ইসলামের আলোকে বাবা-মায়ের প্রতি মেয়ের হক, চাকরি না করলে পিতামাতার হক নষ্ট হবে কি?
Family Life · Hanafi
Question
১.উস্তায আমি জানতে চাচ্ছি বাবা মায়ের প্রতি মেয়ের হক গুলো কি কি।
২.আমি শুরু থেকে কো এডুকেশনে পড়াশুনা করে আসছি। কলেজে শুনেছি যে এটা হারাম কিন্তু আমলে নেইনি। ভার্সিটিতে উঠে অনেক দ্বীনি বোনদের সহচর্যে থেকে অনেক কিছু জেনেছি ইসলাম সম্পর্কে। জানার পর আমার দুনিয়াবি পড়াশুনার প্রতি আগ্রহ কমে যায় সাথে আরেকটা কারন যে পড়াশুনা গুলো মুখস্থভিত্তিক তাই আরও আগ্রহ কমে গেছে। এখন আমার জব করার ইচ্ছাও নাই কারন পর্দায় থেকে চাকুরী করার পরিবেশও নেই বাংলাদেশে আর এসব চাকুরীর পড়াশুনা করতেও ভালো লাগেনা। ভার্সিটির এসব পড়াশুনা বা পরিবেশ কিছুই ভালো লাগেনা।কিন্তু যেহেতু বাসায় বাবা মায়ের এসম্পর্কে জ্ঞান নেই তারা চায় আমি জব করি। কিন্তু আমি করতে চাইনা। বাসায় বলতেও পারি না ভয়ে কারণ বললে তারা কষ্ট পাবে সাথে আমার পিছনে তারা যত সময় ও অর্থ ব্যায় করেছে এগুলো নিয়েও কথা উঠাবে আর আমি এসব শুনতে পারবো না।যেহেতু তারা অনেক টাকা খরচ করে আমাকে বড় করেছেন এখন আমি যদি তাদের খরচ না দিতে পারি তাহলে কি তাদের হক নষ্ট হবে??আমার ভাই নেই।তিন বোন আমরা।আমি বড়।বাবা সরকারি কর্মকর্তা কিন্তু বেশিদিন নেই চাকুরির। আর৪/৫ বছর করতে পারবে জানামতে।
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। আপনি ইসলামী জ্ঞান অর্জনের পর দুনিয়াবি শিক্ষা ও চাকরির প্রতি অনীহা বোধ করছেন, যা একটি সাধারণ সমস্যা। আসুন, কুরআন-হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করি।
১. বাবা-মায়ের প্রতি মেয়ের হক (দায়িত্ব) কী কী?
ইসলামে সন্তান (ছেলে-মেয়ে উভয়ের) উপর পিতামাতার অধিকার অপরিসীম। কুরআনে আল্লাহ তাআলা পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। মেয়ে সন্তান হওয়ার কারণে কোনো ভিন্নতা নেই, বরং মেয়েদের প্রতি পিতামাতার ভালোবাসা ও কুরবানির কারণে তাদের দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ।
মূল হকসমূহ হলো:
১. আনুগত্য ও সদ্ব্যবহার (ইহসান): কুরআনে বলা হয়েছে, "আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে। তাদের মধ্যে কেউ বা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে 'উফ' শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না; বরং তাদের সাথে সম্মানসূচক কথা বলো।" (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৩)। এটি ছেলে-মেয়ে সবার জন্য প্রযোজ্য।
২. ভরণপোষণ (খরচ): ইসলামী আইনে সন্তানের উপর পিতামাতার ভরণপোষণ ফরজ হয় যখন পিতামাতা অসহায়, বার্ধক্যে উপনীত এবং উপার্জনে অক্ষম হন, এবং সন্তান সামর্থ্যবান হন। এটি ছেলে-মেয়ে উভয়ের জন্য প্রযোজ্য।
বাবা মা যদি উপার্জনে অক্ষম হন, এবং মেয়ে সামর্থ্যবান হন। তাহলে পিতামাতা কে সাহায্য করা তারও নৈতিক ও শরয়ী দায়িত্ব। (রদ্দুল মুহতার, ৯তম খণ্ড, ৫২৩ পৃষ্ঠা)।
৩. দোয়া করা: পিতামাতার জন্য দোয়া করা এবং তাদের মাগফিরাত কামনা করা সন্তানের অন্যতম কর্তব্য। হাদিসে আছে, "যখন আদম সন্তান মৃত্যুবরণ করে, তখন তার আমলনামা বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি কাজ বন্ধ হয় না: সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যা দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।" (সহীহ মুসলিম: ১৬৩১)।
৪. সম্মান ও ভালোবাসা: তাদের সাথে উঁচু গলায় কথা না বলা, তাদের সামনে বিনয়ী থাকা এবং তাদের সেবা করা।
২. চাকরি না করলে পিতামাতার হক নষ্ট হবে কি?
আপনার প্রশ্নের মূল অংশ হলো, পড়াশোনা শেষে চাকরি না করলে পিতামাতার খরচের হক নষ্ট হবে কি না। এর উত্তর নির্ভর করছে আপনার পিতার আর্থিক অবস্থা ও আপনার সামর্থ্যের উপর।
হানাফি ফিকহের নিয়ম: পিতামাতার ভরণপোষণ সন্তানের উপর ফরজ হওয়ার শর্ত হলো, পিতা-মাতা নিঃস্ব, অসহায় এবং উপার্জনে অক্ষম হতে হবে। যদি পিতা চাকরিজীবী হন এবং তার বেতন থেকে সংসার চলে, তাহলে আপনার উপর তার খরচ দেওয়া ফরজ নয়। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১ম খণ্ড, ৫৬০ পৃষ্ঠা)।
আপনি লিখেছেন, আপনার বাবা সরকারি চাকরিজীবী এবং আরও ৪/৫ বছর চাকরি করবেন। অর্থাৎ, তিনি বর্তমানে সামর্থ্যবান। তাই শরীয়তের দৃষ্টিতে আপনার উপর বর্তমানে পিতার খরচ দেওয়া ফরজ নয়। ফলে, চাকরি না করলে তাদের হক নষ্ট হবে না, ইনশাআল্লাহ।
তবে, নৈতিক দায়িত্ব থেকে যায়। যেহেতু তারা আপনার পড়াশোনায় অর্থ ব্যয় করেছে, তাই যদি আপনি ভবিষ্যতে উপার্জনক্ষম হন এবং পিতা অবসর নেওয়ার পর অসহায় হয়ে পড়েন, তখন তাদের খরচ দেওয়া আপনার উপর ফরজ হয়ে যাবে। তখন আপনি যদি সক্ষম হন, তাহলে অবশ্যই দিতে হবে।
৩. দুনিয়াবি শিক্ষা ও চাকরি সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
আপনি মনে করছেন, কো-এডুকেশন (ছেলে-মেয়ে একত্রে পড়াশোনা) হারাম, তাই পুরো শিক্ষাব্যবস্থা হারাম। এটি একটি ভুল ধারণা। ইসলাম শিক্ষাকে হারাম করেনি, বরং শিক্ষার পরিবেশ ও পদ্ধতিকে হারাম বলেছে।
- শিক্ষা অর্জন করা ফরজ: হাদিসে আছে, "জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর উপর ফরজ।" (ইবনে মাজাহ: ২২৪)। তাই পড়াশোনা নিজে হারাম নয়।
- কো-এডুকেশন সমস্যা: কো-এডুকেশন পরিবেশে পর্দা লঙ্ঘন, অবৈধ সম্পর্ক ইত্যাদি হারাম কাজ হতে পারে। আপনি যদি সেই পরিবেশে থেকে পর্দা রক্ষা করে এবং হারাম কাজ থেকে বেঁচে থেকে পড়াশোনা করেন, তাহলে পড়াশোনা করা জায়েজ থাকবে। তবে, আপনি যদি মনে করেন পরিবেশটি আপনার ঈমানের জন্য ক্ষতিকর, তাহলে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
- চাকরি হারাম নয়: চাকরি করা জায়েজ, যদি তা বৈধ পেশা হয় এবং পর্দার নিয়ম মেনে করা সম্ভব হয়। বাংলাদেশে পর্দা রক্ষা করে চাকরি করা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। শিক্ষকতা (মেয়েদের স্কুলে), অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং, হোম টিউশন (মেয়েদের জন্য) ইত্যাদি বৈধ ও পর্দা রক্ষার উপযোগী পেশা রয়েছে।
৪. আপনার করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ
১. পিতামাতার সাথে কথা বলুন: আপনি ভয় পাচ্ছেন যে, কথা বললে তারা কষ্ট পাবে। কিন্তু চুপ করে থাকলে সমস্যা আরও বাড়বে। তাদের সাথে ভদ্রভাবে ও সম্মানের সাথে আপনার অনুভূতি শেয়ার করুন। তাদের বলুন, "আব্বু-আম্মু, আমি ইসলামিক পরিবেশে থেকে দ্বীনি শিক্ষা নিতে চাই, কারণ আমি আমার আখিরাত নিয়ে চিন্তিত। আমি চাকরি করতে চাই না, তবে আমি ঘরে বসে (অনলাইনে) বা মেয়েদের জন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে চাই।" তাদের বোঝান যে, আপনি তাদের খরচের কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেন এবং ভবিষ্যতে তাদের সেবা করতে চান।
২. দ্বীনি শিক্ষা চালিয়ে যান: আপনি যদি দুনিয়াবি শিক্ষায় অনাগ্রহী হন, তাহলে একটি মাদরাসা বা ইসলামিক ইনস্টিটিউটে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করুন, যেখানে পর্দার ব্যবস্থা আছে। অথবা অনলাইনে ইসলামিক কোর্স করুন। এটি আপনার জন্য উত্তম হবে।
৩. পিতার অবসরের পরিকল্পনা: আপনার বাবার চাকরি ৪/৫ বছর পর শেষ হবে। তখন আপনার ছোট বোনদের পড়াশোনা ও সংসারের খরচের দায়িত্ব আপনার উপর আসতে পারে। তাই আপনি যদি চাকরি না-ও করেন, তাহলে ঘরে বসে উপার্জনের চেষ্টা করুন (যেমন: সেলাই, হস্তশিল্প, অনলাইন কনটেন্ট রাইটিং, ফ্রিল্যান্সিং ইত্যাদি)। এটি পর্দা রক্ষা করেও করা সম্ভব।
৪. আল্লাহর উপর ভরসা করুন: আপনি যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুনিয়াবি চাকরি ছেড়ে দেন, তবে আল্লাহ আপনাকে অপ্রত্যাশিত উৎস থেকে রিজিক দেবেন। কুরআনে আল্লাহ বলেন, "আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন, যা তার ধারণায়ও আসে না।" (সূরা আত-তালাক: ২-৩)।
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
- পিতামাতার হক: আনুগত্য, সদ্ব্যবহার, সেবা, দোয়া এবং অসহায় অবস্থায় খরচ দেওয়া।
- চাকরি না করলে হক নষ্ট হবে? না, যতক্ষণ আপনার পিতা সামর্থ্যবান, ততক্ষণ আপনার উপর খরচ দেওয়া ফরজ নয়। তাই চাকরি না করলে তাদের হক নষ্ট হবে না। তবে, ভবিষ্যতে তারা অসহায় হলে আপনার ও আপনার ভাইবোনেরা সামর্থবান হলে দায়িত্ব হবে।
- দুনিয়াবি শিক্ষা হারাম নয়, তবে পরিবেশ খারাপ হলে তা পরিবর্তন করা উচিত। পর্দা রক্ষা করে ঘরে বসে বা মেয়েদের প্রতিষ্ঠানে কাজ করার চেষ্টা করুন।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন এবং আপনার পিতামাতার সাথে সুন্দর সম্পর্ক বজায় রাখার শক্তি দিন। আমিন।