ইয়া নুরু পড়ে চোখে এগারো বার ফু দেওয়া
Sunnah and Bid'ah · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
ইয়া নুরু চোখে ১১ বার ফু দেওয়া: জায়েজ নাকি বিদ'আত?
আহলে হাদীস মতানুসারে জবাবঃ-
ইয়া নুরু পড়ে চোখে ১১ বার ফুঁ দেওয়ার কোনো ভিত্তি কুরআন বা সহীহ হাদীসে নেই। এটি একটি বিদ'আত (নব-প্রবর্তিত উদ্ভাবন) এবং তা জায়েজ নয়।
দলিল ও ব্যাখ্যা
১. ইবাদতের মূলনীতি
ইসলামের মূলনীতি হলো—ইবাদত তাওকীফী (নির্দিষ্ট দলিল-ভিত্তিক)। অর্থাৎ, কোনো আমলকে ইবাদত বা উপকারী কাজ হিসেবে গ্রহণ করতে হলে তার জন্য কুরআন বা সহীহ হাদীস থেকে দলিল প্রয়োজন। আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেন:
مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ "যে ব্যক্তি এমন আমল করল যা আমাদের (শরীয়তের) নির্দেশ অনুযায়ী নয়, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।" (সহীহ মুসলিম: ১৭১৮)
২. "ইয়া নূরু" শব্দটি কী?
"ইয়া নূরু" অর্থ "হে আলো"। এটি আল্লাহর গুণবাচক নামসমূহের একটি—"আন-নূর" (الْنُّورُ) —যা কুরআনে উল্লেখ রয়েছে:
اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ "আল্লাহ আসমানসমূহ ও পৃথিবীর আলো।" (সূরা আন-নূর: ৩৫)
তবে, এই নামে ডেকে নির্দিষ্ট সংখ্যায় (১১ বার) ফুঁ দেওয়ার কোনো দলিল নেই।
৩. শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যার বক্তব্য
শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"যে ব্যক্তি নির্দিষ্ট সংখ্যা, নির্দিষ্ট সময় বা নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে কোনো যিকর বা দু'আকে আবশ্যক করে নেয়—যা শরীয়তে প্রমাণিত নয়—তা বিদ'আত। কারণ, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে সাহাবায়ে কিরাম যে আমল করতেন না, তা পরে আমল করা বিদ'আত।" (মাজমু' ফাতাওয়া: ২২/৫০৭)
৪. শায়খ ইবনে উসাইমীনের বক্তব্য
শায়খ মুহাম্মদ ইবনে সালিহ আল-উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"যিকর ও দু'আ দুটি বিষয়ের উপর নির্ভরশীল: (১) সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হওয়া এবং (২) নির্দিষ্ট সংখ্যা, সময় ও পদ্ধতি শরীয়তসম্মত হওয়া। যদি কোনো আমল সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত না হয়, তবে তা পরিত্যাগ করা ওয়াজিব।" (শারহুল আরবাঈন আন-নববিয়্যাহ: ২৩৪)
৫. শায়খ আল-আলবানীর বক্তব্য
শায়খ নাসিরুদ্দিন আল-আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) বিদ'আত প্রসঙ্গে বলেন:
"প্রত্যেক বিদ'আতই পথভ্রষ্টতা, যদিও মানুষ তা ভালো মনে করে। কারণ, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: 'তোমরা নব-প্রবর্তিত বিষয়সমূহ থেকে বেঁচে থাকো। কারণ, প্রতিটি নব-প্রবর্তিত বিষয় বিদ'আত এবং প্রতিটি বিদ'আত পথভ্রষ্টতা।'" (সুনানে আবু দাউদ: ৪৬০৭, তিরমিযী: ২৬৭৬—সহীহ)
চোখের ব্যথা বা রোগে কী করণীয়?
ইসলামে রোগ নিরাময়ের জন্য দুটি পদ্ধতি রয়েছে:
১. বৈধ রুকইয়াহ (দু'আ ও কুরআন দ্বারা ঝাড়-ফুঁক)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বিভিন্ন রোগে দু'আ ও কুরআনের আয়াত দ্বারা ঝাড়-ফুঁক করতেন এবং সাহাবাদেরও তা শিখিয়েছেন। যেমন:
عَنْ عُثْمَانَ بْنِ أَبِي الْعَاصِ أَنَّهُ شَكَا إِلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ وَجَعًا يَجِدُهُ فِي جَسَدِهِ مُنْذُ أَسْلَمَ فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: ضَعْ يَدَكَ عَلَى الَّذِي تَأَلَّمَ مِنْ جَسَدِكَ وَقُلْ: بِسْمِ اللَّهِ ثَلَاثًا وَقُلْ سَبْعَ مَرَّاتٍ: أَعُوذُ بِاللَّهِ وَقُدْرَتِهِ مِنْ شَرِّ مَا أَجِدُ وَأُحَاذِرُ উসমান ইবনে আবিল আস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে তার শরীরের ব্যথার অভিযোগ করলে তিনি বললেন: "তোমার শরীরের যে স্থানে ব্যথা অনুভব কর, সেখানে হাত রাখো এবং তিনবার 'বিসমিল্লাহ' বলো, তারপর সাতবার বলো: 'আউযু বিল্লাহি ওয়া কুদরাতিহি মিন শাররি মা আজিদু ওয়া উহাযিরু' (আমি আল্লাহ ও তাঁর ক্ষমতার মাধ্যমে যা অনুভব করছি এবং যা আশঙ্কা করছি তার অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই)।" (সহীহ মুসলিম: ২২০২)
২. চিকিৎসা গ্রহণ
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
يَا عِبَادَ اللَّهِ تَدَاوَوْا فَإِنَّ اللَّهَ لَمْ يَضَعْ دَاءً إِلَّا وَضَعَ لَهُ شِفَاءً "হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো। কারণ, আল্লাহ এমন কোনো রোগ দেননি যার নিরাময় দেননি।" (সুনানে আবু দাউদ: ৩৮৫৫, তিরমিযী: ২০৩৮—সহীহ)
বিদ'আতের পরিণাম
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ وَكُلَّ ضَلَالَةٍ فِي النَّارِ "নিশ্চয়ই প্রতিটি নব-প্রবর্তিত বিষয় বিদ'আত, প্রতিটি বিদ'আত পথভ্রষ্টতা এবং প্রতিটি পথভ্রষ্টতা জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।" (সুনানে নাসাঈ: ১৫৭৮, সহীহ)
সংক্ষিপ্ত উপসংহার
| বিষয় | বিধান | |-------|--------| | "ইয়া নূরু" বলে আল্লাহকে ডাকা | জায়েজ (যদিও নির্দিষ্ট কোনো দলিল ছাড়া) | | ১১ বার পড়ে চোখে ফুঁ দেওয়া | বিদ'আত—অগ্রহণযোগ্য | | চোখের রোগে বৈধ রুকইয়াহ করা | জায়েজ (সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত) | | চিকিৎসা গ্রহণ | জায়েজ ও উৎসাহিত |
সুতরাং, "ইয়া নূরু" পড়ে চোখে ১১ বার ফুঁ দেওয়ার কোনো ভিত্তি নেই। এটি একটি বিদ'আত। মুসলিমের উচিত বিদ'আত পরিত্যাগ করে সহীহ সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করা এবং রোগের জন্য বৈধ রুকইয়াহ ও চিকিৎসা গ্রহণ করা।
وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।