সুন্নাহ অনুযায়ী ঘুমানোর সঠিক সময় রাত এর কখন, এবং কতক্ষণ?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
সুন্নাহ অনুযায়ী ঘুমানোর সঠিক সময় রাত এর কখন, এবং কতক্ষণ?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের উত্তরে প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার। সুন্নাহ হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পদ্ধতি ও আদর্শ। ঘুমের ক্ষেত্রে সুন্নাহ হলো কখন ঘুমাতে হবে এবং কীভাবে ঘুমাতে হবে তার নির্দেশনা, তবে কতক্ষণ ঘুমাতে হবে তার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা সুন্নাহতে বাঁধা দেওয়া হয়নি। ঘুমের পরিমাণ ব্যক্তির শারীরিক প্রয়োজন, বয়স, কর্মক্ষেত্র এবং দায়িত্বের ওপর নির্ভর করে।
তবে হ্যাঁ, সুন্নাহ অনুযায়ী ঘুমের সময় সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা রয়েছে, যা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
১. রাতের প্রথমাংশে ঘুমানো (ইশার পরপরই ঘুমানো)
সুন্নাহ হলো এশার নামাজের পর দুনিয়ার অনর্থক কথাবার্তা ও কাজে লিপ্ত না হয়ে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়া। রাসূলুল্লাহ ﷺ এশার পর ঘুমানোর আগে কথা বলতে অপছন্দ করতেন।
- হাদিস: হযরত আবু বারযা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ এশার নামাজের পূর্বে ঘুমানো এবং এশার নামাজের পর (অনর্থক) কথাবার্তা বলা অপছন্দ করতেন। (সহীহ বুখারী: ৫৬৮)
- হানাফি ফিকহের নির্দেশনা: ফাতাওয়া হিন্দিয়ায় (১/৫৩) উল্লেখ আছে, এশার পর ঘুমানো মাকরূহ নয়, বরং তা সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত। তবে এশার আগে ঘুমানো মাকরূহ (অপছন্দনীয়), কারণ এতে এশার নামাজ জামাতের সাথে ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
২. রাতের শেষভাগে (তাহাজ্জুদের সময়) জাগ্রত থাকা
সুন্নাহ হলো রাতের শেষ তৃতীয়াংশে (তাহাজ্জুদের সময়) জাগ্রত থেকে ইবাদত করা। রাসূলুল্লাহ ﷺ রাতের প্রথমাংশে ঘুমাতেন এবং শেষাংশে উঠে তাহাজ্জুদ পড়তেন।
- হাদিস: হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, “রাসূলুল্লাহ ﷺ এশার পর ঘুমাতেন এবং রাতের শেষভাগে উঠে তাহাজ্জুদ পড়তেন।” (সহীহ বুখারী: ১১৪৬)
৩. দিনের বেলা কাইলুলা (দুপুরের ঘুম)
সুন্নাহ হলো দুপুরের কিছুক্ষণ ঘুমানো, যাকে আরবিতে ‘কাইলুলা’ বলা হয়। এটি রোজাদারের জন্য বিশেষ সুন্নত, তবে সাধারণ দিনেও এটি সুন্নত।
- হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “তোমরা সাহরী খাও, কেননা সাহরীতে বরকত আছে। আর কাইলুলা (দুপুরের ঘুম) করো, কেননা শয়তান কাইলুলা করে না।” (সহীহ ইবনে হিব্বান: ৩/১২৯; বাইহাকী, শুআবুল ঈমান)
- হানাফি ফিকহ: ফাতাওয়া হিন্দিয়ায় (৫/৩৭৪) উল্লেখ আছে, কাইলুলা করা মুস্তাহাব।
৪. ঘুমের পরিমাণ কতক্ষণ?
সুন্নাহতে ঘুমের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। তবে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনাচরণ থেকে আমরা দেখতে পাই, তিনি রাতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা তার কিছু বেশি ঘুমাতেন এবং বাকি সময় ইবাদত ও বিশ্রামে কাটাতেন।
- হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি: ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) সহ সালাফে সালেহীনগণ রাতের প্রথমাংশে ঘুমাতেন এবং শেষাংশে উঠে তাহাজ্জুদ পড়তেন। ঘুমের পরিমাণ এমন হওয়া উচিত যেন ফজরের নামাজ জামাতের সাথে আদায় করা যায় এবং দিনের কাজে কোনো ক্লান্তি না আসে।
- মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহঃ) তাঁর ‘মা’আরিফুল কুরআন’-এ উল্লেখ করেছেন, ঘুমের পরিমাণ ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে, তবে অতিরিক্ত ঘুম (যা দিনের কাজ ও ইবাদত নষ্ট করে) মাকরূহ।
৫. ঘুমানোর সময় করণীয় (সুন্নাহ)
ঘুমানোর সময় ও পরিমাণের চেয়ে ঘুমানোর পদ্ধতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সুন্নাহ অনুযায়ী ঘুমানোর নিয়ম:
- অজু করে ঘুমানো।
- ডান কাত হয়ে ঘুমানো।
- ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস পড়া।
- ঘুমানোর দোয়া পড়া।
সারসংক্ষেপ:
- সঠিক সময়: এশার নামাজের পরপরই ঘুমানো সুন্নত। এশার আগে ঘুমানো মাকরূহ। রাতের শেষভাগে (তাহাজ্জুদের সময়) জাগ্রত থাকা সুন্নত।
- পরিমাণ: ঘুমের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। তবে রাতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঘুমানো এবং বাকি সময় ইবাদতে কাটানো রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আদর্শ। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঘুম (যা ফজরের নামাজ ছুটে যায় বা দিনের কাজে বাধা সৃষ্টি করে) অনুচিত।
- দিনের বেলা: দুপুরের কিছুক্ষণ (কাইলুলা) ঘুমানো সুন্নত।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুন্নাহ মোতাবেক জীবনযাপনের তাওফিক দান করুন। আমিন।