তাহাজ্জুদ নামাযে দোয়া করা
Waswasa-OCD · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্নোত্তর: তাহাজ্জুদের দোয়া এবং পরবর্তী নামাজে তার পুনরাবৃত্তি
উত্তর
আলহামদুলিল্লাহ, আপনার প্রশ্নের উত্তরে বলছি—
তাহাজ্জুদ নামাজ বরকতময় ইবাদত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"আল্লাহ তাআলা প্রতি রাতে দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন যখন রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকে এবং বলেন: কে আছে যে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আছে যে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দান করব? কে আছে যে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আমি তাকে ক্ষমা করব?" (সহীহ বুখারী: ১১৪৫, সহীহ মুসলিম: ৭৫৮)
মূল প্রশ্নের উত্তর
আপনি তাহাজ্জুদে দোয়া করেন এবং পরবর্তীতে যোহর, আসর, মাগরিব, এশার নামাজে এভাবে দোয়া করেন যে, "হে আল্লাহ! আমি তাহাজ্জুদে যা দোয়া করেছি তা কবুল করে নিন।"
এ বিষয়ে ইসলামী বিধান হলো:
প্রথমত: তাহাজ্জুদের দোয়া কবুল হওয়ার বিশেষ সময়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"রাতের এমন একটি মুহূর্ত আছে যে, কোনো মুসলিম ব্যক্তি যদি সে সময় আল্লাহর কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের কোনো কল্যাণ চায়, তবে আল্লাহ তাকে তা প্রদান করেন।" (সহীহ মুসলিম: ৭৫৭)
দ্বিতীয়ত: আপনি যদি তাহাজ্জুদে আন্তরিকভাবে দোয়া করেন এবং পরবর্তীতে অন্যান্য নামাজে সেই দোয়ার পুনরাবৃত্তি করেন, তবে এটি আপনার দোয়ার গুরুত্ব ও আগ্রহ প্রকাশ করে। এটি কোনো সমস্যার বিষয় নয়। বরং বারবার দোয়া করা এবং আল্লাহর কাছে তাওয়াসসুল (আবেদন) করা মুস্তাহাব।
তৃতীয়ত: তবে মনে রাখতে হবে, দোয়া কবুল হওয়া সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। আল্লাহ বলেন:
"তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।" (সূরা গাফির: ৬০)
তবে এর অর্থ এই নয় যে, প্রতিটি দোয়া অবশ্যই কবুল হবে। দোয়া কবুলের জন্য শর্ত হলো:
- আন্তরিকতা ও একনিষ্ঠতা
- হালাল রিজিক
- গুনাহ থেকে বিরত থাকা
- দোয়ায় তাড়াহুড়া না করা
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"তোমাদের প্রত্যেকের দোয়া কবুল হয়, যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়া করে এবং বলে: আমি দোয়া করলাম কিন্তু আমার দোয়া কবুল হলো না।" (সহীহ বুখারী: ৬৩৪০, সহীহ মুসলিম: ২৭৩৫)
চতুর্থত: দোয়া কবুল হওয়ার তিনটি উপায় রয়েছে: ১. আল্লাহ তাৎক্ষণিকভাবে দোয়া কবুল করেন এবং বান্দা যা চায় তা দান করেন। ২. আল্লাহ দোয়ার বিনিময়ে বান্দার থেকে কোনো বিপদ দূর করেন। ৩. আল্লাহ দোয়াটিকে আখিরাতের জন্য জমা রাখেন এবং সেখানে অধিক প্রতিদান দেন।
ইমাম নববী (রহ.) বলেছেন: "দোয়া কবুল হওয়ার অর্থ এই নয় যে, যা চাওয়া হয়েছে তা-ই দিতে হবে; বরং দোয়া কবুলের তিনটি রূপ রয়েছে—কখনো তাৎক্ষণিকভাবে দান করা হয়, কখনো বিপদ দূর করা হয়, আর কখনো আখিরাতের জন্য জমা রাখা হয়।" (শরহু মুসলিম: ১৭/৫)
বিশেষ নোট
আপনি যদি তাহাজ্জুদে দোয়া করেন এবং মনে করেন যে, "আমি তাহাজ্জুদে দোয়া করেছি, তাই তা অবশ্যই পূরণ হবে"—এমন ধারণা রাখা উচিত নয়। বরং দোয়ার পর আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে হবে এবং ধৈর্য ধরতে হবে। আল্লাহ যা ভালো মনে করবেন তা-ই করবেন।
ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রহ.) বলেছেন: "দোয়া কবুল হওয়ার জন্য ধৈর্য ও আস্থা অপরিহার্য। বান্দা যখন দোয়া করে এবং আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা রাখে, তখন আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেন—হয় তাৎক্ষণিকভাবে, নয়তো বিলম্বে, কিন্তু সর্বাবস্থায় বান্দার জন্য যা কল্যাণকর তা-ই ঘটে।"
উপসংহার
আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হলো: তাহাজ্জুদে দোয়া করা এবং পরবর্তীতে অন্যান্য নামাজে সেই দোয়ার কথা স্মরণ করে আল্লাহর কাছে পুনরায় চাওয়া—এটি সম্পূর্ণ বৈধ এবং উত্তম। তবে সব চাওয়া পূরণ হবে কি না, তা আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। আল্লাহ সর্বজ্ঞ এবং তিনি জানেন আপনার জন্য কী কল্যাণকর। দোয়া কবুলের তিনটি রূপই আপনার জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং আমাদের দোয়া কবুল করুন। আমিন।
দলিলসমূহ:
- সূরা গাফির: ৬০
- সহীহ বুখারী: ১১৪৫, ৬৩৪০
- সহীহ মুসলিম: ৭৫৭, ৭৫৮, ২৭৩৫
- শরহু মুসলিম (ইমাম নববী): ১৭/৫