কেউ কি ৫ তলা বিল্ডিং রেখে কুঁড়েঘরে থাকতে চাইবে! এমন মন্তব্য কারী পাত্রের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া যাবে কি?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 4962
Questioner: Sanjida Sakia
Question Asked: 04 Sep 2026, 09:00 PM
Reviewed & Published: 04 Sep 2026, 09:18 PM
Views: 14
Tokens: 5,338
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

একটা ছেলের সাথে আমার বিয়ের আলাপ চলছে। তিনি প্রাকটিসিং মুসলিম। আমি তাকে প্রশ্ন করি, আমাকে ব্যক্তি হিসেবে তার পছন্দ কিনা? তখন তিনি আমাকে উত্তরে বলেন, উনি এগুলোর গুরুত্ব দেননা। উনি দ্বীনদারিতার গুরুত্ব দেন। তারপর আমি এই প্রশ্ন কয়েকবার করি তখন উনি আমাকে বলেন যে, ব্যক্তি হিসেবে গুরুত্ব দিলে উনি আমাকে বিয়ে করতেন না। করতেন এমন কাউকে যিনি খুব সুন্দরী দেখতে, যার অনেক লম্বা চুল, খুব সুন্দর কন্ঠস্বর, যিনি গুছিয়ে কথা বলতে পারেন, যার সুন্দর শারিরীক গঠন। তারপর উদাহরণ দিতে গিয়ে বললেন, কেউ কি ৫ তলা বিল্ডিং রেখে কুঁড়েঘরে থাকতে চাইবে!
আমি দ্বীন মানতে রাজি আছি এবং ওনার মনে হয়েছে তিনি আমার সাথে থাকলে শান্তিতে থাকবেন যেহেতু আমি ওনার জীবন নিয়ে চিন্তা ভাবনা জানি এবং তা মেনে নিয়েছি তাই তিনি আমাকে বিয়ে করতে চাচ্ছেন। এখন আমার প্রশ্ন হলো, যেহেতু তিনি আমাকে ব্যক্তি হিসেবে পছন্দ করেন না এক্ষেত্রে ওনাকে বিয়ে করা কি উচিত হবে?

Answer

বিবাহ সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

একজন পুরুষের সাথে আপনার বিবাহের আলাপ চলছে। তিনি দ্বীনদার কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে আপনাকে পছন্দ করেন না বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তিনি দ্বীনদারিতাকে প্রাধান্য দেন এবং ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দকে গুরুত্ব দেন না। তিনি আপনার সাথে বিবাহ করতে চান কারণ তিনি মনে করেন আপনার সাথে থাকলে তিনি শান্তিতে থাকবেন। এখন প্রশ্ন হলো, যেহেতু তিনি আপনাকে ব্যক্তি হিসেবে পছন্দ করেন না, সেক্ষেত্রে তাকে বিবাহ করা উচিত হবে কি না?

ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি

১. বিবাহের মূল উদ্দেশ্য

ইসলামে বিবাহের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, দ্বীনকে সুরক্ষিত রাখা এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা অর্জন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"নারীকে চারটি বিষয়ের জন্য বিবাহ করা হয়: তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য এবং তার দ্বীনদারিতা। তুমি দ্বীনদারকে অগ্রাধিকার দাও, তোমার উভয় হাত ধূলিময় হোক।" (সহীহ বুখারী: ৫০৯০, সহীহ মুসলিম: ১৪৬৬)

২. দ্বীনদারিতার গুরুত্ব

কুরআন ও হাদিসে দ্বীনদারিতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

"তোমাদের মধ্যে যে মুমিন দাস-দাসী আছে, সে মুশরিকের চেয়ে উত্তম, যদিও তোমরা মুশরিককে পছন্দ কর।" (সূরা আল-বাকারা: ২২১)

৩. পারস্পরিক ভালোবাসা ও আকর্ষণের গুরুত্ব

ইসলামে বিবাহে পারস্পরিক আকর্ষণ ও ভালোবাসাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"তোমাদের কেউ যখন এমন নারীকে দেখে যে তাকে বিবাহ করার ইচ্ছা পোষণ করে, তখন সে যেন তাকে দেখে নেয়। কারণ এটি তাদের মধ্যে প্রীতির সম্পর্ক সৃষ্টির জন্য বেশি উপযোগী।" (সুনানে তিরমিজি: ১০৮৭)

৪. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি

হানাফি ফিকহের প্রখ্যাত গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে যে, বিবাহের ক্ষেত্রে কুফু (সামঞ্জস্যতা) বিবেচনা করা জরুরি। তবে কুফু শুধু বংশ, সম্পদ বা সৌন্দর্যের ভিত্তিতে নয়; বরং দ্বীনদারিতা ও চরিত্রও কুফুর অন্তর্ভুক্ত।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন, বিবাহের মূল উদ্দেশ্য হলো ধর্মীয় ও নৈতিক জীবনযাপন। তাই দ্বীনদার ও সচ্চরিত্রবান ব্যক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

৫. ফাতাওয়া উসমানি ও ইমদাদুল ফাতাওয়ার দৃষ্টিভঙ্গি

মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি তাঁর ফাতাওয়ায় উল্লেখ করেছেন যে, বিবাহের পূর্বে উভয় পক্ষের পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ ও সম্মতি থাকা জরুরি। তবে এই আকর্ষণ শুধু শারীরিক সৌন্দর্যের ভিত্তিতে নয়; বরং চারিত্রিক ও ধর্মীয় গুণাবলির ভিত্তিতেও হতে পারে।

মুফতি রশিদ আহমদ লুধিয়ানভি বলেছেন, যদি কোনো পুরুষ দ্বীনদারিতার কারণে কোনো নারীকে বিবাহ করে, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে তাকে পছন্দ না করে, তাহলে এটি বিবাহের জন্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা। কারণ বিবাহিত জীবনে সুখ-শান্তির জন্য পারস্পরিক ভালোবাসা ও আকর্ষণ অপরিহার্য।

৬. বাস্তবিক বিশ্লেষণ

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, উক্ত ব্যক্তি:

  • আপনাকে ব্যক্তি হিসেবে পছন্দ করেন না
  • দ্বীনদারিতার কারণে আপনাকে বিবাহ করতে চান
  • আপনার সাথে থাকলে তিনি শান্তিতে থাকবেন বলে মনে করেন
  • তিনি সৌন্দর্য, দৈহিক গঠন ইত্যাদিকে গুরুত্ব দেন (যদিও বলেছেন গুরুত্ব দেন না, কিন্তু তাঁর বক্তব্য থেকে বোঝা যায় তিনি এসব বিষয়ে সচেতন)

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি যদি সত্যিই দ্বীনদারিতাকে প্রাধান্য দেন এবং আপনার দ্বীনদারিতার কারণে আপনাকে বিবাহ করতে চান, তাহলে এটি প্রশংসনীয়। কিন্তু তিনি যদি মনে মনে অন্য ধরনের নারী পছন্দ করেন এবং আপনাকে শুধু "কুড়েঘর" হিসেবে দেখেন (তাঁর ৫ তলা বিল্ডিং-এর উদাহরণ অনুযায়ী), তাহলে এটি ভবিষ্যতে দাম্পত্য জীবনে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

৭. গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

ক. ইস্তিখারা করুন: বিবাহের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আল্লাহর কাছে ইস্তিখারা করুন এবং হেদায়েত প্রার্থনা করুন।

খ. খোলামেলা আলোচনা করুন: তাঁর সাথে খোলামেলা আলোচনা করুন। জানতে চান তিনি সত্যিই আপনাকে গ্রহণ করতে পারবেন কি না। যদি তিনি মনে মনে অন্য ধরনের নারী পছন্দ করেন, তাহলে ভবিষ্যতে তিনি কি আপনার প্রতি সন্তুষ্ট থাকতে পারবেন?

গ. পরিবারের পরামর্শ নিন: আপনার অভিভাবক ও পরিবারের সদস্যদের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করুন।

ঘ. দ্বীনদারিতাকে প্রাধান্য দিন: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশ অনুযায়ী দ্বীনদার ব্যক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। তবে এর অর্থ এই নয় যে, ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হবে।

ঙ. বাস্তবতা বিবেচনা করুন: যদি তিনি আপনাকে ব্যক্তি হিসেবে পছন্দ না করেন, তাহলে দাম্পত্য জীবনে কি তিনি আপনাকে সম্মান ও ভালোবাসা দিতে পারবেন? এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

ফিকহি রায়

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, বিবাহের বৈধতার জন্য উভয় পক্ষের সম্মতি জরুরি। তবে বিবাহের সুখ-শান্তির জন্য পারস্পরিক আকর্ষণ ও ভালোবাসা থাকা জরুরি নয়, বরং এটি কাম্য। যদি কোনো পুরুষ দ্বীনদারিতার কারণে কোনো নারীকে বিবাহ করে এবং নারীও দ্বীনদার পুরুষকে বিবাহ করতে রাজি থাকে, তাহলে বিবাহটি বৈধ ও উত্তম।

তবে আপনার ক্ষেত্রে, যেহেতু তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন যে তিনি আপনাকে ব্যক্তি হিসেবে পছন্দ করেন না, তাই আপনার উচিত:

  1. বিষয়টি নিয়ে আরও খোলামেলা আলোচনা করা
  2. বুঝার চেষ্টা করা যে তিনি সত্যিই আপনাকে গ্রহণ করতে পারবেন কি না
  3. ইস্তিখারা করা
  4. পরিবারের পরামর্শ নেওয়া

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

বিবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। দ্বীনদারিতার কারণে বিবাহ করা উত্তম, কিন্তু যদি ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ না থাকে, তাহলে তা দাম্পত্য জীবনে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। আপনার উচিত:

  • দ্বীনদার ব্যক্তিকে প্রাধান্য দেওয়া
  • তবে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা
  • আল্লাহর কাছে হেদায়েত প্রার্থনা করা

মনে রাখবেন: বিবাহের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি, দ্বীনের সুরক্ষা এবং শান্তি অর্জন। যদি উক্ত ব্যক্তি দ্বীনদার হয় এবং আপনি মনে করেন তাঁর সাথে বিবাহ করলে আপনার দ্বীন ও দুনিয়া উভয়ই ঠিক থাকবে, তাহলে বিবাহ করতে পারেন। কিন্তু যদি আপনার মনে সন্দেহ থাকে যে তিনি ভবিষ্যতে আপনাকে সম্মান ও ভালোবাসা দিতে পারবেন না, তাহলে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণের তাওফিক দান করুন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.