সমিতির বন্টন ও লভ্যাংশ প্রদান বিষয়ে জরুরী
Business and Job · Hanafi
Question
প্রশ্নঃ
🔸 ৩৮ সদস্যের একটা সমিতি। সমিতির জমাকৃত টাকা বিনিয়োগের জন্য সমিতির সদস্য থেকেই ২/৩ জনের একটা প্রকল্প কমিটি করা হবে যারা সমিতির হয়েই চুক্তি ও বিনিয়োগের অন্যান্য বিষয়গুলো দেখাশুনা করবে।
যেসব সদস্য MDP-এর পক্ষে সময়, শ্রম ও দক্ষতা ব্যয় করে বিনিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করবেন, তাদেরকে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ থেকে অর্জিত লাভের ৫%–১০% পর্যন্ত প্রণোদনা (Profit Sharing) প্রদান করা হবে। লভ্যাংশের হার তাদের কাজের পরিমাণ ও অবদানের ভিত্তিতে Executive Committee নির্ধারণ করবে। আর লস হলে কিছুই পাবেনা। (এমনিতে সমিতির সদস্য হওয়ায় অন্যান্য সদস্যদের মতই তারা নিজেদের বিনিয়োগের লাভ/লসের অংশীদার হবেন, অতিরিক্ত যেটা নির্ধারণ করা হবে সেটা কেবল তাদের পরিশ্রম+সময় দেয়ার জন্য)
এখন জানার বিষয় হল, প্রকল্প কমিটির জন্য এভাবে % নির্দিষ্ট করে দেওয়া শরীয়ত সম্মত কিনা?
কিংবা বিনিয়োগ পরিচালনার জন্য একটা নির্দিষ্ট এমাউন্ট ফিক্সড করে দেওয়া হবে লাভ হোক বা লস হোক?
উপরের কোনোটিই বৈধ না হলে শরীয়ত সম্মত সুরতটা কি হওয়া উচিত এক্ষেত্রে?
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। আপনি যে বিনিয়োগ প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেছেন, তা ইসলামী শরীয়তের মুদারাবা নীতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। মুদারাবায় মূলধন (রাসুল মাল) থাকে এক পক্ষের কাছে (রাব্বুল মাল) এবং শ্রম ও ব্যবস্থাপনা থাকে অন্য পক্ষের (মুদারিব) কাছে। লাভ নির্দিষ্ট অনুপাতে (যেমন: ৫০:৫০, ৬০:৪০) ভাগ করা হয়, কিন্তু লোকসান সম্পূর্ণ মূলধনদাতাকে বহন করতে হয় এবং মুদারিব শুধু তার শ্রম হারায়।
আপনার প্রশ্নের আলোকে শরীয়তের দৃষ্টিতে বিস্তারিত বিশ্লেষণ নিম্নরূপ:
১. প্রকল্প কমিটিকে লাভের ৫%-১০% প্রণোদনা দেওয়া কি বৈধ?
উত্তর: হ্যাঁ, এটি বৈধ। তবে শর্ত হলো, এই প্রণোদনা লাভের একটি শতাংশ (Percentage) হিসেবে নির্ধারিত হতে হবে, যা মুদারাবা বা উজরাতের নিয়মে বৈধ। যেহেতু কমিটির সদস্যরা নিজেরাও সমিতির সদস্য, তাই তারা মূল বিনিয়োগে অংশীদার। এর অতিরিক্ত যে ৫%-১০% দেওয়া হবে, তা তাদের পরিশ্রম ও ব্যবস্থাপনার বিনিময় (উজরাত/মুদারিবের অংশ) হিসেবে গণ্য হবে। এটি শরীয়তসম্মত।
কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত: এই শতাংশ (৫%-১০%) নির্ধারণ করতে হবে লাভের উপর। লোকসান হলে তারা কিছুই পাবেন না—এই শর্তটি সম্পূর্ণ বৈধ এবং মুদারাবার মূলনীতি অনুযায়ী সঠিক। কারণ মুদারিব (পরিচালক) লোকসানে শুধু তার শ্রম হারায়, মূলধন হারায় না।
২. লাভ হোক বা লস হোক, একটি নির্দিষ্ট এমাউন্ট (ফিক্সড ফি) দেওয়া কি বৈধ?
উত্তর: না, এটি বৈধ নয়। যদি আপনি বিনিয়োগ পরিচালনার জন্য একটি নির্দিষ্ট অর্থ (Fixed Amount) নির্ধারণ করেন যা লাভ-লোকসান নির্বিশেষে দিতে হবে, তাহলে তা সুদ (Riba) এর পর্যায়ে চলে যাবে। কারণ এটি একটি ঋণের উপর সুদ হিসেবে গণ্য হবে। শরীয়তে কোনো বিনিয়োগে মূলধনের উপর নির্দিষ্ট হারে (শতাংশ বা নির্দিষ্ট টাকায়) অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম।
৩. শরীয়তসম্মত সুরত কী হওয়া উচিত?
যদি উপরোক্ত দুটি পদ্ধতিই গ্রহণযোগ্য না হয় (যদিও প্রথমটি গ্রহণযোগ্য), তবে শরীয়তসম্মত সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো:
১. মুদারাবা চুক্তি: প্রকল্প কমিটিকে মুদারিব হিসেবে নিয়োগ করা। তাদের পারিশ্রমিক হবে লাভের একটি নির্দিষ্ট শতাংশ (যেমন: ২০% বা ৩০%)। এই শতাংশ চুক্তির সময় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। লোকসান হলে তারা কিছুই পাবে না, শুধু তাদের শ্রম নষ্ট হবে।
২. উজরাত (পারিশ্রমিক) + মুদারাবা: কমিটির সদস্যদের কাজের জন্য একটি নির্দিষ্ট মাসিক বেতন (Fixed Salary) নির্ধারণ করা যেতে পারে, যা সমিতির তহবিল থেকে দেওয়া হবে। এটি তাদের কাজের বিনিময় (উজরাত) হিসেবে বৈধ। এরপর বিনিয়োগের লাভ-লোকসান সম্পূর্ণ সমিতির সদস্যদের মধ্যে মূলধনের অনুপাতে ভাগ হবে। কমিটির সদস্যরা যদি নিজেদের মূলধনও বিনিয়োগ করে থাকেন, তাহলে তারা সেই অংশের লাভ-লোকসানের অংশীদার হবেন।
সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি: আপনি প্রথম পদ্ধতিটি (লাভের ৫%-১০% প্রণোদনা) গ্রহণ করতে পারেন, কারণ এটি শরীয়তসম্মত। তবে মনে রাখবেন, এই প্রণোদনা লাভের শতাংশ হিসেবে হতে হবে, কোনো অবস্থাতেই নির্দিষ্ট টাকার অঙ্ক হিসেবে নয়।
দলিল ও উৎস:
- কুরআন: "আল্লাহ তা'আলা ব্যবসাকে হালাল এবং সুদকে হারাম করেছেন।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)
- হাদীস: "মুসলিমরা তাদের শর্তসমূহের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে, তবে সেই শর্ত ব্যতীত যা হারামকে হালাল বা হালালকে হারাম করে।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ৩৫৯৪)
- ফতোয়ায়ে উসমানী: মুদারাবায় লাভের শতাংশ নির্ধারণ করা বৈধ, তবে লোকসান মূলধনদাতাকে বহন করতে হয়।
- রদ্দুল মুহতার: মুদারিবের পারিশ্রমিক লাভের শতাংশ হিসেবে নির্ধারিত হবে, নির্দিষ্ট অর্থ হিসেবে নয়।
উপসংহার: আপনার প্রথম প্রস্তাব (লাভের ৫%-১০% প্রণোদনা) শরীয়তসম্মত এবং বৈধ। দ্বিতীয় প্রস্তাব (লাভ-লস নির্বিশেষে নির্দিষ্ট এমাউন্ট) সম্পূর্ণ হারাম। তাই আপনি প্রথম পদ্ধতিটি গ্রহণ করুন এবং চুক্তিপত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন যে, এই শতাংশ শুধুমাত্র লাভের উপর প্রযোজ্য হবে, লোকসানে কোনো অর্থ প্রদান করা হবে না।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।