শিরক হবে কিনা
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
বাচ্চার গলায় কালো সুতা ও তেল পড়ানোর বিধান
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
আপনার একজন আত্মীয়ের বাচ্চা রাতে খুব কান্না করত। একজন পরহেজগার ব্যক্তি সরিষার তেলে পড়ে (দুয়া করে ফুঁ দিয়ে) এবং কালো সুতায় সাতটি গিট বেঁধে তা বাচ্চার গলায় পরিয়ে দেন। এরপর বাচ্চার কান্না বন্ধ হয়ে যায়। প্রশ্ন হলো, এ ধরনের কাজ কি জায়েজ?
উত্তর
১. তাবীয (তাগা/কবচ) পরানোর মূল নীতি
ইসলামে তাবীয বা কবচ পরানোর ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী:
- কুরআনের আয়াত বা সহীহ দুয়া দ্বারা লিখিত তাবীয পরানো জায়েজ আছে, যদি তা শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে হয়।
- তবে অজানা বস্তু, জাদু-টোনা, বা শিরকী কালাম দ্বারা লিখিত তাবীয পরানো সম্পূর্ণ হারাম ও শিরক।
২. হানাফী ফিকহের নির্ভরযোগ্য উক্তি
ইমাম ইবনে আবেদীন শামী (রহঃ)《রদ্দুল মুহতার》:এ লিখেন,
"لَا بَأْسَ بِتَعْلِيقِ التَّمَائِمِ إِذَا كَانَتْ مِنْ كَلَامِ اللَّهِ أَوْ أَسْمَائِهِ"
"আল্লাহর কালাম বা তাঁর নামসমূহ দ্বারা লিখিত তাবীয পরানোতে কোনো দোষ নেই।"
তবে তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, যদি তাবীযে শিরকী বস্তু বা অজানা কিছু থাকে, তবে তা জায়েজ নয়।
আল-হিদায়া গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) থেকে তাবীয পরানোর অনুমতি প্রমাণিত। ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ) বলেছেন, কুরআনের আয়াত দ্বারা লিখিত তাবীয পরানো জায়েজ।
৩. কালো সুতায় গিট বাঁধার বিধান
কালো সুতায় গিট বেঁধে পরানো ইসলামী পদ্ধতি নয়। এটি মূলত আরবের জাহেলী যুগের প্রথা বা ভারতীয় উপমহাদেশের স্থানীয় কুসংস্কার। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর হাদীসে এসেছে:
"إِنَّ الرُّقَى وَالتَّمَائِمَ وَالتِّوَلَةَ شِرْكٌ"
"নিশ্চয়ই ঝাড়-ফুঁক (শিরকী), তাবীয (শিরকী) এবং ভালোবাসার জন্য তাবীয—এগুলো শিরক।" (আবু দাউদ, হাদীস নং: ৩৮৮৩; ইবনে মাজাহ, হাদীস নং: ৩৫৩০)
এই হাদীসে সেই সকল তাবীয ও রুকইয়াকে শিরক বলা হয়েছে যাতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর উপর নির্ভর করা হয় বা অজানা ও শিরকী বস্তু ব্যবহার করা হয়।
৪. সরিষার তেলে পড়ার বিধান
তেলে পড়ে (দুয়া পড়ে ফুঁ দিয়ে) ব্যবহার করা—যদি তা কুরআনের আয়াত বা সহীহ দুয়া দ্বারা হয় এবং তেলকে শুধুমাত্র ওসিলা হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তবে তা জায়েজ হতে পারে। তবে যদি মনে করা হয় যে, তেলের মধ্যেই নিজস্ব কোনো শক্তি আছে বা তেলই উপকার করে, তাহলে তা শিরকের পর্যায়ে পৌঁছে যাবে।
৫. আমাদের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:
- উক্ত ব্যক্তি "পরহেজগার" ছিলেন
- তিনি সরিষার তেলে "পড়ে" দিয়েছিলেন
- কালো সুতায় সাতটি গিট বেঁধে গলায় পরিয়েছিলেন
- তিনি কী দুয়া পড়েছিলেন তা জানা যায়নি
এখানে মূল সমস্যা হলো: ১. কালো সুতা ও সাতটি গিট—এটি ইসলামী পদ্ধতি নয়, বরং কুসংস্কার ও জাহেলী প্রথা ২. তিনি কী পড়েছিলেন তা অজানা—যদি কুরআনের আয়াত বা সহীহ দুয়া পড়ে থাকেন, তাহলে তেল ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু সুতা পরানো ইসলামসম্মত নয় ৩. বাচ্চার কান্না বন্ধ হওয়াকে এই কর্মের সাথে সম্পর্কিত করা—এতে করে মনে হতে পারে যে, সুতা বা গিটেরই প্রভাব আছে
৬. ফাতাওয়া উসমানী ও ইমদাদুল ফাতাওয়া থেকে
মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহঃ) এর ফাতাওয়ায় উল্লেখ আছে যে, তাবীয পরানো জায়েজ হওয়ার শর্ত হলো:
- তাতে কুরআনের আয়াত বা সহীহ দুয়া লিখিত হতে হবে
- পরিধানকারী বা তার অভিভাবক বিশ্বাস করবেন যে, প্রকৃত উপকার-অপকারকারী একমাত্র আল্লাহ
- তাবীযকে স্বয়ংসম্পূর্ণ উপকারী বস্তু মনে করা যাবে না
মুফতী তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) বলেছেন, আজকাল অনেক তাবীয-কবচে শিরকী বস্তু ও অজানা কালাম লেখা হয়, যা সম্পূর্ণ নাজায়েজ। এমনকি কুরআনের আয়াত দ্বারা লিখিত তাবীয পরানোও অনেক সময় ফিতনার কারণ হয়, কারণ সাধারণ মানুষ তাবীযকেই উপকারী মনে করে।
৭. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর:
১. কালো সুতায় সাতটি গিট বেঁধে গলায় পরানো—এটি ইসলামী শরীয়তসম্মত পদ্ধতি নয়। এটি কুসংস্কার ও জাহেলী প্রথা। এমন কাজ করা জায়েজ নয়।
২. সরিষার তেলে পড়ে ব্যবহার করা—যদি তাতে কুরআনের আয়াত বা সহীহ দুয়া পড়া হয় এবং তেলকে শুধু ওসিলা মনে করা হয়, তবে তা জায়েজ হতে পারে। কিন্তু যেহেতু তিনি কী পড়েছিলেন তা জানা যায়নি, তাই সেটি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে না।
৩. বাচ্চার কান্না বন্ধ হওয়া—এটি হয়তো আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘটনা, অথবা সময়ের সাথে সাথে বাচ্চার কান্নার কারণ দূর হয়ে গেছে। একে সুতা বা গিটের প্রভাব মনে করা ঠিক নয়।
৮. শরীয়তসম্মত বিকল্প পদ্ধতি
বাচ্চার কান্না বা অসুস্থতার জন্য শরীয়তসম্মত পদ্ধতি হলো:
১. দুয়া ও যিকির: বাচ্চার জন্য দুয়া করা, যেমন:
- "أُعِيذُكَ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ"
- (আল্লাহর পরিপূর্ণ কালামসমূহের মাধ্যমে আমি তোমাকে প্রতিটি শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী এবং প্রতিটি বদনজর থেকে আশ্রয় দিচ্ছি)
২. সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ে বাচ্চার উপর ফুঁ দেওয়া
৩. মাসনূন দুয়া পড়ে পানি বা তেলে ফুঁ দিয়ে ব্যবহার করানো—এটি জায়েজ
৪. চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া: বাচ্চার কান্নার শারীরিক কারণ থাকতে পারে, তাই ডাক্তার দেখানোও জরুরি
৯. তাওবা ও সতর্কতা
যেহেতু কাজটি ইতিমধ্যে হয়ে গেছে এবং বাচ্চা ভালো হয়ে গেছে, তাই:
- মনে করতে হবে যে, প্রকৃত উপকার করেছেন আল্লাহ
- উক্ত ব্যক্তিকে ভদ্রভাবে বোঝানো উচিত যে, ইসলামী পদ্ধতি অনুযায়ী দুয়া-যিকির করাই উত্তম
- ভবিষ্যতে এ ধরনের কুসংস্কারমূলক কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত
মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শিরক ও কুসংস্কার থেকে হেফাজত করুন। আমীন।