কপিরাইট সংরক্ষিত ছবি AI দিয়ে অনুরূপ ছবি তৈরি করে বিক্রি করা জায়েজ কিনা?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
কপিরাইট ইস্যু সম্পর্কে ফতোয়া
প্রশ্ন: আমি পিন্টারেস্ট নামক অ্যাপ থেকে কপিরাইট সংরক্ষিত ছবি ডাউনলোড করি এবং AI-কে বলি এই রেফারেন্স ছবিটিকে হুবহু কপি না করে একই ধরনের ব্যাকগ্রাউন্ড তৈরি করতে। পরে সেটি আমি বিক্রি করব। এটা কি জায়েজ হবে নাকি অন্যদের মেধা চুরির অপরাধে দণ্ডিত হবো?
উত্তর
بسم الله الرحمن الرحيم
আলহামদুলিল্লাহ ওয়াসসালাতু ওয়াসসালামু আলা রাসূলিল্লাহ
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বর্তমান ডিজিটাল যুগের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে কপিরাইট, মেধাস্বত্ব এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তির অধিকার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা প্রয়োজন।
১. কপিরাইট ও মেধাস্বত্বের ইসলামী বিধান
ইসলামী ফিকহের আলোকে কপিরাইট বা মেধাস্বত্ব (Intellectual Property Rights) একটি স্বীকৃত অধিকার। হানাফী মাযহাবের প্রখ্যাত ফকীহগণ এবং আধুনিক যুগের ইসলামী পণ্ডিতগণ এই বিষয়ে স্পষ্ট মতামত প্রদান করেছেন।
কুরআন ও হাদীসের আলোকে:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ "হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।" (সূরা আন-নিসা: ২৯)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"মুসলিম তার ভাইয়ের সম্পদের প্রতি অন্যায় আচরণ করা হারাম।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ২৪৪২)
হানাফী ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি:
ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) এবং ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর নীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির শ্রম ও পরিশ্রমের ফল তার সম্পদ হিসেবে গণ্য। আধুনিক যুগের হানাফী পণ্ডিতগণ যেমন মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.), মুফতী তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) প্রমুখ ব্যক্তিগণ কপিরাইটকে বৈধ সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
মুফতী তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) তাঁর "ফিকহী মাকালাত" গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, কপিরাইট বা পেটেন্ট একটি বৈধ অধিকার এবং তা লঙ্ঘন করা জায়েয নয়।
২. পিন্টারেস্ট থেকে ছবি ডাউনলোড করার বিধান
পিন্টারেস্টের ছবিগুলো সাধারণত কপিরাইট সংরক্ষিত। প্ল্যাটফর্মের শর্তাবলী অনুযায়ী, ব্যবহারকারীদের ছবি ডাউনলোড করে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে:
১. কপিরাইট সংরক্ষিত ছবি ডাউনলোড করা: শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য ডাউনলোড করলে সমস্যা নেই, তবে বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য ডাউনলোড করা জায়েয নয়।
২. মালিকের অনুমতি: কোনো ছবি ব্যবহারের পূর্বে মালিকের অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা অন্যায়।
৩. AI ব্যবহার করে অনুরূপ ছবি তৈরি করার বিধান
এখন আপনার মূল প্রশ্ন হলো—AI-কে বলে একই ধরনের কিন্তু হুবহু কপি নয় এমন ব্যাকগ্রাউন্ড তৈরি করিয়ে বিক্রি করা জায়েয হবে কিনা।
বিশ্লেষণ:
ক. যদি AI সম্পূর্ণ নতুন ও স্বতন্ত্র ছবি তৈরি করে: যদি AI-কে শুধুমাত্র "একটি ফুলের ব্যাকগ্রাউন্ড তৈরি করো" বা "একটি বিমূর্ত নকশা তৈরি করো" বলা হয় এবং AI সম্পূর্ণ নতুন ও স্বতন্ত্র ছবি তৈরি করে, তবে সেটি ব্যবহার করা জায়েয। কারণ এটি নতুন সৃষ্টি, কারো কপিরাইট লঙ্ঘন নয়।
খ. যদি AI মূল ছবির ভিত্তিতে অনুরূপ ছবি তৈরি করে: যদি AI-কে একটি নির্দিষ্ট ছবি দেখিয়ে বলা হয় "এটার মতো একটি ছবি তৈরি করো" এবং AI সেই ছবির মূল উপাদান, রঙ, কম্পোজিশন, স্টাইল ইত্যাদি অনুকরণ করে, তবে এটি মূল শিল্পীর মেধা চুরির শামিল হতে পারে। বিশেষ করে যদি ছবিটির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য (যেমন নির্দিষ্ট চরিত্র, লোগো, বা অনন্য নকশা) থাকে।
গ. হুবহু কপি না করলেও মূল ছবির "সারগর্ভ" অনুকরণ: ইসলামী আইনে শুধু হুবহু কপি করাই নিষিদ্ধ নয়, বরং কারো সৃষ্টির মূল বৈশিষ্ট্য ও স্বতন্ত্রতা অনুকরণ করাও অন্যায়। যদি ছবিটির মূল শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য, কম্পোজিশন, বা স্টাইল এমনভাবে অনুকরণ করা হয় যে তা দেখে বোঝা যায় এটি অমুক শিল্পীর কাজের অনুকরণ, তবে সেটি মেধা চুরি হিসেবে গণ্য হবে।
৪. হানাফী ফিকহের মূলনীতি
ইসলামী ফিকহের একটি মূলনীতি হলো:
"لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ" "কোনো ক্ষতি করা যাবে না এবং কারো ক্ষতির প্রতিশোধও নেওয়া যাবে না।" (মুয়াত্তা মালিক, হাদীস: ১২৩৫)
অন্য একটি মূলনীতি:
"النَّاسُ مُسَلَّطُونَ عَلَى أَمْوَالِهِمْ" "মানুষ তাদের সম্পদের উপর ক্ষমতাবান।" (আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর, ইবনে নুজাইম)
অর্থাৎ, কোনো শিল্পী বা ডিজাইনার তার সৃষ্টির উপর অধিকার রাখেন। তার অনুমতি ছাড়া তার সৃষ্টি থেকে উপকৃত হওয়া জায়েয নয়।
৫. ব্যবহারিক সমাধান
আপনার জন্য নিম্নোক্ত বিষয়গুলো মেনে চলা উচিত:
১. মূল ছবির মালিকের অনুমতি নিন: পিন্টারেস্ট থেকে ছবি ব্যবহারের পূর্বে ছবির মালিকের সাথে যোগাযোগ করে অনুমতি নিন।
২. AI-কে নির্দিষ্ট ছবির রেফারেন্স না দিয়ে শুধু ধারণা দিন: AI-কে কোনো নির্দিষ্ট ছবি দেখিয়ে "এটার মতো তৈরি করো" না বলে শুধু বর্ণনা দিন যেমন "ফুলের ব্যাকগ্রাউন্ড" বা "নীল রঙের বিমূর্ত নকশা"।
৩. ফ্রি বা ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের ছবি ব্যবহার করুন: এমন ছবি ব্যবহার করুন যেগুলো বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত (যেমন Unsplash, Pexels ইত্যাদি)।
৪. নিজস্ব সৃষ্টি তৈরি করুন: AI-এর সাহায্যে সম্পূর্ণ নতুন ও স্বতন্ত্র ডিজাইন তৈরি করুন যা কোনো নির্দিষ্ট শিল্পীর কাজের অনুকরণ নয়।
৬. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর:
১. পিন্টারেস্ট থেকে কপিরাইট সংরক্ষিত ছবি ডাউনলোড করে AI-কে রেফারেন্স হিসেবে দেওয়া এবং সেই ছবির ভিত্তিতে অনুরূপ ছবি তৈরি করে বিক্রি করা জায়েয হবে না। কারণ এটি মূল শিল্পীর মেধাস্বত্ব লঙ্ঘন এবং তাদের শ্রম ও পরিশ্রমের ফল অন্যায়ভাবে ব্যবহার করার শামিল।
২. যদি AI সম্পূর্ণ নতুন ও স্বতন্ত্র ছবি তৈরি করে যা কোনো নির্দিষ্ট ছবির অনুকরণ নয়, তবে সেটি ব্যবহার ও বিক্রি করা জায়েয।
৩. আপনি যদি মূল ছবির মালিকের কাছ থেকে লিখিত অনুমতি নিয়ে থাকেন, তবে সেটি ব্যবহার করা জায়েয।
৪. মেধা চুরির কারণে দুনিয়ায় আইনগত শাস্তি এবং আখিরাতে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি উভয়ই হতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি এমন কাজ করল যা আমাদের (দ্বীনের) মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৭১৮)
৭. অতিরিক্ত সতর্কতা
আপনি যদি নিশ্চিত না হন যে আপনার কাজটি কপিরাইট লঙ্ঘন করছে কিনা, তবে সন্দেহের ক্ষেত্রে ইসলামী নীতি হলো:
"مَنْ اتَّقَى الشُّبُهَاتِ فَقَدْ اسْتَبْرَأَ لِدِينِهِ وَعِرْضِهِ" "যে ব্যক্তি সন্দেহজনক বিষয় পরিহার করে, সে তার দ্বীন ও সম্মানকে পবিত্র রাখে।" (সহীহ বুখারী: ৫২, সহীহ মুসলিম: ১৫৯৯)
অতএব, সন্দেহজনক পথ পরিহার করা এবং সম্পূর্ণ বৈধ ও স্বতন্ত্র উপায়ে ডিজাইন তৈরি করা আপনার জন্য উত্তম।
والله أعلم بالصواب
(আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী)