মাথা ব্যাথার দরুণ নার্সিং স্টুডেন্ট কি মুখ খুলা রাখতে পারবে?
Halal and Haram · Hanafi
Question No:
4814
Questioner:
sumaiya Jahan
Question Asked:
02 Sep 2026, 01:06 PM
Reviewed & Published:
02 Sep 2026, 02:16 PM
Views:
121
Tokens:
5,521
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by
.
Question
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।আমি একজন নার্সিং স্টুডেন্ট। কিন্তু আমার হিজাব পড়লে বেশিরভাগ সময় মাথা ব্যাথা করে মাথার স্কাল্পে অনেক সমস্যা হয় মানে এর জন্য আমাকে অনেক ভুগতে হয়।ডাক্তারদের যদি বলি এর জন্য বেড রেস্ট দিতে যাতে সেই প্রেসক্রিপশন দেখিয়ে ডিউটিতে না যাওয়া লাগে তারা দেয় না বলে এই রোগের জন্য বেড রেস্ট হয় না তারা বলে মাথা খোলা রাখতে কিন্তু সেটা তো আমার পক্ষে সম্ভব না।আবার দেখা যায় ডিউটিতে গেলে অনেক নন মাহরামকে সেবা দিতে হয়। তাই আমি যেতে চাইনা।এখান থেকে এখন চলেও যেতে পারছি না কারন course প্রায় শেষের দিকে। এখানে অনেক স্টুডেন্টরাই শুধু ডিউটির প্রেজেন্ট দিয়ে চলে আসে ডিউটি করে না।কিন্তু এটা আমার কাছে ঠিক মনে হয়নি তাই এতোদিন কষ্ট হলেও প্রেজেন্ট দিলে ডিউটি করে এসেছি কিন্তু এখন আমার জন্য ডিউটি করা কষ্টকর। এক্ষেত্রে আমি কি প্রেজেন্ট দিয়ে চলে আসতে পারবো নিজের শারিরীক অসুস্থতার কথা চিন্তা করে?
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন:
১. হিজাব ও মাথা ব্যথার সমস্যা:
- শরীয়তের দৃষ্টিতে প্রাপ্তবয়স্কা নারীর জন্য চেহারা ও হাতের তালু ছাড়া সমগ্র শরীর ঢেকে রাখা ফরজ। হিজাব পরা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং এটি আল্লাহর আদেশ।
- মাথা ব্যথা বা স্কাল্পের সমস্যার কারণে হিজাব পরা ছেড়ে দেওয়া জায়েয নয়। তবে যদি কোনো গুরুতর শারীরিক অসুস্থতা থাকে যেখানে চিকিৎসকের মতে হিজাব পরা ক্ষতির কারণ হয়, তাহলে সেই অবস্থায় অস্থায়ীভাবে শিথিলতার অবকাশ থাকতে পারে, তবে সেটিও অমুসলিম বা নন-মাহরামের সামনে নয়, বরং নিজ ঘরে বা মাহরামদের মাঝে।
- হিজাবের বিকল্প সমাধান: হিজাবের নিচে যদি মাথায় চাপ কম লাগে এমন নরম কাপড়ের টুপি (বনি/আন্ডারস্কার্ফ) ব্যবহার করেন, অথবা ঢিলেঢালা ও হালকা কাপড়ের হিজাব ব্যবহার করেন, তাহলে অনেক সময় মাথা ব্যথা কম হয়। এছাড়া চুল শক্ত করে বাঁধা থেকে বিরত থাকুন। যদি সমস্যা গুরুতর হয়, তাহলে একজন ভালো চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে পারেন, তবে হিজাব পরা অবস্থায়ই তার সমাধান খুঁজতে হবে।
২. ডিউটিতে নন-মাহরামকে সেবা দেওয়া:
- শরীয়তে নারীর জন্য নন-মাহরাম পুরুষকে সেবা দেওয়া বা স্পর্শ করা জায়েয নয়। তবে জীবন-মৃত্যুর মতো জরুরি অবস্থায় (যেমন: দুর্ঘটনায় আহত পুরুষকে বাঁচানো) সীমিত পরিসরে সেবা দেওয়ার অনুমতি আছে, যদি অন্য কোনো নারী বা পুরুষ ডাক্তার উপলব্ধ না থাকে।
- নার্সিং পেশায় নন-মাহরাম রোগীদের সেবা দেওয়া একটি বড় শরয়ী সমস্যা। আপনার জন্য উত্তম হবে, যদি সম্ভব হয়, নারী ওয়ার্ডে বা নারী রোগীদের সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করা। যদি প্রতিষ্ঠানে নারী ওয়ার্ডে ডিউটি করার সুযোগ থাকে, তাহলে সেটা করুন।
৩. প্রেজেন্ট দিয়ে ডিউটি না করার বিধান:
- প্রেজেন্ট দিয়ে ডিউটি না করা সম্পূর্ণ প্রতারণা ও জালিয়াতি। এটি ইসলামী দৃষ্টিতে হারাম এবং গুনাহের কাজ। আপনি নিজেই লিখেছেন, "এটা আমার কাছে ঠিক মনে হয়নি" - আপনার এই অনুভূতিটাই সঠিক।
- প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী ডিউটি করা আপনার আমানত বা দায়িত্ব। ডিউটি না করে প্রেজেন্ট দেওয়া মানে প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রতারণা করা, যা হারাম উপার্জনের অন্তর্ভুক্ত।
- শারীরিক অসুস্থতার কারণে ডিউটি থেকে বিরত থাকার বৈধ উপায়: আপনি যদি সত্যিই শারীরিকভাবে অসুস্থ হন (যেমন: মাথা ব্যথা, মাইগ্রেন ইত্যাদি), তাহলে আপনাকে ডাক্তারের কাছ থেকে মেডিকেল সার্টিফিকেট (Medical Certificate) নিতে হবে। যদি ডাক্তার বেড রেস্ট না দেন, তাহলে বুঝতে হবে আপনার অসুস্থতা এতটা গুরুতর নয় যে ডিউটি করা যাবে না।
- মনে রাখবেন: "মাথা খোলা রাখতে" ডাক্তারের এই পরামর্শ মানে এই নয় যে আপনি হিজাব ছেড়ে দিন। ডাক্তার শারীরিক চিকিৎসার দৃষ্টিকোণ থেকে বলেছেন। আপনি হিজাবের বিকল্প পদ্ধতি (ঢিলেঢালা হিজাব, নরম কাপড়) ব্যবহার করে সেই পরামর্শের আংশিক প্রয়োগ করতে পারেন (যেমন: মাথায় চাপ কম এমনভাবে হিজাব পরা)।
৪. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও ফতোয়া:
- প্রেজেন্ট দিয়ে ডিউটি না করা জায়েয নয়। এটি প্রতারণা ও খিয়ানত (আমানতের খিয়ানত) হবে।
- আপনার করণীয়: ১. প্রতিষ্ঠানের মহিলা সুপারভাইজার বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে নারী ওয়ার্ডে ডিউটি করার অনুরোধ করুন। ২. যদি নারী ওয়ার্ড সম্ভব না হয়, তাহলে নন-মাহরাম রোগীদের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে যতটুকু সম্ভব পর্দা রক্ষা করে (যেমন: গ্লাভস ব্যবহার, প্রয়োজন ছাড়া স্পর্শ না করা, কথা বলার সময় শালীনতা বজায় রাখা) সেবা দেওয়ার চেষ্টা করুন। ৩. যদি সত্যিই শারীরিক অসুস্থতা গুরুতর হয়, তাহলে ডাক্তারের কাছ থেকে মেডিকেল সার্টিফিকেট নিয়ে প্রতিষ্ঠানকে জানান। সার্টিফিকেট ছাড়া ডিউটি থেকে বিরত থাকা এবং প্রেজেন্ট দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম ও গুনাহের কাজ। ৪. কোর্স প্রায় শেষের দিকে, তাই ধৈর্য ধরে বাকি সময়টুকু বৈধ উপায়ে সম্পন্ন করুন। অসুস্থতার কারণে যদি ডিউটি করা একান্তই কষ্টকর হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী ছুটি (Leave) নেওয়ার চেষ্টা করুন, তবে প্রেজেন্ট দিয়ে ডিউটি না করা যাবে না।
রেফারেন্স:
- সূরা আন-নূর, আয়াত ৩১: "আর মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে। আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তবে যা সাধারণত প্রকাশ হয়ে পড়ে তা ছাড়া। আর তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে..." (এটি হিজাব ফরজ হওয়ার প্রমাণ)
- সূরা আল-আহযাব, আয়াত ৫৯: "হে নবী! আপনার স্ত্রীগণ, কন্যাগণ ও মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের অংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজ হবে, ফলে তাদেরকে উত্ত্যক্ত করা হবে না।"
- ফতোয়া-ই-উসমানি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪২০: নন-মাহরামের সেবা করা এবং স্পর্শ করা জায়েয নয়, তবে জরুরি অবস্থায় সীমিত পরিসরে অনুমতি আছে।
- রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩৭০: "নারীদের জন্য পুরুষ রোগীকে সেবা দেওয়া জায়েয নয়, তবে যদি জীবন রক্ষার মতো জরুরি অবস্থা হয় এবং অন্য কোনো উপায় না থাকে, তাহলে সীমিত পরিসরে অনুমতি আছে।"
- বেহেশতী জেওর, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৮: প্রতারণা ও মিথ্যা বলা হারাম এবং এর মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ হারাম।
আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর: না, শারীরিক অসুস্থতার কথা চিন্তা করে প্রেজেন্ট দিয়ে ডিউটি না করা জায়েয হবে না। এটি প্রতারণা হবে। অসুস্থ হলে ডাক্তারের সার্টিফিকেট নিয়ে বৈধ উপায়ে ছুটি নিন, অথবা নারী ওয়ার্ডে ডিউটি করার ব্যবস্থা করুন। আল্লাহ তায়ালা আপনার ধৈর্যের প্রতিদান দেবেন।