নাভি এবং হাটু কি পুরুষের সতরের অন্তর্ভুক্ত? গায়রে মাহরাম নারী বা পুরুষের সামনে সতর/আওরাহ খোলা রাখা কি কবিরা গুনাহ, নাকি সগীরা গুনাহ?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
নাভি এবং হাঁটু কি পুরুষের সতরের অন্তর্ভুক্ত? গায়রে মাহরামের সামনে সতর খোলা রাখা কি কবিরা গুনাহ?
ভূমিকা
ইসলামে সতর বা আওরাহ সংরক্ষণ করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর উপর ফরজ। পবিত্র কুরআন ও হাদীসে সতর সংরক্ষণের গুরুত্ব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আমরা হানাফী মাযহাবের প্রামাণ্য কিতাবসমূহের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করব।
পুরুষের সতরের সীমা
হানাফী মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, পুরুষের সতর হলো নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত। অর্থাৎ নাভি এবং হাঁটু উভয়ই সতরের অন্তর্ভুক্ত।
ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) এর মতে, পুরুষের সতর হলো নাভির নিচ থেকে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত। তবে হাঁটু নিজেও সতরের অন্তর্ভুক্ত।
দলিল:
১. হাদীস: রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
"পুরুষের সতর হলো নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত।" (মুসনাদে আহমাদ, দারাকুতনী, বায়হাকী)
২. আল-হিদায়াহ তে বর্ণিত আছে:
"পুরুষের সতর হলো নাভির নিচ থেকে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত। আর হাঁটু সতরের অন্তর্ভুক্ত।"
৩. রদ্দুল মুহতার (শামী) তে বলা হয়েছে:
"পুরুষের সতর সম্পর্কে সঠিক মত হলো, নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত। নাভি এবং হাঁটু উভয়ই সতরের অন্তর্ভুক্ত।"
গায়রে মাহরামের সামনে সতর খোলা রাখা
গায়রে মাহরাম নারী বা পুরুষের সামনে সতর খোলা রাখা সম্পূর্ণ হারাম এবং কবিরা গুনাহ। এর প্রমাণ নিম্নরূপ:
কুরআনের দলিল:
১. সূরা আন-নূর (২৪:৩০-৩১):
"মুমিন পুরুষদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে। এটাই তাদের জন্য পবিত্রতম। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের কাজ সম্পর্কে অবগত। আর মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে।"
২. সূরা আল-আহযাব (৩৩:৫৯):
"হে নবী! আপনার স্ত্রীগণ, কন্যাগণ ও মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের অংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজ হবে এবং তাদেরকে কষ্ট দেওয়া হবে না।"
হাদীসের দলিল:
১. সহীহ মুসলিম: আবু সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
"পুরুষ যেন পুরুষের দিকে তাকিয়ে না থাকে, আর নারী যেন নারীর দিকে তাকিয়ে না থাকে। পুরুষ যেন পুরুষের সাথে একই কাপড়ে শুয়ে না থাকে, আর নারী যেন নারীর সাথে একই কাপড়ে শুয়ে না থাকে।"
২. সুনানে আবু দাউদ: রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
"তোমার সতর ছাড়া তোমার শরীরের বাকি অংশের দিকে তাকানো তোমার ভাইয়ের জন্য বৈধ নয়।"
৩. সুনানে ইবনে মাজাহ: রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি তার সতর খুলে ফেলে, তার উপর লানত।"
কবিরা গুনাহ হওয়ার প্রমাণ:
গায়রে মাহরামের সামনে সতর খোলা রাখা কবিরা গুনাহ, কারণ:
১. ইমাম যাহাবী (রহঃ) তার "কবিরা গুনাহ" গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, সতর খোলা রাখা কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।
২. ফাতাওয়া আলমগীরী তে বলা হয়েছে:
"পুরুষের জন্য নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত ঢেকে রাখা ফরজ। কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে তা খুলে রাখে, তবে সে গুনাহগার হবে এবং তা কবিরা গুনাহ।"
৩. ইমদাদুল ফাতাওয়া তে মুফতী রশিদ আহমদ গাঙ্গোহী (রহঃ) বলেছেন:
"সতর খোলা রাখা কবিরা গুনাহ, কারণ এটি আল্লাহর আদেশ লঙ্ঘন এবং সমাজে অশ্লীলতা ছড়ানোর কারণ।"
৪. ফাতাওয়া উসমানী তে মুফতী মুহাম্মদ তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) বলেছেন:
"সতর খোলা রাখা শুধু গুনাহই নয়, বরং এটি কবিরা গুনাহ। কারণ এটি প্রকাশ্য অশ্লীলতা এবং সমাজে ফিতনা সৃষ্টির কারণ।"
সতর খোলা রাখার শাস্তি
১. দুনিয়াতে: সমাজে অসম্মান, ফিতনা ও অশ্লীলতা ছড়ানো। ২. আখিরাতে: কবিরা গুনাহের শাস্তি।
ব্যতিক্রম
কিছু ক্ষেত্রে সতর খোলা রাখা জায়েয হতে পারে:
- চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা
- গোসল বা প্রস্রাব-পায়খানার সময় (একান্ত নির্জনে)
- স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে
তবে এসব ক্ষেত্রেও যথাসম্ভব সতর লুকানোর চেষ্টা করা উচিত।
উপসংহার
১. পুরুষের সতর: নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত। নাভি ও হাঁটু উভয়ই সতরের অন্তর্ভুক্ত। ২. গায়রে মাহরামের সামনে সতর খোলা রাখা: সম্পূর্ণ হারাম এবং কবিরা গুনাহ। ৩. তওবা: যারা এই গুনাহ করেছে, তাদের উচিত আল্লাহর কাছে искрен তওবা করা এবং ভবিষ্যতে এই গুনাহ থেকে বিরত থাকা।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সতর সংরক্ষণের তাওফীক দান করুন। আমীন।
দলিলভিত্তিক গ্রন্থসমূহ:
- আল-হিদায়াহ
- রদ্দুল মুহতার (শামী)
- ফাতাওয়া আলমগীরী
- ইমদাদুল ফাতাওয়া
- ফাতাওয়া উসমানী
- বেহেশতি জেওর
- কিতাবুল আছল (ইমাম মুহাম্মদ)
- আল-মাবসূত (সারাখসী)