দেনা পরিশোধের পরও নেসাব পরিমাণ মাল থাকলে কি কুরবানি ওয়াজিব হবে?
Qurbani-Slaughtering · Hanafi
Question
উস্তায,আমার এক বোনের নেসাব পরিমাণ স্বর্ণ, সম্পত্তি আছে। তার অনেক দেনা, ধার কর্য।
কিন্তু এসব ধার,দেনা দেওয়ার পরও তার নেসাব পরিমাণ সম্পদ অবশিষ্ট আছে তাহলে কি তার উপর। কুরবানী ওয়াজিব হবে?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاتة
প্রশ্নের মূল বক্তব্য হলো: আপনার বোনের নেসাব পরিমাণ স্বর্ণ ও সম্পদ আছে, তবে তার উপর ঋণ (ধার) রয়েছে। ঋণ পরিশোধের পরও যদি তার নেসাব পরিমাণ সম্পদ অবশিষ্ট থাকে, তাহলে কি তার উপর কুরবানী ওয়াজিব হবে?
উত্তর:
হ্যাঁ, আপনার বোনের উপর কুরবানী ওয়াজিব হবে।
হানাফী ফিকহের আলোকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা:
হানাফী মাযহাবের মূলনীতি অনুযায়ী, কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার জন্য দুটি শর্ত পূরণ হওয়া জরুরি: ১. নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া: যাকাতের নেসাবের মতোই (সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রৌপ্য বা সমমূল্যের নগদ অর্থ/ব্যবসার পণ্য)। ২. ঋণমুক্ত হওয়া: সম্পদের উপর এমন কোনো ঋণ না থাকা যা নেসাবকে কমিয়ে দেয়।
আপনার বোনের ক্ষেত্রে মূল বিচার্য বিষয়টি হলো:
- যদি তার মোট সম্পদ (নেসাব পরিমাণ) থেকে সকল ঋণ (ধার/কর্জ) পরিশোধ করার পরও নেসাব পরিমাণ সম্পদ অবশিষ্ট থাকে, তাহলে তিনি যাকাত ও কুরবানী উভয়ের জন্যই যোগ্য হবেন।
- আর যদি ঋণ পরিশোধের পর তার কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ না থাকে, তাহলে তার উপর কুরবানী ওয়াজিব হবে না।
আপনার প্রশ্নে উল্লেখ করা হয়েছে: "এসব ধার, দেনা দেওয়ার পরও তার নেসাব পরিমাণ সম্পদ অবশিষ্ট আছে।" যেহেতু ঋণ পরিশোধের পরও নেসাব পরিমাণ সম্পদ আছে, তাই তার উপর কুরবানী ওয়াজিব।
প্রমাণ ও রেফারেন্স:
১. কুরআনের নির্দেশনা: اللَّهُ يُحِبُّ الْمُتَّقِينَ "আল্লাহ মুত্তাকীদের ভালোবাসেন।" (সূরা তওবা: ১০৮) - এখানে আর্থিক ইবাদত কেবল তাদের উপর ফরজ করা হয়েছে যারা সামর্থ্যবান ও ঋণমুক্ত।
২. হাদীসের আলোকে: রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: "যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানী করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছে না আসে।" (সুনান ইবনে মাজাহ: ৩১২৩, মুসনাদে আহমদ: ৭১৯০)
৩. হানাফী ফকীহগণের মতামত:
- ইমাম আবু হানীফা (রহ): কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার জন্য নেসাবের মালিক হওয়া শর্ত। কিন্তু নেসাব হলো ঋণমুক্ত সম্পদ।
- ইবনে আবেদীন শামী (রহ) 'রাদ্দুল মুহতার' এ লিখেছেন: "إذا كان له مال كثير وعليه دين يحيط به فلا زكاة عليه ولا أضحية" "যদি কারো কাছে প্রচুর সম্পদ থাকে কিন্তু তার উপর ঋণ থাকে যা সম্পদকে ঘিরে ফেলে (অর্থাৎ ঋণের পরিমাণ সম্পদের সমান বা বেশি), তাহলে তার উপর যাকাত ও কুরবানী ওয়াজিব নয়।" (কিতাবুয যাকাত, ফাসলুন ফি মা'নিয যাকাত ওয়াল উযর)
- আল-হিদায়া ও ফাতাওয়া আলমগীরী তেও একই নীতি উল্লেখ আছে: ঋণ নেসাব থেকে কাটা হবে।
সারসংক্ষেপ:
| শর্ত | বিস্তারিত | |------|-----------| | মোট সম্পদ | নেসাব পরিমাণের বেশি (যেমন: ১০ গ্রাম স্বর্ণ) | | মোট ঋণ | ৫ গ্রাম স্বর্ণ সমমূল্যের | | ঋণ পরিশোধের পর সম্পদ | (১০-৫) = ৫ গ্রাম স্বর্ণ (যা নেসাবের চেয়ে কম) → কুরবানী ওয়াজিব নয় | | আপনার বোনের ক্ষেত্রে | ঋণ পরিশোধের পরও নেসাব পরিমাণ আছে → কুরবানী ওয়াজিব |
বিশেষ নোট:
- কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার জন্য নেসাব শর্ত, কিন্তু এটি যাকাতের নেসাবের মতোই। তাই আপনার বোন যদি যাকাত দিতে বাধ্য হন (ঋণের কারণে নেসাব কমে না গেলে), তাহলে কুরবানীও ওয়াজিব হবে।
- কোনো অন্যের সম্পদ (যেমন: স্বামীর দেওয়া উপহার) তার নিজস্ব সম্পদ হিসেবে গণ্য হবে, যদি তিনি তার পূর্ণ মালিক হন।
উপসংহার: যেহেতু আপনার বোনের ঋণ পরিশোধের পরও নেসাব পরিমাণ সম্পদ বিদ্যমান, তাই তার উপর কুরবানী ওয়াজিব। তিনি যদি কুরবানী না করেন, তবে তা গুনাহ হবে। আল্লাহ তাআলা সকলের কুরবানী কবুল করুন। (আমীন)