আল্লাহ কে নিয়ে ওয়াসওয়াসা কাজ করা

Waswasa-OCD · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 4982
Questioner: Brsa
Question Asked: 05 Sep 2026, 06:27 AM
Reviewed & Published: 05 Sep 2026, 06:34 AM
Views: 2
Tokens: 6,380
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম, আমি সর্বদা রবের ইবাদত করার চেষ্টা করি,, আল্লাহ তায়ালার আদেশ নিষেধ গুলো মানার চেষ্টা করি। রবের দ্বীদার পাবার আশা আসমানের দিকে তাকিয়ে থাকি,,আর ২ চোখ দিয়ে অচিরেই পানি ঝড়ে। কবে রবের দ্বীদার পাবো। কবে তিনি ডাকবেন আমাকে তার দ্বীদারের লাভের জন্য। যেটা বলতে চাচ্ছি মাঝেমধ্যে মনের ভেতর এমন সব কুমন্ত্রণা,, কুধারনা আসে,যেগুলো আমি ভাবতেও চাই মনের নিজ অজান্তে চলে আসে,,এমন এমন সব ভাবনা ও ধারনা মনে আসে যেগুলো বলার মতো নয়। মনে হয় যেন আমি রবের সাথে শিরিক ও ইমান নস্ট হবার মতো ধারনা করি,, যেগুলো ভাবলে আমার ইমান নস্ট ও শিরিকের মতো ভয়ানক গুনাহ হয়,সেগুলো একের পর এক মনের মাঝে চলে আসে। তারপর আমি খুব ভয় পেয়ে যাই এই বুঝি আমি ইমান হারা ও রবের সাথে শিরিকের মতো অতি ভয়ানক পাপ করে ফেল্লাম,, ওয়াল্লাহি। তখন আমি আর ঠিক থাকতে পারি না,,যেই রবকে এত ভালোবাসি তার প্রতি আমার এসব ধারনা ও ভাবনা আমাকে খুব যন্ত্রণা দেয়। আবার মাঝেমধ্যে মনে হয় আমি নিজ ইচ্ছেতেই এগুলো ভাবছি।কিন্তু আমি যে আমার রবকে ভীষণ ভালোবাসি এগুলো ভাবার প্রশ্নই আসে না। ভয় হয় পরকালে যদি আল্লাহ আমাকে এসব ভাবনার জন্য পাকরাও করে ও আজাব দেন আমি তা কি করে সইবো।এগুলো ভাবলেই আমি মানসিক ভাবে খুব খুব ভেংগে পড়ি।আমি পারছি না হুজুর।দয়া করে আমাকে সাহায্য করুন। আপনার জন্য দুয়া করবো।

Answer

ওয়াসওয়াসা (Waswasa) সম্পর্কে ফতোয়া

উত্তর:

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

প্রিয় ভাই/বোন, আপনার সমস্যা বুঝতে পেরেছি। আপনি যে অবস্থার সম্মুখীন হচ্ছেন তা ইসলামী পরিভাষায় "ওয়াসওয়াসা" (وسوسة) নামে পরিচিত, যা শয়তানের কুমন্ত্রণা। এটি একটি পরিচিত মানসিক অবস্থা যা অনেক মুমিনের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে।

কুরআন ও হাদীসের আলোকে সমাধান:

১. ওয়াসওয়াসা শয়তানের কাজ:

আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন:

"যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, যখনই শয়তানের পক্ষ থেকে কোনো কুমন্ত্রণা তাদেরকে স্পর্শ করে, তখনই তারা আল্লাহকে স্মরণ করে এবং সাথে সাথে তাদের অন্তর্দৃষ্টি খুলে যায়।" (সূরা আল-আ'রাফ: ২০১)

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: "ওয়াসওয়াসা হলো শয়তানের পক্ষ থেকে অন্তরে নিক্ষেপ করা খারাপ চিন্তা, যা মানুষ নিজে চায় না এবং অপছন্দ করে।"

২. অনিচ্ছাকৃত খারাপ চিন্তার বিধান:

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:

"আল্লাহ তা'আলা আমার উম্মতের মনের সেই খেয়াল-খুশালাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন যতক্ষণ না তারা তা উচ্চারণ করে বা সে অনুযায়ী আমল করে।" (সহীহ বুখারী: ৫২৬৯, সহীহ মুসলিম: ১২৭)

শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: "যে ব্যক্তির মনে শিরক বা কুফরী সম্পর্কে ওয়াসওয়াসা আসে, কিন্তু সে তা ঘৃণা করে এবং বিশ্বাস করে না, তবে তার ঈমান ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। বরং এটি তার ঈমানের দৃঢ়তার প্রমাণ।"

৩. সাহাবাদের অভিজ্ঞতা:

সাহাবাগণও এই সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন। তারা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন:

"আমাদের মধ্যে কারো মনে এমন কিছু খেয়াল আসে যা বলতে আমরা অত্যন্ত লজ্জিত বোধ করি (অর্থাৎ আল্লাহ সম্পর্কে খারাপ ধারণা)।" রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: "এটিই (খাঁটি) ঈমানের লক্ষণ।" (সহীহ মুসলিম: ১৩২)

ইমাম নববী (রহিমাহুল্লাহ) এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন: "এর অর্থ হলো, শয়তানের এই কুমন্ত্রণাকে ঘৃণা করা এবং তা থেকে বিরত থাকা খাঁটি ঈমানের প্রমাণ। কারণ প্রকৃত কাফির বা মুনাফিকের মনে এসব চিন্তা আসে না, আর আসলেও তারা তা ঘৃণা করে না।"

৪. ওয়াসওয়াসা দূর করার উপায়:

ক. উপেক্ষা করা: শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: "ওয়াসওয়াসার চিকিৎসা হলো তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা এবং সেদিকে মনোযোগ না দেওয়া।"

খ. আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা: আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:

"বলুন: আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি মানুষের রবের... শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে।" (সূরা আন-নাস: ১-৪)

গ. আ'উযুবিল্লাহ পড়া: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:

"শয়তান তোমাদের কারো কাছে এসে বলে: 'কে তোমাকে সৃষ্টি করেছে? আল্লাহ। তবে আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছে?' তোমাদের কেউ যদি এই অবস্থার সম্মুখীন হয়, তবে সে যেন বলেঃ 'আমি আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি এবং তাঁর রাসূলগণের উপর।' (অর্থাৎ আ'উযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম বলবে এবং চিন্তা বাদ দেবে।)" (সহীহ বুখারী: ৩২৭৬)

ঘ. ওয়াসওয়াসা নিয়ে চিন্তা না করা: শায়খ সালেহ আল-ফাওযান (হাফিজাহুল্লাহ) বলেন: "ওয়াসওয়াসার সবচেয়ে বড় চিকিৎসা হলো তা নিয়ে ভাবা বন্ধ করা এবং সেটাকে গুরুত্ব না দেওয়া। যত বেশি গুরুত্ব দিবেন, তত বেশি বাড়বে।"

৫. আপনার জন্য বিশেষ পরামর্শ:

১. আপনার ঈমান নষ্ট হয়নি - যেহেতু আপনি এই চিন্তাগুলোকে ঘৃণা করেন এবং ভয় পান, এটি প্রমাণ করে আপনার অন্তরে ঈমান রয়েছে।

২. আল্লাহর রহমতের উপর ভরসা রাখুন - আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:

"বলুন: হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা আয-যুমার: ৫৩)

৩. এই চিন্তাগুলোকে গুরুত্ব দিবেন না - শায়খ ইবনে বায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: "অনিচ্ছাকৃত ওয়াসওয়াসার জন্য কোনো গুনাহ নেই, যতক্ষণ না ব্যক্তি তা বিশ্বাস করে বা উচ্চারণ করে বা সে অনুযায়ী আমল করে।"

৪. নিয়মিত যিকির করুন - সকাল-সন্ধ্যার যিকির, কুরআন তিলাওয়াত এবং নামাজে মনোযোগী হোন।

৫. মানসিক চাপ কমান - প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে পারেন, কারণ এটি একটি মানসিক অবস্থা যা চিকিৎসায় ভালো হয়।

সংক্ষিপ্ত উত্তর:

আপনার মনে যে খারাপ চিন্তাগুলো আসে, সেগুলো শয়তানের ওয়াসওয়াসা। যেহেতু আপনি সেগুলোকে ঘৃণা করেন এবং বিশ্বাস করেন না, তাই আপনার ঈমান নষ্ট হয়নি এবং আপনি শিরিকে লিপ্ত হননি। আল্লাহ আপনাকে এসব অনিচ্ছাকৃত চিন্তার জন্য পাকড়াও করবেন না। এগুলো উপেক্ষা করুন, আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করুন এবং নিয়মিত যিকির করুন।

"আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন না।" (সূরা আল-বাকারাহ: ২৮৬)

আল্লাহ আপনাকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে হিফাজত করুন এবং আপনার ঈমানকে মজবুত করুন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.