একটি বড় পুকুরের পানি নাপাক হওয়ার শর্ত গুলো কি কি?

Taharah Purity · Hanafi

Question No: 5151
Questioner: Siratul Mustaqeem
Question Asked: 08 Sep 2026, 08:14 PM
Reviewed & Published: 08 Sep 2026, 09:08 PM
Views: 12
Tokens: 3,254
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

একটি বড় পুকুরের পানি নাপাক হওয়ার শর্ত গুলো কি কি?

Answer

বড় পুকুরের পানি নাপাক হওয়ার শর্তসমূহ

ভূমিকা

ইসলামী ফিকহের পরিভাষায় পানি দুই প্রকার: (১) পানি যা দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করা যায় (طاهر مطهر) এবং (২) পানি যা নাপাক (نجس)। একটি বড় পুকুরের পানি কখন নাপাক হবে তা জানা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অত্যন্ত জরুরি, কারণ পবিত্রতা (তাহারাত) ইবাদত কবুলের পূর্বশর্ত।

কুরআন ও হাদীসের আলোকে পানির পবিত্রতা

আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:

وَيُنَزِّلُ عَلَيْكُم مِّنَ السَّمَاءِ مَاءً لِّيُطَهِّرَكُم بِهِ "আর তিনি তোমাদের উপর আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, যাতে তা দ্বারা তোমাদেরকে পবিত্র করেন।" (সূরা আনফাল: ১১)

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

الْمَاءُ طَهُورٌ لَا يُنَجِّسُهُ شَيْءٌ "পানি পবিত্রকারী, কোনো কিছুই তাকে নাপাক করে না।" (সুনানে আবু দাউদ: ৬৭, সুনানে তিরমিযী: ৬৬)

তবে এই সাধারণ নিয়মের কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে, যা নিম্নে বর্ণনা করা হলো।

হানাফী মাযহাব মতে বড় পুকুরের পানি নাপাক হওয়ার শর্ত

হানাফী ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থসমূহ অনুযায়ী (ফাতাওয়া আলমগীরী, রদ্দুল মুহতার, আল-হিদায়াহ), একটি বড় পুকুরের পানি (যার আয়তন ১০×১০ হাত বা তার বেশি) নাপাক হওয়ার জন্য নিম্নোক্ত শর্তসমূহ পূরণ হওয়া আবশ্যক:

১. নাপাকির পরিবর্তন (تغیر) হওয়া

বড় পুকুরের পানি নাপাক হওয়ার প্রধান ও মৌলিক শর্ত হলো— তাতে নাপাকি পতিত হওয়ার কারণে পানির কোনো একটি গুণের (রং, গন্ধ বা স্বাদ) পরিবর্তন হওয়া।

ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, যদি পানির রং, গন্ধ বা স্বাদ—এই তিনটি গুণের মধ্যে কোনো একটি পরিবর্তিত হয়, তবে পানি নাপাক হয়ে যাবে। কিন্তু যদি পানি এত বড় হয় যে, নাপাকি পতিত হওয়ার পরও পানির কোনো গুণের পরিবর্তন না ঘটে, তবে পানি পাক থাকবে।

রদ্দুল মুহতার (৫/৩৮৫)-এ উল্লেখ আছে:

وَالْمُعْتَبَرُ عِنْدَ أَبِي حَنِيفَةَ تَغَيُّرُ أَحَدِ أَوْصَافِهِ الثَّلَاثَةِ "ইমাম আবু হানীফার নিকট বিবেচ্য বিষয় হলো পানির তিনটি গুণের (রং, গন্ধ, স্বাদ) মধ্যে কোনো একটির পরিবর্তন হওয়া।"

২. নাপাকির পরিমাণ

বড় পুকুরের পানিতে নাপাকি পতিত হওয়ার পর যদি পানির গুণাগুণ পরিবর্তিত না হয়, তবে সেই পানি পাক থাকবে—যদিও নাপাকির পরিমাণ অনেক বড় হয়। কিন্তু পানির গুণাগুণ পরিবর্তিত হলে অল্প নাপাকি হলেও পানি নাপাক হয়ে যাবে।

৩. নাপাকির প্রকার

পানিতে পতিত নাপাকি দুই প্রকার হতে পারে:

  • ঘন নাপাকি (যেমন: মল-মূত্র, রক্ত, মদ ইত্যাদি)
  • তরল নাপাকি (যেমন: মূত্র, মদ ইত্যাদি)

উভয় প্রকার নাপাকিই পানির গুণাগুণ পরিবর্তন করলে পানি নাপাক হবে।

ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদের মত

ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) এবং ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, যদি পানির পরিমাণ ১০×১০ হাতের কম হয় এবং তাতে নাপাকি পতিত হয়, তবে পানির গুণাগুণ পরিবর্তিত হোক বা না হোক, পানি নাপাক হয়ে যাবে। কিন্তু পানি যদি ১০×১০ হাত বা তার বেশি হয়, তবে শুধুমাত্র গুণাগুণ পরিবর্তন হলেই পানি নাপাক হবে।

ফাতাওয়া আলমগীরীতে বর্ণনা

ফাতাওয়া আলমগীরী (১/১৮)-এ উল্লেখ আছে:

الْمَاءُ الْكَثِيرُ إذَا وَقَعَتْ فِيهِ نَجَاسَةٌ لَا يَصِيرُ نَجِسًا مَا لَمْ يَتَغَيَّرْ أَحَدُ أَوْصَافِهِ مِنْ اللَّوْنِ أَوْ الطَّعْمِ أَوْ الرِّيحِ "বড় পানিতে (১০×১০ হাত বা তদূর্ধ্ব) নাপাকি পতিত হলে তা নাপাক হয় না, যতক্ষণ না পানির রং, স্বাদ বা গন্ধের কোনো একটি পরিবর্তিত হয়।"

ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.)-এর বক্তব্য

ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) রদ্দুল মুহতারে (১/২০৩) বলেন:

وَالْمَرْجِعُ فِي الْقِلَّةِ وَالْكَثْرَةِ إلَى تَغَيُّرِ الْأَوْصَافِ عِنْدَ أَبِي حَنِيفَةَ "ইমাম আবু হানীফার নিকট পানির অল্প-বেশির মাপকাঠি হলো গুণাগুণের পরিবর্তন।"

বাহিশতী জেওয়ারের বর্ণনা

মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বাহিশতী জেওয়ারে (পৃষ্ঠা ২৪) লিখেছেন:

"বড় পানি (যেমন: বড় পুকুর, দিঘি, নদী) যদি এমন হয় যে, এক প্রান্তে পেশাব করলে অপর প্রান্তে তার প্রভাব না পৌঁছে, তবে তাতে নাপাকি পতিত হলে যদি পানির রং, গন্ধ বা স্বাদ পরিবর্তিত না হয়, তবে পানি পাক থাকবে এবং তা দিয়ে অযু-গোসল করা জায়েয হবে। কিন্তু যদি পানির রং, গন্ধ বা স্বাদ পরিবর্তিত হয়ে যায়, তবে সেই পানি নাপাক হয়ে যাবে।"

মাযহাবের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ

পানির পরিমাণ নির্ধারণে মতভেদ

হানাফী মাযহাবে পানির পরিমাণ সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে:

  1. ইমাম আবু হানীফা (রহ.): পানির পরিমাণ যত বড়ই হোক না কেন, নাপাকি পতিত হয়ে গুণাগুণ পরিবর্তন না হলে পানি পাক থাকবে। তবে তিনি একটি উদাহরণ দিয়েছেন— যদি পানি এত বড় হয় যে, এক প্রান্তে নাপাকি পতিত করলে অপর প্রান্তে তার প্রভাব না পৌঁছায় (অর্থাৎ গুণাগুণ পরিবর্তন না হয়), তবে পানি পাক।

  2. ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.): ১০×১০ হাত পরিমিত পানি (যাকে "পানি দুই কুল্লা" বলা হয়) বড় পানি। এর চেয়ে কম পানিতে নাপাকি পতিত হলে গুণাগুণ পরিবর্তন না হলেও পানি নাপাক হবে।

নাপাকির কারণে পানির গুণাগুণ পরিবর্তনের প্রকার

পানির তিনটি গুণ:

  1. রং (لون) - পানির রং পরিবর্তন হওয়া
  2. গন্ধ (ريح) - পানির গন্ধ পরিবর্তন হওয়া
  3. স্বাদ (طعم) - পানির স্বাদ পরিবর্তন হওয়া

এই তিনটির মধ্যে যেকোনো একটি পরিবর্তিত হলেই পানি নাপাক হয়ে যাবে।

ব্যবহারিক নিয়ম

একটি বড় পুকুরের পানি নাপাক হবে যদি:

  1. তাতে নাপাকি (মল, মূত্র, রক্ত, মদ ইত্যাদি) পতিত হয় এবং
  2. সেই নাপাকির কারণে পানির রং, গন্ধ বা স্বাদের কোনো একটি পরিবর্তিত হয়।

কিন্তু যদি নাপাকি পতিত হওয়ার পরও পানির রং, গন্ধ ও স্বাদ অপরিবর্তিত থাকে, তবে পানি পাক থাকবে এবং তা দিয়ে অযু-গোসল করা জায়েয হবে।

গুরুত্বপূর্ণ নোট

  • যদি পুকুরের পানিতে নাপাকি পতিত হওয়ার কারণে মাছের মৃত্যু ঘটে এবং পানির গন্ধ পরিবর্তিত হয়, তবে পানি নাপাক হবে।
  • যদি পুকুরের পানি এত পরিমাণ হয় যে, নাপাকি পতিত হওয়ার পরও পানির কোনো পরিবর্তন না হয়, তবে পানি পাক থাকবে।
  • পুকুরের পানিতে নাপাকি পতিত হওয়ার পর যদি সন্দেহ হয় যে, পানির গুণাগুণ পরিবর্তিত হয়েছে কি না, তবে মূলনীতি হলো পানি পাক থাকবে (ইসতিহসান)।

উপসংহার

সারকথা হলো—হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত (ইমাম আবু হানীফা) অনুযায়ী, একটি বড় পুকুরের পানি নাপাক হওয়ার প্রধান শর্ত হলো তাতে নাপাকি পতিত হওয়ার কারণে পানির রং, গন্ধ বা স্বাদ—এই তিনটি গুণের মধ্যে কোনো একটি পরিবর্তিত হওয়া। যদি এই তিনটি গুণের কোনো একটি পরিবর্তিত না হয়, তবে পানি পাক থাকবে, যদিও পুকুরটি ছোট হয়।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে পবিত্রতা অর্জনের তাওফীক দান করুন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.