আমেরিকার সরকার যেহেতু আমার কাছ থেকে 15000 ডলার অন্যায় ভাবে নিয়েছে, এখন ক্রেডিট কার্ড ব্যাবহার করে ম্যাকবুক কিনে বাংলাদেশে চলে আসা এবং পরবর্তীতে তা পরিশোধ না করার চিন্তাটি কি সঠিক?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 4954
Questioner: 0061 Ramisa Nujhat
Question Asked: 04 Sep 2026, 03:53 PM
Reviewed & Published: 04 Sep 2026, 04:07 PM
Views: 10
Tokens: 5,637
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি আমেরিকা তে আসছি পড়ার সুবাদে, পরবর্তীতে আমি একটা মোবাইলের দোকানে চাকরি নি, আমার পড়া খাবার থাকা যানবাহন বাবদ অনেক টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছিল, আমি তাই এসাইলাম ক্লেইম করে ফেলি, যে কিছু দিন এখানে থেকে আমার যে টাকা খরচ হয়েছে তা উঠিয়ে, কিছু টাকা জমিয়ে দেশে ফিরে যাব, ২০২৪ এর জুলাই মাসে আমি আমেরিকার এরিজোনা তে আসি, এরপর ২০২৬ এর মে মাসের ৭ তারিখে আমাকে ICE ধরে নিয়ে যায় ডিটেনশন সেন্টার এ, ওখানে আমি ২১ দিন থাকি, ওখান থেকে বের হবার জন্য আমাকে ১৫০০০ ডলার দেয়া লাগে, আমি জানি না ইসলাম এ এর কি মতামত, আমার কাছে লেগেছে যে আমাকে হুদাই আমেরিকা কে এতগুলা টাকা দেয়া লাগছে, এর খরচ বাবদ আমি লয়ার হায়ার করি, তার পিছে ও আমার অনেক টাকা গেছে, এখন আমার অনলাইনে কোনো কেস নাই, আমাকে আবার এসাইলাম ক্লেইম করতে হচ্ছে,, আর যে টাকা গুলা লোন হয় গেছিল ওগুলো চুকানো লাগচতেছে,, এখন আমার কাছে ৩/৪ টা ক্রেডিট কার্ড আছে, আমাকে তো আমেরিকা ওগুলো খরচ করার জন্য এই দিছে, তো আমি যদি দেশে আসি যাওয়ার সময়, ঐ ক্রেডিট কার্ড থেকে কিছু জিনিস যেমন একটা মেকবুক, একটা আইপেড এগুলা কিনে আনি তাহলে এর ব্যাপারে ইসলাম কি বলে,??এখন আমি তো কোনো দোষ করি নাই, বা আমাকে শুধু শুধু ওরা ধরে নিয়ে গেছে, হুদাই এত গুলা টাকা দিছি, এন্ড এত কষ্ট করছি, এখন এটা ব্যাপারে ইসলাম কি বলে?

Answer

ইসলামী বিধান সম্পর্কে উত্তর

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: আপনি আমেরিকায় পড়তে এসে আর্থিক সংকটে পড়েন, তারপর আশ্রয়ের আবেদন (Asylum Claim) করেন। পরে ICE আপনাকে আটক করে এবং মুক্তির জন্য ১৫,০০০ ডলার জামানত দিতে হয়। এখন আপনার কাছে ক্রেডিট কার্ড আছে এবং আপনি দেশে ফেরার সময় সেগুলো থেকে ম্যাকবুক ও আইপ্যাড কেনার কথা ভাবছেন। জানতে চান ইসলাম কী বলে।


উত্তর

ভাই, আপনার ওপর দিয়ে যে কঠিন পরিস্থিতি ও আর্থিক ক্ষতি বয়ে গেছে, তার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে সমবেদনা প্রকাশ করছি। আমেরিকার এরিজোনাতে এসে ডিটেনশন সেন্টারে বন্দী থাকা, মুক্তি পেতে ১৫,০০০ ডলার বন্ড দেওয়া এবং লয়ারের পেছনে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ হওয়া নিঃসন্দেহে আপনার জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং একটি বড় পরীক্ষা। আল্লাহ তা'আলা আপনাকে এই কঠিন বিপদ ও ঋণ থেকে দ্রুত মুক্তি দিন এবং আপনার সমস্ত ক্ষতি পূরণ করে দিন।

তবে, আপনার ক্রেডিট কার্ডের লিমিট ব্যবহার করে ম্যাকবুক বা আইপ্যাড কিনে বাংলাদেশে চলে আসার এবং পরবর্তীতে তা পরিশোধ না করার যে চিন্তাটি আপনি করছেন, ইসলামি শরী'আতের দৃষ্টিতে তা সম্পূর্ণ হারাম, কবিরা গুনাহ এবং বিশ্বাসভঙ্গের শামিল।

হানাফী ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহের আলোকে এর সুনির্দিষ্ট শরয়ী কারণ ও দলিল নিচে বিস্তারিত পেশ করা হলো:


১. নিরাপত্তা চুক্তি বা আমানত (Visa as a Covenant of Trust):

আপনি যখন কোনো দেশে বৈধ ভিসা বা লিগ্যাল পারমিশন নিয়ে প্রবেশ করেন, তখন ইসলামি শরী'আতের দৃষ্টিতে তা একটি নিরাপত্তা চুক্তি বা 'আমানত' (Covenant of Trust/Aman) হিসেবে গণ্য হয়। এই চুক্তির কারণে আপনি সেই দেশের মানুষের জান-মাল রক্ষা করতে এবং কারো সাথে প্রতারণা না করতে ধর্মীয় ও নৈতিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ।

  • দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): 'হারাম সম্পদ ও সফটওয়্যার পাইরেসি' অধ্যায়, পৃষ্ঠা নং ৩৮৬। সেখানে ইসলামের বিখ্যাত কিতাব বাদায়েউস সানায়ে (৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৬)-এর বরাতে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে:

    "مال الحربي ليس بمعصوم ، بل هو مباح في نفسه إلا أن المسلم المستأمن منع من تملكه من غير رضاه لما فيه من الغدر والخيانة." অর্থাৎ: "অমুসলিমদের সম্পদ (যুদ্ধাবস্থা ছাড়া) মূলত সংরক্ষিত না হলেও, কোনো মুসলিম যখন তাদের দেশে নিরাপত্তা (ভিসা) নিয়ে প্রবেশ করে, তখন তাদের সম্মতি ছাড়া তাদের সম্পদ লাভ করা ওই মুসলিমের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কারণ এর মধ্যে প্রতারণা (গদর) এবং খিয়ানত বা বিশ্বাসভঙ্গ রয়েছে।"

  • ইমাম সারাখসী (রাহ.)-এর ফয়সালা: হানাফী মাযহাবের ইমাম আল্লামা সারাখসী (রাহ.) তাঁর বিখ্যাত কিতাব আল-মাবসূত (১০ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৬) -এ লিখেছেন:

    "নিরাপত্তা নিয়ে অমুসলিমদের দেশে প্রবেশ করার পর তাদের সাথে প্রতারণা (গদর) করাকে আমি কোনো মুসলিমের জন্য বৈধ মনে করি না। কারণ প্রতারণা বা বিশ্বাসভঙ্গ করা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম।"


২. প্রতারণা ও খিয়ানতের হুকুম (Deception & Breach of Contract):

ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার সময় আপনি ব্যাংকের সাথে চুক্তি করেছেন যে, আপনি এই টাকা পরবর্তীতে পরিশোধ করবেন। এখন যদি আপনার মনে পরিশোধ না করার পূর্ব-পরিকল্পনা থাকে, তবে কার্ড ব্যবহার করে পণ্য কেনা স্পষ্ট প্রতারণা (الغدر) এবং খিয়ানত (الخيانت), যা কোনো অমুসলিমের সাথে করাও ইসলামে জায়েয নেই ।

  • হাদীস শরীফ: হযরত মুগীরা ইবনে শু'বা (রাযি.) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তৎকালীন আরবের অমুসলিমদের কিছু মাল প্রতারণা করে নিয়ে এসেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি মদীনাতে এসে ইসলাম গ্রহণ করলে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর ইসলাম কবুল করলেও সেই প্রতারণার মালের ব্যাপারে স্পষ্ট ফয়সালা দিয়ে বলেছিলেন:

    "أما الإسلام فقد قبلنا، وأما المال فإنه مال غدر لا حاجة لنا فيه." অর্থাৎ: "তোমার ইসলাম তো আমরা কবুল করলাম, কিন্তু এই মাল হলো প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতার মাল, এতে আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই।" (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৫৮৩)।


৩. অন্যের অন্যায়ের অজুহাতে নিজে অন্যায় করা যাবে না:

আপনাকে অন্যায়ভাবে আটকে রাখা হয়েছে বা আপনার থেকে অতিরিক্ত ১৫,০০০ ডলার নেওয়া হয়েছে—এই উসিলায় আপনি ব্যাংকের টাকা মেরে দিতে পারেন না। ১. প্রথমত, ক্রেডিট কার্ডের চুক্তিটি আপনি করেছেন একটি ব্যাংকের সাথে, মার্কিন সরকারের সাথে নয় । ২. দ্বিতীয়ত, ইসলামি শরী'আতের একটি প্রধান মূলনীতি হলো, কোনো ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের অন্যায়ের প্রতিশোধ অন্য কোনো নির্দোষ ব্যক্তি বা ব্যাংকের সাথে প্রতারণা করে নেওয়া যাবে না।

  • কাওয়াইদুল ফিক্বহ (হাশিয়া সহ): পৃষ্ঠা নং ৩৯৪ (قاعدة: ২৬৯):

    "لا يجوز لأحد أن يأخذ مال أحد بلاسبب شرعي" অর্থাৎ: "শরিয়তসম্মত সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া কারো সম্পদ গ্রহণ করা অন্য কারো জন্য জায়েয নয়।"


৪. ক্রয়কৃত পণ্যগুলোর শরয়ী হুকুম:

যদি আপনি এই নিয়তে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে ওই জিনিসগুলো কেনেন, তবে সেগুলো হারাম সম্পদ বা খবীস মাল (الملك الخبيث) হিসেবে গণ্য হবে। সেগুলো ব্যবহার করা, ভোগ করা বা বিক্রি করে ঋণের টাকা শোধ করাও আপনার জন্য হালাল হবে না।

আমাদের পরামর্শ:

ভাই, শয়তান মানুষের চরম বিপদের মুহূর্তেই সবচেয়ে বড় সুযোগটি নেয়। আপনার বর্তমান আর্থিক কষ্ট ও মানসিক চাপ অত্যন্ত গভীর। কিন্তু মনে রাখবেন, আল্লাহর দুনিয়া অনেক বড়। আজ যদি আপনি সততার ওপর অটল থেকে সামান্য কষ্ট সহ্য করেন, আল্লাহ তা'আলা আপনার জন্য এর চেয়ে উত্তম হালাল রিযিকের দুয়ার খুলে দেবেন। আমেরিকার ব্যাংকের লোনগুলো পরিশোধ করার চেষ্টা করুন এবং সৎ পথে থেকে এই কঠিন পরীক্ষাটি পার করার তওফিক প্রার্থনা করুন।

আল্লাহই সর্বজ্ঞ। আপনার জন্য সহজ করুন এবং সঠিক পথ দেখান।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.