সন্তান প্রসবের পর শাশুড়ির সাথে সম্পর্কের সমস্যা, স্বামীর অসহযোগিতা ও পারিবারিক অশান্তি নিয়ে সমাধান জানতে চাই।

Family Life · Hanafi

Question No: 5000
Questioner: Sayeda Yasmin
Question Asked: 05 Sep 2026, 12:02 PM
Reviewed & Published: 05 Sep 2026, 12:05 PM
Views: 26
Tokens: 5,169
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি বাসার সব কাজকর্ম করি,আমার শ্বাশুড়ি হেল্প করে।আমার বাচ্চা হয়েছে ২০ দিন। আমি আগেরমতো এক্টিভ থাকতে পারিনা।দুপুরের রান্নাটা শ্বাশুড়িকে করতে
হয়,বাকিসময়ের রান্না আমি করি,অন্যান্য
কাজও আমি।কিন্তু উনি যে আমাকে হেল্প করে এটা নিয়ে কুঠা দেয়।বলে বাচ্চা আমাদেরও হয়েছে।আমরা সব কাজ করেছি ।।আমার বেবি রাতে ঘুমায় না।আমাকে নিয়ে বসে থাকতে হয় সকাল ৮.০০ টা অবধি।ঘুমের কারণে আমি চোখ খুলতে
পারিনা। বেবি ঘুমালে আমিও ঘুমিয়ে পরি। এতে আমার শ্বাশুড়ি অসন্তুষ্ট। আমাকে কটু কথা শুনায়।আমার ফ্যামেলি নিয়ে কথা বলে খুব খারাপ ভাষায়।আমার স্বামীর সাথে শেয়ার করলে আমাকে সবরের কথা বলে।কিন্তু উনি বাসায় আসলে উনার মা যা বুঝায় তাই বুঝে আর আমাকে বলে আম্মুর সাথে সাথে কাজ করতে পারনা
,উনারা কষ্ট পায় এমন কিছু করবে না।কিন্তু আমি যে কষ্ট পায় তার কোন দাম নাই।সবসময় শ্বাশুড়িই রাইট।আমার করণীয় কী উস্তাজ

Answer

আপনার প্রশ্নের উত্তর

প্রশ্ন: আমি বাসার সব কাজ করি, আমার শ্বাশুড়ি হেল্প করেন। আমার ২০ দিনের বাচ্চা হয়েছে। আমি আগের মতো সক্রিয় থাকতে পারছি না। শ্বাশুড়ি আমাকে নিয়ে কটু কথা বলেন, আমার ফ্যামিলি নিয়ে খারাপ ভাষায় কথা বলেন। স্বামীকে বললে তিনি সবরের কথা বলেন। আমার করণীয় কী?


উত্তর

بسم الله الرحمن الرحيم

প্রিয় বোন, আপনার অবস্থা বুঝতে পারছি। সন্তান প্রসবের পর ২০ দিনে একজন মায়ের জন্য এত কাজ করা সত্যিই কঠিন। ইসলাম আপনার এই কষ্টের কথা জানে এবং আপনাকে সান্ত্বনা দেয়।

১. ইসলামী দৃষ্টিতে নারীর মর্যাদা ও সন্তান প্রসবের সম্মান

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "জান্নাত রয়েছে মায়ের পায়ের নিচে।" (সুনানে নাসাঈ: ৩১০৪)

আরেকটি হাদিসে আছে, জননী হিসেবে নারীর মর্যাদা সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন: "আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে এবং তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে।" (সূরা লুকমান: ১৪)

আপনি সন্তান প্রসবের পরবর্তী অবস্থায় আছেন—এটি ইসলামী দৃষ্টিতে অত্যন্ত সম্মানজনক ও গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে বিশ্রাম নেওয়া আপনার শরয়ী অধিকার।

২. নিফাস (সন্তান প্রসব-পরবর্তী অবস্থা) সম্পর্কে ইসলামী বিধান

হানাফী ফিকহ অনুযায়ী, সন্তান প্রসবের পর সর্বোচ্চ ৪০ দিন পর্যন্ত নিফাসের অবস্থা থাকে। এই সময়ে মহিলারা নামাজ, রোজা থেকে বিরত থাকেন এবং এটি তাদের জন্য শারীরিক ও মানসিক বিশ্রামের সময়। (রদ্দুল মুহতার: ১/২৯৭)

আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন: "আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে বোঝা দেন না।" (সূরা বাকারা: ২৮৬)

আপনার শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় এত কাজ করা আপনার জন্য উচিত নয়। আপনার শরীরের যত্ন নেওয়া জরুরি।

৩. স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ও পারস্পরিক সহযোগিতা

কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: "তারা (স্ত্রী) তোমাদের জন্য পোশাকস্বরূপ এবং তোমরা তাদের জন্য পোশাকস্বরূপ।" (সূরা বাকারা: ১৮৭)

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, ঘরের কাজে স্ত্রীকে সাহায্য করা স্বামীর কর্তব্য নয়, তবে এটি উত্তম আচরণের অংশ। কিন্তু স্ত্রী অসুস্থ বা দুর্বল অবস্থায় থাকলে তার দেখাশোনা করা স্বামীর নৈতিক দায়িত্ব।

রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে ঘরের কাজে সাহায্য করতেন। আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘরে কী করতেন? তিনি বললেন: "তিনি ঘরের কাজে পরিবারের সদস্যদের সাহায্য করতেন।" (সহীহ বুখারী: ৬৭৬)

৪. শাশুড়ির সাথে আচরণের নীতি

ইসলামে শাশুড়ির সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ রয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, আপনি অন্যায় সহ্য করবেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।" (সহীহ বুখারী: ১০)

আপনার শাশুড়ির কটু কথা ও খারাপ ভাষা ব্যবহার করা ইসলামী আদর্শের পরিপন্থী। তবে আপনার কর্তব্য হলো ধৈর্য ধারণ করা এবং উত্তম পন্থায় বিষয়টি সমাধান করা।

৫. আপনার করণীয় সম্পর্কে ব্যবহারিক পরামর্শ

ক) স্বামীর সাথে কথা বলুন:

  • আপনার স্বামীকে বোঝান যে, আপনি সন্তান প্রসবের পরবর্তী অবস্থায় আছেন এবং এই সময়ে আপনার বিশ্রাম প্রয়োজন।
  • আপনার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা সম্পর্কে খোলাখুলি বলুন।
  • হাদিসের আলোকে তাকে বোঝান যে, নবী ﷺ নিজে স্ত্রীদের সাহায্য করতেন।

খ) শাশুড়ির সাথে সম্মানজনক আচরণ বজায় রাখুন:

  • তার সাথে রাগ করে কথা বলবেন না।
  • তাকে বোঝানোর চেষ্টা করুন যে, আপনি তার সাহায্যের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন, কিন্তু শারীরিকভাবে আপনি এখন সক্ষম নন।
  • প্রয়োজনে কোনো বিজ্ঞ আলেম বা পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠকে মধ্যস্থতা করতে বলুন।

গ) ধৈর্য ধারণ করুন:

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যে ধৈর্য ধারণ করবে, আল্লাহ তাকে ধৈর্য দান করবেন।" (সহীহ বুখারী: ১৪৬৯)

তবে ধৈর্য ধারণ করার অর্থ এই নয় যে, আপনি চুপ করে থাকবেন। বরং উত্তম পন্থায় আপনার কথা বলবেন।

ঘ) দোয়া করুন:

আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন তিনি আপনার পরিবারে শান্তি স্থাপন করেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না: ... আর সন্তান প্রসবকারিণী মায়ের দোয়া।" (সুনানে আবু দাউদ: ১৫৩১)

৬. ইসলামী নির্দেশনা

১. আপনার শরীরের যত্ন নিন - নিফাসের সময় বিশ্রাম নেওয়া আপনার জন্য জরুরি। নিজেকে অতিরিক্ত ক্লান্ত করবেন না। ২. স্বামীর সাথে সম্পর্ক উন্নত করুন - তাকে বুঝিয়ে বলুন, আপনার এই অবস্থায় তার সহযোগিতা প্রয়োজন। ৩. শাশুড়ির সাথে সদয় আচরণ করুন - তবে তার অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করুন মৃদু ভাষায়। ৪. ধৈর্য ও সবর করুন - এটি আপনার জন্য সাওয়াবের কাজ।

আল্লাহ তায়ালা বলেন: "নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদেরকে তাদের প্রতিদান হিসাব ছাড়াই পূর্ণ করে দেওয়া হবে।" (সূরা যুমার: ১০)


সূত্র:

  • রদ্দুল মুহতার (১/২৯৭)
  • সহীহ বুখারী (৬৭৬)
  • সুনানে নাসাঈ (৩১০৪)
  • সূরা বাকারা (১৮৭, ২৮৬)
  • সূরা লুকমান (১৪)
  • সূরা যুমার (১০)

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.