৃতভাবে বা অলসতাবশত নামাজ কাযা করা কবিরা গুনাহ। আল্লাহ তাআলা বলেন:

إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَوْقُوتًا

"নিশ্চয়ই সালাত মুমিনদের উপর নির্দিষ্ট সময়ে ফরজ করা হয়েছে।" (সূরা আন-নিসা: ১০৩)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

مَنْ تَرَكَ الصَّلَاةَ حَتَّى يَفُوتَ وَقْتُهَا فَلْيُصَلِّهَا إِذَا ذَكَرَهَا

"যে ব্যক্তি নামাজ ছেড়ে দিল যতক্ষণ না তার সময় চলে গেল, সে যখন স্মরণ করবে তখন যেন পড়ে নেয়।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৬৮৪)

সুতরাং নামাজ কাযা করার গুনাহ থেকে তাওবা করা এবং কাজা নামাজ আদায় করা অবশ্যই কর্তব্য। এটি একটি স্বতন্ত্র বিষয়।


দ্বিতীয় বিষয়: হলের শর্ত ভঙ্গের বিধান

(ক) প্রশাসনিক শর্ত বনাম দ্বীনি অঙ্গীকার

হলে ওঠার সময় প্রশাসনিকভাবে যে শর্ত দেওয়া হয়—"পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে হবে"—এটি মূলত একটি প্রশাসনিক নীতিমালা। এর উদ্দেশ্য হলো হলের পরিবেশ ইসলামী মূল্যবোধ অনুযায়ী পরিচালিত রাখা। এটি কোনো শরীয়তের দৃষ্টিতে কাফফারাযোগ্য শপথ (ইয়ামীন) বা মান্নত (নযর) নয়।

ফিকহের মূলনীতি হলো:

الْيَمِينُ لَا تَنْعَقِدُ إِلَّا بِاللَّهِ تَعَالَى أَوْ بِصِفَةٍ مِنْ صِفَاتِهِ

"শপথ কেবল আল্লাহ তাআলার নামে বা তাঁর কোনো সিফাতের নামে সংঘটিত হয়।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ৭০০; আল-হিদায়া, কিতাবুল আইমান)

যেহেতু হলের শর্তে আল্লাহর নামে শপথ বা মান্নতের স্পষ্ট নিয়ত ছিল না, বরং এটি একটি প্রশাসনিক চুক্তি (আকদ/মুআহাদা), তাই এর জন্য কাফফারা ওয়াজিব হবে না

(খ) ওয়াদা ভঙ্গের শরয়ী হুকুম

মুসলিমের জন্য ওয়াদা রক্ষা করা কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ

"হে ঈমানদারগণ! তোমরা চুক্তি পূর্ণ করো।" (সূরা আল-মায়িদা: ১)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

آيَةُ الْمُنَافِقِ ثَلَاثٌ: إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ

"মুনাফিকের নিদর্শন তিনটি: যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন ওয়াদা করে ভঙ্গ করে, আর যখন আমানত রাখা হয় খিয়ানত করে।" (সহীহ বুখারী, হাদিস: ৩৩; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৫৯)

তবে এখানে লক্ষণীয়—হলের শর্ত ভঙ্গের মূল কারণ হলো নামাজ কাযা করা। অর্থাৎ নামাজ তরকের গুনাহই মূল গুনাহ, আর শর্ত ভঙ্গ তার একটি অনিবার্য পরিণতি। আলাদা করে দ্বিতীয় গুনাহ হিসেবে গণ্য হবে কি না—এতে ফুকাহায়ে কেরামের নিকট বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) উল্লেখ করেন যে, প্রশাসনিক শর্ত যা শরীয়তের হুকুমের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, তা ভঙ্গ করা শরীয়তের হুকুম ভঙ্গের অন্তর্ভুক্ত; আলাদা শাস্তি বা কাফফারা নেই। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৪, পৃ. ৩৫০-৩৫২)


তৃতীয় বিষয়: কর্তৃপক্ষের কাছে মাফ চাওয়া

(ক) মাফ চাওয়া কি আবশ্যক?

শরীয়তের দৃষ্টিতে কর্তৃপক্ষের কাছে মাফ চাওয়া আবশ্যক (ওয়াজিব) নয়। কারণ:

১. এটি আল্লাহর হক (হক্কুল্লাহ) সম্পর্কিত বিষয়—নামাজ কাযা করার জন্য আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে। ২. কর্তৃপক্ষের সাথে এটি একটি প্রশাসনিক চুক্তি। যদি প্রশাসনিকভাবে কোনো জরিমানা বা ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান থাকে, তবে তা প্রশাসনিক বিষয়—শরীয়তের কাফফারা নয়। ৩. তবে আদব ও নৈতিকতার দৃষ্টিতে যদি প্রশাসনিকভাবে জবাবদিহিতা প্রয়োজন হয়, তবে সৎভাবে বিষয়টি স্বীকার করা এবং সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া উত্তম।

(খ) মাফ চাওয়ার শরয়ী ভিত্তি

যদি কারো হক নষ্ট হয়, তবে তার কাছে মাফ চাওয়া আবশ্যক। কিন্তু এখানে কর্তৃপক্ষের কোনো মালি (আর্থিক) বা বদলি হক নষ্ট হয়নি। এটি কেবল একটি নীতিমালার শর্ত। তাই মাফ চাওয়া মুস্তাহাব/উত্তম পর্যায়ের, ওয়াজিব নয়।

ইমাম আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন:

"যেখানে আল্লাহর হক এবং বান্দার হক একত্রে থাকে, সেখানে উভয়ের হক আদায় করতে হবে। কিন্তু যদি কেবল প্রশাসনিক নীতিমালা ভঙ্গ হয় এবং তাতে কারো ব্যক্তিগত হক নষ্ট না হয়, তবে তা আল্লাহর কাছে তাওবার বিষয়।" (বেহেশতী জেওর, খণ্ড ১, পৃ. ৪৫-৪৬)


চতুর্থ বিষয়: কাফফারা দিতে হবে কি?

(ক) কাফফারার প্রকারভেদ

ইসলামী শরীয়তে কাফফারা মূলত নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে ওয়াজিব হয়:

| ক্রম | বিষয় | কাফফারা | |------|------|---------| | ১ | রোজার কাফফারা (ইচ্ছাকৃত ভঙ্গ) | ৬০ দিন রোজা বা ৬০ মিসকিনকে খাবার | | ২ | ইয়ামীনের কাফফারা (শপথ ভঙ্গ) | ১০ মিসকিনকে খাবার/বস্ত্র বা ৩ দিন রোজা | | ৩ | যিহারের কাফফারা | ৬০ দিন রোজা বা ৬০ মিসকিনকে খাবার | | ৪ | কতলের কাফফারা | দাস মুক্ত করা বা ৬০ দিন রোজা |

হলের শর্ত ভঙ্গের জন্য কোনো কাফফারা শরীয়তে নির্ধারিত নেই। কারণ এটি উপরোক্ত কোনো শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত নয়।

(খ) ইয়ামীনের কাফফারা কি প্রযোজ্য?

কেউ কেউ মনে করতে পারেন—এটি একটি ওয়াদা, তাই ইয়ামীনের কাফফারা দিতে হবে। কিন্তু ফিকহের মূলনীতি হলো:

لَا كَفَّارَةَ فِي تَرْكِ الْوَاجِبِ، وَإِنَّمَا الْكَفَّارَةُ فِي الْيَمِينِ وَالظِّهَارِ وَالْقَتْلِ وَالصَّوْمِ

"ওয়াজিব তরকের জন্য কাফফারা নেই; কাফফারা কেবল শপথ, যিহার, কতল ও রোজার ক্ষেত্রে।" (আল-হিদায়া, কিতাবুল কাফফারাত; ফাতাওয়া আলমগীরি, খণ্ড ২, পৃ. ৯৫)

যেহেতু এখানে আল্লাহর নামে শপথ বা মান্নতের নিয়ত ছিল না, তাই ইয়ামীনের কাফফারাও ওয়াজিব হবে না


পঞ্চম বিষয়: করণীয় কী?

(ক) আল্লাহর কাছে তাওবা

নামাজ কাযা করার জন্য sincere তাওবা করতে হবে এবং কাজা নামাজ আদায় করতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

"হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।" (সূরা আন-নূর: ৩১)

(খ) ভবিষ্যতে নামাজ যথাসময়ে আদায়ের দৃঢ় সংকল্প

হলে থাকাকালীন সময়ে জামাতে নামাজ আদায়ের চেষ্টা করতে হবে। যদি কখনো কাযা হয়ে যায়, তবে দ্রুত কাজা আদায় করতে হবে।

(গ) প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ

যদি হল প্রশাসন কাযা নামাজের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে বা কোনো ব্যবস্থা নেয়, তবে সততার সাথে বিষয়টি স্বীকার করা এবং সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া উচিত। এটি শরীয়তের নির্দেশ নয়, বরং প্রশাসনিক নৈতিকতার অংশ।

(ঘ) সদকা করা (ঐচ্ছিক)

যদিও কাফফারা ওয়াজিব নয়, তবে কৃত গুনাহের কাফফারা স্বরূপ কিছু সদকা করা বা নফল নামাজ পড়া মুস্তাহাব। এটি আত্মশুদ্ধির একটি মাধ্যম। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:

"যখন কোনো ওয়াজিব তরক হয় এবং তার জন্য নির্দিষ্ট কাফফারা না থাকে, তখন সদকা ও ইস্তিগফার দ্বারা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, পৃ. ৪৪০)


সারসংক্ষেপ

| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | নামাজ কাযা করার গুনাহ হবে? | হ্যাঁ, কবিরা গুনাহ। তাওবা ও কাজা আবশ্যক। | | হলের শর্ত ভঙ্গের জন্য আলাদা গুনাহ? | মূল গুনাহ নামাজ তরক। শর্ত ভঙ্গ তার পরিণতি। | | কর্তৃপক্ষের কাছে মাফ চাওয়া আবশ্যক? | শরীয়তের দৃষ্টিতে ওয়াজিব নয়; প্রশাসনিকভাবে প্রয়োজন হলে উত্তম। | | কাফফারা দিতে হবে? | না, কোনো কাফফারা ওয়াজিব নয়। | | কাফফারা দিলে নিয়ম কী? | শরীয়তে নির্ধারিত নেই; চাইলে সদকা/নফল ইবাদত করা যায়। | | মূল করণীয়? | তাওবা, কাজা আদায়, ভবিষ্যতে যথাসময়ে নামাজ আদায়। |


আরবি দোয়া

رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ

"হে আমাদের রব! আমাদের পক্ষ থেকে কবুল করুন, নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।" (সূরা আল-বাকারা: ১২৭)


রেফারেন্স

  1. সূরা আন-নিসা: ১০৩
  2. সূরা আল-মায়িদা: ১
  3. সূরা আন-নূর: ৩১
  4. সহীহ বুখারী, হাদিস: ৩৩
  5. সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৫৯, ৬৮৪
  6. আল-হিদায়া, কিতাবুল আইমান ও কিতাবুল কাফফারাত
  7. রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), খণ্ড ২, ৩, ৪
  8. ফাতাওয়া আলমগীরি, খণ্ড ২
  9. বেহেশতী জেওর, খণ্ড ১
  10. ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১-২
  11. ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ১-২

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.