"দ্বীনি বোন" যদি রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয় না হন, তবে তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার ক্ষেত্রে আত্মীয়তা ছিন্নকারীর হুকুম প্রযোজ্য হবে কি?
Family Life · Hanafi
Question
আমার দ্বীনি বোন, আমাকে কষ্ট দিয়েছে। দ্বীনের খাতিরে আমি তার সাথে পূনরায় মিলিত হয়েছি। তার দেয়া কষ্ট ভুলে গিয়েছি। অনেক সময় কষ্ট ভুলতে না পারলেও চেষ্টাটুকু করেছি, তার সাথে সব নরমাল রেখে কথা বলতে।
অন্যদিকে সে বোন সামান্য কারনেই আমার উপর রাগ করে বসে থাকে। আমি নাকি তাকে কষ্ট দেই। (অনেকে থাকে একটু সেনসিটিভ! অল্প কথাতেই কষ্ট পায়) এ নিয়ে সে আমার সাথে কথা বলেনা। মুখ গোমড়া করে রাখে। আমি স্বেচ্ছায়, আগ বাড়িয়ে তার সাথে কথা বলি। কিন্তু এভাবে কতবার?
একটা মানুষ যদি আমার কথায় রেসপন্স না করে, করলেও টিটকারি, ঠেস মেরে কথা বলে। আমি বেশিরভাগ সময় সেসব হেসে উড়িয়ে দেই। কিন্তু মুসলিমা হিসেবে আমারও তো একটা গায়রত আছে? আত্মসম্মান আছে?
প্রশ্ন:
এসব ক্ষেত্রে যদি আমি সম্মানের সাথে তার সহিত সম্পর্কে দুরত্ব টেনে আনি। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা না বলি। তাহলে কি আমি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী হিসেবে গন্য হবো?
Answer
আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী হিসেবে গণ্য হবেন কি?
ওয়ালাইকুম আসসালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ। উত্তর: আপনার প্রশ্নের উত্তরে প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন—আত্মীয়তার সম্পর্ক (সিলাতুর রাহিম) বলতে মূলত রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখাকে বোঝায়। আপনার উল্লেখিত "দ্বীনি বোন" যদি রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয় না হন, তবে তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার ক্ষেত্রে আত্মীয়তা ছিন্নকারীর হুকুম প্রযোজ্য হবে না।
কুরআন ও হাদীসের নির্দেশনা
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:
"তারা এমন লোক যারা একত্রিত করে যা আল্লাহ আদেশ করেছেন তা এবং আল্লাহকে ভয় করে এবং হিসাবের ভয় রাখে।" (সূরা রাদ: ২১)
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে আল্লাহ ও শেষ দিবসের উপর, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।" (বুখারী: ৬১৩৮)
তবে মনে রাখতে হবে, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝানো হয় যে রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে। আপনার ক্ষেত্রে যদি উক্ত বোন রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয় না হন, তবে তার সাথে সম্পর্কের দূরত্ব সৃষ্টি করলে আপনি "আত্মীয়তা ছিন্নকারী" হিসেবে গণ্য হবেন না।
ইসলামী নির্দেশনা
১. সম্মান রক্ষা করা: ইসলাম প্রতিটি মুসলিমের সম্মান রক্ষা করা আবশ্যক করেছে। যদি কেউ আপনার সম্মানহানি করে, তবে আপনি নিজের সম্মান রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারেন।
২. সদ্ব্যবহার: আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর ভালো ও মন্দ সমান নয়। মন্দের প্রতিদান দাও উত্তম পন্থায়। তাহলে দেখবে, যার সাথে তোমার শত্রুতা ছিল, সে যেন অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে গেছে।" (সূরা ফুসসিলাত: ৩৪)
৩. সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা: আপনি ইতিমধ্যে অনেক চেষ্টা করেছেন। যদি কেউ আপনার ভালো ব্যবহারের প্রতি সাড়া না দেয় এবং ক্রমাগত আপনাকে কষ্ট দেয়, তবে ইসলাম আপনাকে নিজের সম্মান রক্ষার অনুমতি দেয়।
ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গি
হানাফী ফিকহের আলোকে, সিলাতুর রাহিম মূলত রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখাকে বোঝায়। অ-আত্মীয়দের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইসলাম সাধারণ সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দেয়, কিন্তু যদি কেউ ক্রমাগত কষ্ট দেয়, তবে দূরত্ব বজায় রাখা জায়েয।
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহঃ) রদ্দুল মুহতারে উল্লেখ করেছেন যে, আত্মীয়তা ছিন্নকারী বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝায় যে রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে।
আপনার করণীয়
১. সম্মানের সাথে দূরত্ব বজায় রাখুন: আপনি যদি সম্মানের সাথে, প্রয়োজনীয় বিষয়ে সীমিত কথা বলেন, তবে তা জায়েয।
২. দোয়া করুন: তার জন্য দোয়া করুন যেন আল্লাহ তাকে হিদায়াত দেন এবং তার আচরণ পরিবর্তন করেন।
৩. সীমারেখা নির্ধারণ করুন: ইসলাম আপনাকে নিজের সম্মান রক্ষার অনুমতি দেয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা না বলা এবং দূরত্ব বজায় রাখা জায়েয।
৪. ক্ষমা করার চেষ্টা করুন: রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি ক্ষমা করে, আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন।" (মুসলিম: ২৫৮৮)
সংক্ষিপ্ত উত্তর
আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী হিসেবে গণ্য হবেন না, যদি:
- উক্ত বোন রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয় না হন
- আপনি সম্মানের সাথে সম্পর্কে দূরত্ব বজায় রাখেন
- প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা না বলেন
তবে যদি তিনি রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয় হন, তাহলেও ইসলামী নির্দেশনা হলো—সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন না করে, সীমিত পর্যায়ে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং দোয়া করা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফীক দান করুন। আমীন।
দলিলসমূহ:
- সূরা রাদ: ২১
- সূরা ফুসসিলাত: ৩৪
- সহীহ বুখারী: ৬১৩৮
- সহীহ মুসলিম: ২৫৮৮
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)