পারিবারিক আর্থিক সংকটের কারণে লোন নেওয়া অবৈধ হবে কি?

Family Life · Hanafi

Question No: 5192
Questioner: md. aktaruzzaman
Question Asked: 09 Sep 2026, 05:42 PM
Reviewed & Published: 09 Sep 2026, 05:46 PM
Views: 29
Tokens: 5,228
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ্।
আমি একটা জব করি।২১৫০০ টাকা স্যালারি।এই টাকা দিয়ে সংসার খরচ চালানো খুব কঠিন হয়ে যায়।৩ বছরের একটা বাবু আছে।আমার নিজের কোন জমি নেই।সারা জীবন ভারা থাকতে হবে যদি না কিছু করতে পারি।

বর্তমান আমি ব্যবসা করতে চাচ্ছি।সন্তানদের ভবিষ্যত গড়তে এবং নিজের মা এবং বোনের দ্বায়িত্ব নিতে চাই যার জন্য আমাকে আলাদা কিছু করতে হবে।কিন্তু আমার কোন পুজি নেই।পরিচিত মানুষ থেকে চেয়েছি।কেউ হেল্প করছে না তাই আমি চাচ্ছি লোন নিতে।আবার সুধের সাথে জড়িয়ে যাবো তাই মনও টানে না।আমি জানতে চাচ্ছি আমার সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে লোন নেওয়া কি ঠিক হবে।কিছুটা ছাড় আছে কি??

যদি কেউ হেল্প করতো তাহলে কখনোই সুধের সাথে জরিয়ে যাবো এমনটা করতাম না

Answer

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ্।

প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার পারিবারিক ও আর্থিক সংকটের কথা বুঝতে পেরে আমরা উদ্বিগ্ন। আল্লাহ তায়ালা আপনার জন্য সহজ পথ তৈরি করে দিন।

আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হলো: সুদ (রিবা) ভিত্তিক লোন নেওয়া ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম (নিষিদ্ধ) এবং এটি কবিরা গুনাহ। আপনার আর্থিক সংকট থাকা সত্ত্বেও শরীয়তের দৃষ্টিতে এখানে তেমন কোনো "ছাড়" (রুখসাত) নেই, যতক্ষণ না আপনি চরম প্রয়োজনীয়তা (দারুরাত) বা অনন্য সাধারণ পরিস্থিতির সম্মুখীন হন, যা জীবন-মৃত্যুর সাথে জড়িত।

আসুন বিষয়টি কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের আলোকে বুঝি:

১. সুদের (রিবা) হারাম হওয়ার দলিল

কুরআন ও হাদিসে সুদের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়েছে। এটি এমন একটি পাপ, যার জন্য আল্লাহ ও তার রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

  • কুরআন: আল্লাহ তায়ালা বলেন:

    "যারা সুদ খায়, তারা (কিয়ামতে) দাঁড়াবে না, তবে যেভাবে দাঁড়ায় সেই ব্যক্তি, যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল বানিয়ে দেয়। এটা এজন্যে যে, তারা বলে, 'বেচাকেনা তো সুদ নেওয়ারই মতো।' অথচ আল্লাহ বেচাকেনা হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন।... আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দান-খয়রাতকে বর্ধিত করেন। আল্লাহ পছন্দ করেন না কোনো অকৃতজ্ঞ পাপীকে।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫-২৭৬) "হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা কিছু বাকি আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাক। যদি তোমরা তা না কর, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা জেনে নাও।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৮-২৭৯)

  • হাদিস: হযরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) সুদখোর, সুদদাতা, এর লেখক এবং এর দুই সাক্ষী—সকলকে অভিশাপ দিয়েছেন এবং বলেছেন, "তারা সবাই সমান (পাপে)।" (সহীহ মুসলিম: ১৫৯৮)

২. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি ও "ছাড়" (রুখসাত) এর শর্ত

আপনি যে পরিস্থিতির কথা বলেছেন—সংসার চালাতে কষ্ট, সন্তানের ভবিষ্যৎ, ব্যবসার পুঁজির অভাব—এগুলো অবশ্যই কঠিন, কিন্তু ইসলামি ফিকহে এগুলোকে সুদ গ্রহণের বৈধতার জন্য যথেষ্ট "দারুরাত" (চরম প্রয়োজন) হিসেবে গণ্য করা হয় না।

  • দারুরাত কী? ইসলামি ফিকহের পরিভাষায় দারুরাত হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে বৈধ উপায়ে জীবন রক্ষা করা সম্ভব না হলে মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে। যেমন: ক্ষুধায় মৃত্যুর মুখে পড়ে গেলে হারাম জিনিস খেয়ে জীবন বাঁচানো জায়েজ হতে পারে।
  • হানাফি ফিকহের নীতি: ফকিহগণ বলেছেন, রিবা (সুদ) সহ যেকোনো হারাম জিনিস শুধুমাত্র সেই চরম অবস্থায় জায়েজ হয়, যখন হালাল উপায়ে প্রয়োজন মেটানোর কোনো পথই থাকে না। আপনার ক্ষেত্রে, আপনি বর্তমানে চাকরি করছেন এবং ২১,৫০০ টাকা বেতন পাচ্ছেন। এটি আপনার মৌলিক জীবনধারণের জন্য যথেষ্ট না-ও হতে পারে, তবে এটি একটি হালাল রিজিক। এর পাশাপাশি আপনি আরও চেষ্টা করতে পারেন:
    • অতিরিক্ত আয়ের পথ: চাকরির পাশাপাশি ছোট পরিসরে হালাল কোনো কাজ বা ফ্রিল্যান্সিং শুরু করা।
    • সঞ্চয়: ছোট করে হলেও মাসিক সঞ্চয় করে পুঁজি জমানো।
    • সাহায্য: আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, মসজিদের তহবিল বা সরকারি/বেসরকারি ইসলামি অনুদান (যেমন: জাকাতের টাকা) থেকে ব্যবসার পুঁজি জোগাড় করা। আপনি উল্লেখ করেছেন, পরিচিত কেউ সাহায্য করলে আপনি সুদ নিতেন না। এটি প্রমাণ করে আপনার বিবেক সতর্ক আছে। আল্লাহর কাছে দোয়া করুন এবং ভালো মানুষের সন্ধান চালিয়ে যান। জাকাতের টাকা দিয়ে ব্যবসার পুঁজি দেওয়া জায়েজ আছে, যদি আপনি জাকাত গ্রহণের উপযুক্ত হন (নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক না হন)।

৩. আপনার জন্য করণীয় ও উপদেশ

১. সুদ থেকে দূরে থাকুন: মনে রাখবেন, সুদ শুধু দুনিয়ার জীবনে আর্থিক বোঝা বাড়ায় না, বরং আখিরাতের জন্য এটি অত্যন্ত মারাত্মক। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি সুদ খায়, আল্লাহ তার পেটে আগুন ভরিয়ে দেবেন।" (মুসনাদে আহমাদ) সুদের বরকত থাকে না, বরং সম্পদ ধ্বংস হয়।

২. ধৈর্য ও তাকওয়া অবলম্বন করুন: কুরআনে আল্লাহ বলেছেন:

"যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন, যা তার ধারণায়ও আসে না।" (সূরা আত-তালাক: ২-৩)

আপনার চাকরি আছে, এটি একটি নিয়ামত। এই চাকরির মাধ্যমে আপনি হালাল রিজিক উপার্জন করছেন। কষ্ট হলেও এটাকে ধরে রাখুন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। ব্যবসা করার জন্য পুঁজি না থাকলে, আপনি চাকরির পাশাপাশি ছোট পরিসরে (যেমন: অনলাইনে পণ্য বিক্রি, পার্টটাইম কাজ) শুরু করতে পারেন। হাতে সামান্য টাকা জমলে তা দিয়ে ব্যবসা শুরু করুন। ছোট শুরু করলেও তাতে বরকত হবে।

সংক্ষিপ্ত উত্তর: আপনার বর্তমান পরিস্থিতি কষ্টকর হলেও তা এমন চরম পর্যায়ের নয়, যেখানে সুদ নেওয়া জায়েজ হয়ে যাবে। সুদভিত্তিক লোন নেওয়া সম্পূর্ণ হারাম এবং এর কোনো শরীয়ত-সম্মত ছাড় নেই।

আপনার জন্য উত্তম পথ হলো ধৈর্য ধরা, হালাল উপার্জনে সন্তুষ্ট থাকা, আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা এবং শরীয়াহ-সম্মত বিকল্প পথ (কারজে হাসানা) খোঁজা। আল্লাহ তায়ালা আপনার জন্য রিজিকের দরজা খুলে দেবেন, ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সুদসহ সকল প্রকার হারাম কাজ থেকে হেফাজত করুন এবং হালাল রিজিকের মধ্যে বরকত দান করুন। (আমিন)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.