কিশোর সন্তানের বদমেজাজি নিয়ন্ত্রণের দোয়া
Family Life · Hanafi
Question
আমার কয়েকটা প্রশ্ন ছিলো।
১. আমার ভাই এবার এসএসসি পরীক্ষা দিবে। বয়স ১৬ বছর। আমি ওকে খুব ভালোবাসি। আমরা একভাই এক বোন।
আমার ভাইটা ভীষণ বদমেজাজি। মায়ের সাথে আব্বু সাথে রেগে গিয়ে অনেক বাজে ব্যবহার করে। মা'কে অনেক কষ্ট দিয়ে কথা বলে। মা আমাকে শুধু বলে। সারাদিন মন খারাপ করে থাকে ওর ব্যবহারে কষ্ট পেয়ে। আবার মাঝে মাঝে কান্নাও করে। অথচ আমি আমার মা'কে কখনো কান্না করতে দেখিনি। আমার মা খুব শক্ত মনের মানুষ। সেই মানুষটা কতটা কষ্ট পেলে কান্না করে, সারাদিন মন খারাপ করে থাকে। আমার ভাই আমাকেও রেগে গিয়ে তুই, তুখারি করে। আমাকে কষ্ট দিয়ে বলে বলে। আমাকে অনেক রাগায়। কিন্তু আমি নিজেকে কন্ট্রোল করার চেষ্টা করি সবসময়। ওর জন্য আল্লাহর কাছে অনেক কেঁদে কেঁদে দু'আ করি। তাহাজ্জুদে, এমনি নামাজে, মুনাজাতে। রমাদ্বনের শেষ ১০ রাতেও ওর জন্য অনেক দু'আ করেছি। কাঁদতে কাঁদতে যেন ভেঙে পড়ি আল্লাহর কাছে। আল্লাহ যেন ওকে সহিহ বুঝ দান করেন। দ্বীনের দায়ী হিসাবে কবুল করেন।
অথচ ও ঠিকমতো সালাত পড়ে না, সবসময় খেলাধুলা, মোবাইল, বাজে ছেলেদের সাথে মেলামেশা পড়াশোনাও করে না। কিছু বললেই বলে আমি কি নেশা করি নাকি? কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে ও এসবও হয়তো একসময় করে বসবে। ওকে ভালো মন্দ কিছুই বলা যায় না। সবসময় রেগে যায়। নিজে যা বুঝে তাই করবে,,কারোর কথাই শুনবে না,ও ওর মন মতো চলবে। চলতে দিলে ভালো নয়তো আমরা খারাপ।
আজকে সকালের ঘটনা। আমি ওকে খুব সুন্দর ভাবে ময়না, সোনা বাবু বলে ডাকি। মিষ্টি করে নরম করে বুঝানোর চেষ্টা করি। মা'কে এভাবে বলা যাবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। সবসময় সবর রাখি। কিন্তু আজকে ও একটা তুচ্ছ ঘটনায় - আমি বললাম রান্না হয়ে গেছে খেতে আসো। সে টিভি দেখছে। এমনিতেই এসব মুভি গান আমি পছন্দ করি না। আমি সবর রেখে ওকে গিয়ে বললাম এসব দেখতে হয় না তুমি খেতে যাও। ও টিভি বন্ধ করছে না দেখে আমিই বন্ধ করে দিলাম এরপর আমাকে লাথি দেওয়া শুধু করলো, রেগে গিয়ে আবার টিভি দিল। তখনও বলছিলাম যাও খাবার খাও। তখন ও আমার ওপর চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলে। তুই এখান থেকে যাবি? তোর বুকের ছাতি ভেঙে ফেলবোনি, তুই এখান থেকে সর। তোকে এতা করবো সেতা করবো ইত্যাদি ইত্যাদি।
আমার ওর কথা শুনে খুব কষ্ট লাগলো। আর আমি ওর ওপর অনেক চিল্লাইছি। ওর হাতে রিমোট ছিল। আমি রিমোট নিয়ে ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো করে দিয়েছি। যে ছোট থেকে বড় করলাম, এতো সুন্দর করে তোর সাথে কথা বলি আর তুই আমাকে এভাবে কষ্ট দিয়ে কথা বলিস? আমি ভীষণ রেগে গেছিলাম। খুব কষ্ট থেকে প্রায় কেঁদে কেঁদে কথাগুলো ওকে বলেছি। আমার আশংকা হচ্ছে - আমার গলার আওয়ার বাহিরের পরপুরুষও শুনেছে। তখন নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেছিলাম। খুব কষ্ট পেয়েছিলাম ওর কথায়। যে ছোট একটা ছেলে হয়ে আমার ওপর চোখ গরম করে এত বড় বড় কথা বলে আমাকে? সবসময় ধৈর্য রাখলেও আজকে রাখতে পারিনি খুব কষ্ট থেকে কথাগুলো বলেছি।
এখন আমার করনীয় কি? ওকে কিভাবে ভালো মানুষ হিসাবে তৈরি করা যায়? ওর জন্য সবাই আমরা অনেক চিন্তিত।
আর আমারও বড় ভুল হয়েছে ওত জোরে জোরে চিল্লায়ে কথা বলেছি।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার ভাইয়ের আচরণ এবং আপনার মনের কষ্ট আমি বুঝতে পারছি। এটি একটি পারিবারিক সমস্যা, যা অনেক পরিবারেই দেখা যায়। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এবং হানাফি ফিকহের আলোকে আমি আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি।
আপনার করণীয় সম্পর্কে ইসলামী নির্দেশনা:
১. ধৈর্য ও সহনশীলতা (সবর): আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন, "নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" (সূরা আল-বাকারা: ১৫৩)। আপনার ভাইয়ের আচরণে আপনি ধৈর্য হারিয়েছেন, এটা স্বাভাবিক মানবিক দুর্বলতা। তবে মনে রাখবেন, ধৈর্য ধারণ করা এবং ক্ষমা করা উত্তম। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "যে ব্যক্তি ক্ষমা করে দেয়, আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন।" (সহিহ মুসলিম)।
২. ভাইয়ের জন্য দোয়া করা: আপনি ইতিমধ্যেই আপনার ভাইয়ের জন্য অনেক দোয়া করছেন, এটি খুবই উত্তম কাজ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে তার জন্য দোয়া করা কবুল হয়।" (সহিহ মুসলিম)। আপনার দোয়া চালিয়ে যান। আশা করা যায়, আল্লাহ আপনার ভাইকে হেদায়েত দান করবেন।
৩. ভাইকে বোঝানোর পদ্ধতি: আপনি তাকে ভালোবেসে, নরমভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তিনি রেগে যান। ইসলামে উপদেশ দেওয়ার সময় নরম ভাষা ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে, যদি তিনি না শোনেন, তাহলে জোর করে বোঝানোর চেষ্টা না করে, তাকে সময় দিন। কিশোর বয়সে অনেক সময় এমন আচরণ হয়ে থাকে। তার ভালো কাজের প্রশংসা করুন, এবং ধীরে ধীরে ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো (নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত) শেখানোর চেষ্টা করুন।
৪. রাগ নিয়ন্ত্রণ: আপনি নিজেও রেগে গিয়ে চিৎকার করেছেন এবং রিমোট ভেঙেছেন। এতে আপনার ভাইয়ের উপর প্রভাব পড়তে পারে। রাগ নিয়ন্ত্রণের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন।
৫. পরিবারের সবার সম্মান রক্ষা: আপনার ভাই মা-বাবার সাথে খারাপ ব্যবহার করে, এটি ইসলামী দৃষ্টিতে মারাত্মক গুনাহ। মা-বাবার অবাধ্য হওয়া কবিরা গুনাহ। আপনার উচিত তাকে এই বিষয়ে সতর্ক করা, তবে নরমভাবে। আপনি তাকে বলতে পারেন, "মা-বাবার সাথে খারাপ ব্যবহার করা আল্লাহর কাছে খুবই অপছন্দনীয়।"
৬. পর্দা ও শব্দ নিয়ন্ত্রণ: আপনি উল্লেখ করেছেন যে, আপনার চিৎকারের শব্দ বাইরের অপরিচিত পুরুষ শুনেছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইসলামে নারীদের জন্য পর্দা করা ফরজ। চিৎকার করে কথা বলা, বিশেষ করে এমনভাবে যে, বাইরের লোক শুনতে পায়, তা পর্দার পরিপন্থী। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে সতর্ক থাকুন। প্রয়োজনে ভাইকে শান্তভাবে, নিচু স্বরে বোঝানোর চেষ্টা করুন।
ভাইকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার উপায়:
১. তাকে সময় দিন: তার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলুন। তার পছন্দ-অপছন্দ সম্পর্কে জানুন। ২. ভালো বন্ধু নির্বাচনে উৎসাহ দিন: তাকে ভালো বন্ধুদের সাথে মেলামেশা করতে উৎসাহিত করুন। মসজিদের পরিবেশের সাথে যুক্ত করার চেষ্টা করুন। ৩. নামাজের প্রতি আগ্রহ তৈরি করুন: তাকে জোর করে নামাজ পড়তে বাধ্য না করে, নামাজের ফজিলত ও গুরুত্ব সম্পর্কে সুন্দরভাবে বোঝান। নিজে নিয়মিত নামাজ পড়ুন, যাতে সে আপনার কাছ থেকে শেখে। ৪. মোবাইল ও টিভির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ: তাকে মোবাইল ও টিভির ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে বোঝান। ৫. তাকে দ্বীনের দাওয়াত দিন: তাকে ইসলামী বই, অডিও, ভিডিও ইত্যাদি উপহার দিন। তার সাথে ইসলামী আলোচনা করুন। ৬. তার জন্য দোয়া করতে থাকুন: আপনার দোয়া চালিয়ে যান। বিশেষ করে শেষ রাতে (তাহাজ্জুদ) তার জন্য দোয়া করুন।
পিতামাতার ভূমিকা:
আপনার ভাইয়ের আচরণ নিয়ন্ত্রণে আপনার পিতামাতার ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তারা যদি তাকে শাসন করতে পারেন, তাহলে ভালো হয়। তবে, তারা যেন খুব কঠোর না হন, কারণ এতে তিনি আরও বিদ্রোহী হয়ে উঠতে পারেন। তাদের উচিত তাকে ভালোবাসা দিয়ে, ধৈর্য ধরে বোঝানো।
উপসংহার:
আপনার ভাইয়ের জন্য ধৈর্য ধরুন, দোয়া করতে থাকুন, এবং তাকে ভালোবাসা দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করুন। নিজেও রাগ নিয়ন্ত্রণে রাখুন। আশা করি, আল্লাহ আপনার ভাইকে হেদায়েত দান করবেন এবং আপনার পরিবারে শান্তি ফিরে আসবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।