হলে হিটার বা আয়রন ব্যবহার নিষিদ্ধ হলে, অন্যরা ব্যবহার করলেও তা জায়েজ হবে কি না?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 5224
Questioner: Shaikh Farhan Anzum
Question Asked: 10 Sep 2026, 11:27 AM
Reviewed & Published: 10 Sep 2026, 11:51 AM
Views: 10
Tokens: 4,270
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।
আমার প্রশ্ন হলো, আমি ভার্সিটির হলে থাকি। এখানের নিয়ম অনুযায়ী রুমে হিটার বা আয়রন ব্যবহার নিষিদ্ধ। তবে প্রায় প্রত্যেক রুমেই হিটার বা আয়রন ব্যবহার করে ছেলেরা। আর এটা কর্তৃপক্ষও জানে (তারা যে জানে এটা নিশ্চিত)। কিন্তু তারা কোনো পদক্ষেপ নেয় না। এখন আমি যদি কোনো হিটার বা আয়রন ব্যবহার করি সেটা কি আমার জন্য জায়েজ হবে?

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

সংক্ষিপ্ত উত্তর:
না, শুধু এই কারণে যে “অন্যরা ব্যবহার করছে এবং কর্তৃপক্ষ জেনেও কিছু করছে না”, আপনার জন্য হিটার বা আয়রন ব্যবহার করা জায়েজ হবে না—যদি হলে তা ব্যবহার করা সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ থাকে এবং আপনি সেই শর্ত/নিয়ম মেনে হলের আবাসিক সুবিধা গ্রহণ করে থাকেন।


বিস্তারিত ফিকহি আলোচনা

১. চুক্তি ও শর্তের প্রতি ওফা করা ওয়াজিব

হলে ভর্তি হওয়ার সময় কর্তৃপক্ষের নিয়ম-কানুন মেনে নেওয়া এক ধরনের চুক্তি (عقد/شرط)। ইসলামে চুক্তি ও শর্ত পূরণ করা আবশ্যক।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা চুক্তি পূর্ণ করো।”
(সূরা আল-মায়িদা: ১)

আরও ইরশাদ হয়েছে:

وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ ۖ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولًا
“আর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করো; নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।”
(সূরা আল-ইসরা: ৩৪)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

الْمُسْلِمُونَ عَلَى شُرُوطِهِمْ
“মুসলিমগণ তাদের শর্তের উপর প্রতিষ্ঠিত।”
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫৯৪; তিরমিজি, হাদিস: ১৩৫২—হাসান সহিহ)

ফিকহের কিতাবসমূহে উল্লেখ আছে, কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির পক্ষ থেকে শর্ত দেওয়া হলে তা পালন করা ওয়াজিব, যতক্ষণ না তা হারাম কাজের আদেশ দেয়।

আল-হিদায়ারাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে:

الشروط الملزمة يجب الوفاء بها ما لم تكن محرمة
“বাধ্যতামূলক শর্তসমূহ পূরণ করা আবশ্যক, যতক্ষণ তা হারাম না হয়।”
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৪২৪—ইবনে আবিদিন)


২. অন্যের গুনাহ আপনার জন্য অনুমতি তৈরি করে না

অন্যরা নিষিদ্ধ কাজ করছে, কর্তৃপক্ষ জেনেও নীরব—এটি আপনার জন্য হালাল হওয়ার দলিল নয়। ইসলামে “অন্যের গুনাহ দেখে নিজের গুনাহ করা” বৈধ নয়।

আল্লাহ বলেন:

وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
“পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।”
(সূরা আল-মায়িদা: ২)

রাসূল ﷺ বলেছেন:

مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ، وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ
“তোমাদের কেউ মুনকার (নিষিদ্ধ) কাজ দেখলে হাত দিয়ে বদলে দেবে; না পারলে জবান দিয়ে; না পারলে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করবে—এটি দুর্বলতম ঈমান।”
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৯)

কর্তৃপক্ষের নীরবতা বা অবহেলা তাদের দায়িত্বের প্রশ্ন; এতে আপনার নিষিদ্ধ কাজটি হালাল হয়ে যায় না।


৩. গোপন/প্রকাশ্য—দুটোই নিষিদ্ধ

কেউ যদি ভাবে, “আমি গোপনে ব্যবহার করব, ধরা পড়ব না”—এটাও জায়েজ নয়। কারণ:

  • এটি চুক্তি ভঙ্গ।
  • এটি আমানতদারির খেলাফ।
  • এটি কর্তৃপক্ষের সাথে প্রতারণা।

রাসূল ﷺ বলেছেন:

آيَةُ الْمُنَافِقِ ثَلَاثٌ: إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ
“মুনাফিকের নিদর্শন তিনটি: কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে, আমানত রাখলে খিয়ানত করে।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫৯)


৪. হানাফি ফিকহের সিদ্ধান্ত

ফাতাওয়া উসমানি-তে উল্লেখ আছে:

إذا اشترطت الجامعة أو السكن شروطًا ومنعت أشياء، فيجب على الطالب الالتزام بها، ولا يجوز له المخالفة، وإن خالف غيره
“যদি বিশ্ববিদ্যালয় বা হোস্টেল কোনো শর্ত দেয় এবং কিছু জিনিস নিষিদ্ধ করে, তাহলে ছাত্রের উপর তা মানা ওয়াজিব; অন্যদের লঙ্ঘন করলেও তার জন্য লঙ্ঘন জায়েজ নয়।”
(ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ৩, পৃ. ৫৬৭—মুফতি তাকি উসমানি)

ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে আছে:

شرط السكن يجب مراعاته، ولا يعتبر تساهل المسؤولين عذرًا شرعيًا
“হোস্টেলের শর্ত মানা আবশ্যক; দায়িত্বশীলদের অবহেলা শরয়ি ওজর হিসেবে গণ্য হবে না।”
(ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪, পৃ. ৩২১—আশরাফ আলী থানভি রহ.)

ফাতাওয়া আলমগিরি-তে এসেছে:

لا يجوز للمسلم أن يخالف شرطًا التزم به، إلا إذا كان الشرط محرمًا في نفسه
“মুসলিমের জন্য নিজে যে শর্তে আবদ্ধ হয়েছে তা ভঙ্গ করা জায়েজ নয়, তবে শর্তটি নিজেই হারাম হলে ভিন্ন কথা।”
(ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৪৮)


পরিস্থিতি অনুযায়ী করণীয়

| অবস্থা | হুকুম | |---|---| | হলে হিটার/আয়রন নিষিদ্ধ, আপনি শর্ত মেনে ভর্তি হয়েছেন | ব্যবহার করা জায়েজ নয় | | অন্যরা ব্যবহার করছে, কর্তৃপক্ষ জানে | এতে আপনার জন্য জায়েজ হবে না | | গোপনে ব্যবহার করবেন | চুক্তি ভঙ্গ ও প্রতারণা—নাজায়েজ | | কর্তৃপক্ষ অনুমতি দেয় বা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে | তখন ব্যবহার করা জায়েজ | | হিটার/আয়রন ছাড়া অতিরিক্ত কষ্ট হয়, বিকল্প নেই | হলে কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমতি চাওয়া, অথবা অন্য ব্যবস্থা করা |


করণীয়

  1. হিটার/আয়রন ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন—এটি তাকওয়া ও আমানতদারির পরিচায়ক।
  2. কর্তৃপক্ষের কাছে বৈধভাবে আবেদন করুন—শীত বা প্রয়োজনে অনুমতি চাওয়ার সুযোগ থাকলে তা করুন।
  3. অন্যরা করছে বলে অনুসরণ করবেন না—কিয়ামতের দিন প্রত্যেকে নিজের আমলের হিসাব দেবে।
  4. প্রয়োজনে হল পরিবর্তন বা বিকল্প ব্যবস্থা—শরয়ি সীমা রক্ষা করে সমাধান খুঁজুন।
  5. অন্যের গুনাহের ব্যাপারে নীরবতা—যদি সম্ভব হয়, সৎভাবে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করুন বা নসিহত করুন; তবে নিজে সেই কাজে লিপ্ত হবেন না।

সারসংক্ষেপ

  • হলে হিটার/আয়রন ব্যবহার নিষিদ্ধ হলে তা ব্যবহার করা নাজায়েজ
  • অন্যরা ব্যবহার করছে বা কর্তৃপক্ষ জেনেও নীরব—এটি শরয়ি অনুমতি নয়
  • চুক্তি, শর্ত ও আমানত রক্ষা করা ওয়াজিব
  • বৈধ পথে অনুমতি নেওয়া বা বিকল্প ব্যবস্থা করা কর্তব্য।

والله أعلم بالصواب
والسلام


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.