ঘুমানোর আগে কি করে ঘুমালে অধিক কার্যকর হবে? নবিজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি কি করতেন?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
ঘুমানোর আগে নবীজী ﷺ-এর আমলসমূহ
ভূমিকা
আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুমানোর পূর্বে বেশ কিছু আমল করতেন যা আমাদের জন্য অত্যন্ত শিক্ষণীয়। এই আমলগুলো পালনের মাধ্যমে আমরা যেমন সুন্নতের অনুসরণ করতে পারব, তেমনি ঘুম হবে আরামদায়ক ও কার্যকর।
ঘুমানোর পূর্বে নবীজী ﷺ-এর আমলসমূহ
১. অযু করা
নবীজী ﷺ ঘুমানোর পূর্বে অযু করতেন। হযরত বারা ইবনে আযিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যখন তুমি তোমার বিছানায় যেতে চাও, তখন নামাজের অযুর মতো অযু করো।" (সহীহ বুখারী: ২৪৭, সহীহ মুসলিম: ২৭১০)
২. বিছানা ঝেড়ে নেওয়া
ঘুমানোর পূর্বে বিছানা ঝেড়ে নেওয়া সুন্নত। নবীজী ﷺ বলেছেন:
"তোমাদের কেউ যখন তার বিছানায় শোয়ার ইচ্ছা করে, তখন সে যেন তার লুঙ্গির (কাপড়ের) আঁচল দিয়ে বিছানা ঝেড়ে নেয়, কারণ সে জানে না তার পরে বিছানায় কী আছে।" (সহীহ বুখারী: ৬৩২০)
৩. ডান কাতে শোয়া
নবীজী ﷺ সর্বদা ডান কাতে শুয়ে ঘুমাতেন। হযরত বারা ইবনে আযিব (রাঃ) বলেন:
"রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন ঘুমাতে যেতেন, তখন ডান কাতে শুয়ে পড়তেন।" (সহীহ বুখারী: ৬৩১৮)
৪. ঘুমানোর পূর্বে দোয়া ও যিকির
ক. আয়াতুল কুরসি পাঠ: নবীজী ﷺ বলেছেন:
"যে ব্যক্তি রাতে ঘুমানোর সময় আয়াতুল কুরসি পাঠ করবে, তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রক্ষক নিয়োজিত থাকবে এবং সকাল পর্যন্ত শয়তান তার কাছে আসতে পারবে না।" (সহীহ বুখারী: ২৩১১)
খ. সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পাঠ: হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন:
"নবীজী ﷺ প্রত্যেক রাতে ঘুমানোর সময় সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক এবং সূরা নাস পাঠ করে নিজের উভয় হাতে ফুঁক দিয়ে সমস্ত শরীরে মাসেহ করতেন, মাথা ও মুখমণ্ডল থেকে শুরু করে।" (সহীহ বুখারী: ৫০১৭)
গ. ঘুমানোর দোয়া: নবীজী ﷺ ঘুমানোর সময় এই দোয়া পড়তেন:
"بِاسْمِكَ اللَّهُمَّ أَمُوتُ وَأَحْيَا" (উচ্চারণ: বিসমিকা আল্লাহুম্মা আমূতু ওয়া আহইয়া) অর্থ: "হে আল্লাহ! আপনার নামেই আমি মৃত্যুবরণ করি এবং জীবিত হই।" (সহীহ বুখারী: ৬৩২৪)
ঘ. অন্যান্য দোয়া: হযরত বারা ইবনে আযিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবীজী ﷺ ঘুমানোর সময় বলতেন:
"اللَّهُمَّ بِاسْمِكَ وَضَعْتُ جَنْبِي وَبِاسْمِكَ أَرْفَعُهُ، فَإِنْ أَمْسَكْتَ نَفْسِي فَارْحَمْهَا، وَإِنْ أَرْسَلْتَهَا فَاحْفَظْهَا بِمَا تَحْفَظُ بِهِ عِبَادَكَ الصَّالِحِينَ" (উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা বিসমিকা ওয়াদা'তু জামবী ওয়া বিসমিকা আরফাউহু, ফা-ইন আমসাকতা নাফসী ফারহামহা, ওয়া ইন আরসালতাহা ফাহফাজহা বিমা তাহফাজু বিহি ইবাদাকাস সালিহীন) অর্থ: "হে আল্লাহ! আপনার নামেই আমি আমার পার্শ্ব রেখেছি এবং আপনার নামেই তা উঠাব। যদি আপনি আমার প্রাণ ধারণ করেন, তবে তার প্রতি দয়া করুন; আর যদি ছেড়ে দেন, তবে তা রক্ষা করুন, যেমনভাবে আপনি আপনার নেক বান্দাদের রক্ষা করে থাকেন।" (সহীহ বুখারী: ৬৩২০)
৫. তওবা ও ইস্তিগফার করা
ঘুমানোর পূর্বে গুনাহ থেকে তওবা করা এবং ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত। কেননা ঘুমকে ছোট মৃত্যু বলা হয়েছে। হাদিসে আছে, ঘুমানোর সময় রূহ আল্লাহর কাছে উঠে যায়।
৬. দিনের হিসাব নেওয়া
ঘুমানোর পূর্বে দিনের কাজের হিসাব নেওয়া এবং আগামী দিনের পরিকল্পনা করা উচিত। হযরত উমর (রাঃ) বলেছেন:
"তোমরা তোমাদের কাজের হিসাব নেওয়ার আগে নিজেদের হিসাব নাও।"
ঘুমানোর আদবসমূহ
১. ঘুমানোর পূর্বে কুলুখ (মিসওয়াক) করা ২. ঘুমানোর পূর্বে বাড়ির দরজা বন্ধ করা এবং আল্লাহর নাম নেওয়া ৩. বাতি নিভিয়ে দেওয়া ৪. ঘরের খাবার-দাবার ঢেকে রাখা ৫. অযথা কথা না বলা ৬. বেশি রাত জাগরণ না করা (তাহাজ্জুদ ও ইবাদতের উদ্দেশ্যে ছাড়া)
ঘুম থেকে ওঠার দোয়া
ঘুম থেকে উঠে নবীজী ﷺ এই দোয়া পড়তেন:
"الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَحْيَانَا بَعْدَ مَا أَمَاتَنَا وَإِلَيْهِ النُّشُورُ" (উচ্চারণ: আলহামদু লিল্লাহিল্লাযী আহইয়ানা বা'দা মা আমাতানা ওয়া ইলাইহিন নুশূর) অর্থ: "সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাদের মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত করেছেন এবং তাঁর কাছেই পুনরুত্থান।" (সহীহ বুখারী: ৬৩১২)
উপসংহার
ঘুমানোর পূর্বে উপরোক্ত আমলগুলো পালন করলে ঘুম হবে আরামদায়ক, শান্তিপূর্ণ এবং বরকতময়। এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সুন্নতের অনুসরণের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের একটি উত্তম মাধ্যম। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে নবীজী ﷺ-এর সুন্নত অনুযায়ী জীবনযাপন করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
দ্রষ্টব্য: ঘুমানোর পূর্বে আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পাঠ করা এবং ডান কাতে শোয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। এছাড়া ঘুমানোর পূর্বে অযু করা এবং বিছানা ঝেড়ে নেওয়াও সুন্নত।