পরিবারের অসম্মতিতে বিয়ে করা কি জায়েজ?
Family Life · Hanafi
Question
আমি বর্তমানে অনার্স ১ম বর্ষ শেষ করেছি। আমি যখন ইন্টার ২য় বর্ষে পড়তাম, তখন আমার মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে আমার একটি সম্পর্ক তৈরি হয়। শুরুতে আমরা খুব বেশি কথা বলতাম না। সে প্রথমে আমাকে জানায় যে সে আমাকে পছন্দ করে। এরপর আমি তাকে বলি যে আমাদের এইভাবে কথা বলা ঠিক নয়, তাই আমরা আপাতত কম কথা বলব এবং HSC শেষ হওয়ার পর পরিবারকে জানিয়ে, পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে করার চেষ্টা করব। এরপর থেকে আমরা যথাসম্ভব দূরত্ব বজায় রেখে যোগাযোগ করতাম।
HSC শেষ হওয়ার পর আমরা আমাদের পরিবারকে বিষয়টি জানাই এবং বলি যে আমরা দুজনই একে অপরকে বিয়ে করতে চাই। কিন্তু পরিবার বিষয়টি জানার পর আমার জন্য অন্য জায়গায় বিয়ের প্রস্তাব দেখা শুরু করে। প্রায় তিন মাস ধরে পরিবার থেকে আমাদের সম্পর্ক মেনে না নিয়ে আমাকে অনেক চাপ দেওয়া হয় এবং আমাদের আলাদা করার চেষ্টা করা হয়। আমাদের দুজনকেই অনেক কথা শুনতে হয়েছে এবং মারধর ও গালিগালাজও করা হয়েছে।
এর মধ্যে আমাদের মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়ে যাওয়ায় আমরা একে অপরকে ছেড়ে দিতে পারিনি। একপর্যায়ে পরিবার আমাদের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। প্রায় ছয় মাস এভাবে চলার পর, আমি অসুস্থ হয়ে পড়লে পরিবার থেকেই আবার আমাদের যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করে দেয়। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত আমাদের মধ্যে যোগাযোগ রয়েছে।
কিন্তু বর্তমানে আমার পরিবার এখনও আমাদের বিয়ে মেনে নিতে চাচ্ছে না। বরং আমাকে না জানিয়ে আমার বায়োডাটা ও ছবি অন্য জায়গায় দিয়ে অন্য ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। আমার খালা এবং অন্য মামারাও আমাদের বিয়ে মেনে নিতে চান না। মূল আপত্তি হলো—আমার মামাতো ভাই বর্তমানে চাকরি করে না এবং আমরা দুজনই একই বয়সী।
আমরা দুজনই পরিবারকে বাদ দিয়ে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করতে চাই না। আমরা চাই ইসলামসম্মত ও হালালভাবে, পরিবারের সম্মতি নিয়ে বিয়ে করতে এবং একসঙ্গে সংসার করতে। আমাদের অনেক বন্ধু পালিয়ে বিয়ে করার পরামর্শ দিচ্ছে, কিন্তু আমরা জানি না এটা আমাদের পরিস্থিতিতে সঠিক হবে কি না।
আমরা অনেকবার পরিবারকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু তারা কোনোভাবেই রাজি হচ্ছে না। এখন আমার পরিবার আমাকে অন্য জায়গায় বিয়ে দেওয়ার জন্য আরও বেশি চাপ দিচ্ছে।
হুজুর, এই পরিস্থিতিতে আমাদের কী করা উচিত?
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ। আমি পুরো বিষয়টি মনোযোগ সহকারে পড়েছি এবং শরিয়াহসম্মত পরামর্শ দিচ্ছি।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে, পিতামাতার সম্মতি ছাড়া বিবাহ করা বৈধ, তবে তা সর্বোত্তম পন্থা নয়। তবে আপনার ক্ষেত্রে, যেহেতু আপনি এবং আপনার মামাতো ভাই উভয়েই বিবাহে সম্মত, এবং আপনি তাকে বিবাহ করতে চান, তাই শরিয়তের দৃষ্টিতে এই বিবাহ বৈধ হবে যদি দুজন সাক্ষী উপস্থিত থাকে এবং মোহর নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু পিতামাতার সম্মতি ছাড়া বিবাহ করলে পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা ইসলাম সমর্থন করে না।
বিস্তারিত বিশ্লেষণ
১. ইসলামে বিবাহের শর্ত
ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী বিবাহের মৌলিক শর্তসমূহ হলো:
- উভয় পক্ষের সম্মতি - ছেলে ও মেয়ে উভয়ের ইচ্ছা ও সম্মতি
- দুইজন সাক্ষী - বিশ্বস্ত দুইজন মুসলিম সাক্ষী
- মোহর নির্ধারণ - মেয়েকে মোহর প্রদান
- অভিভাবকের সম্মতি (হানাফী মাযহাব মতে) - মেয়ের অভিভাবকের সম্মতি
২. অভিভাবকের সম্মতি সম্পর্কে ইসলামী বিধান
হানাফী মাযহাব অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক (বালেগ) মেয়ে নিজে বিবাহ করার অধিকার রাখে। তবে অভিভাবকের সম্মতি ছাড়া বিবাহ করলে তা মাকরূহ (অপছন্দনীয়) বলে গণ্য হয়, কিন্তু বিবাহটি বৈধ থাকে।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কের মেয়ে নিজের বিবাহের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখে। তবে তিনি অভিভাবকের সম্মতিকে উত্তম মনে করতেন।
কুরআন ও হাদীসের আলোকে:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَبَلَغْنَ أَجَلَهُنَّ فَلَا تَعْضُلُوهُنَّ أَن يَنكِحْنَ أَزْوَاجَهُنَّ إِذَا تَرَاضَوْا بَيْنَهُم بِالْمَعْرُوفِ "আর যখন তোমরা স্ত্রীদের তালাক দাও এবং তারা তাদের ইদ্দত পূর্ণ করে, তখন তাদেরকে তাদের (পূর্ব) স্বামীদের সাথে বিবাহ করতে বাধা দিও না, যদি তারা নিজেদের মধ্যে ন্যায়সংগতভাবে সম্মত হয়।" (সূরা আল-বাকারা: ২৩২)
এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, মেয়েকে বিবাহ থেকে বাধা দেওয়া জায়েয নয়।
৩. আপনার পরিস্থিতির বিশ্লেষণ
আপনার পরিস্থিতিতে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ:
- আপনি এবং আপনার মামাতো ভাই উভয়েই বিবাহে সম্মত - এটি ইসলামী দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ
- আপনার পরিবার অন্য জায়গায় বিবাহ দিতে চাচ্ছে - এটি শরিয়তের দৃষ্টিতে সমস্যাযুক্ত, কারণ আপনাকে জোর করে বিবাহ দেওয়া জায়েয নয়
- আপনার মামাতো ভাই বেকার - এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিবেচনা, তবে ইসলামী দৃষ্টিতে বেকার হওয়া বিবাহের বাধা নয়
৪. পালিয়ে বিবাহ করা সম্পর্কে ইসলামী বিধান
পালিয়ে বিবাহ করা ইসলামী দৃষ্টিতে বৈধ হতে পারে যদি:
- উভয় পক্ষ প্রাপ্তবয়স্ক হয়
- উভয় পক্ষ সম্মত হয়
- দুইজন সাক্ষী থাকে
- মোহর নির্ধারণ করা হয়
তবে এটি সর্বোত্তম পন্থা নয়, কারণ:
- এটি পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট করে
- এটি সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি করে
- এটি ভবিষ্যতে পারিবারিক কলহের কারণ হতে পারে
৫. আপনার করণীয়
প্রথমত: পরিবারের সাথে ধৈর্য ধরে আলোচনা চালিয়ে যান। তাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো বোঝার চেষ্টা করুন এবং সমাধান খুঁজুন।
দ্বিতীয়ত: আপনার মামাতো ভাইকে উৎসাহিত করুন চাকরি বা আয়ের ব্যবস্থা করার জন্য। পরিবারের মূল আপত্তি হলো তার বেকারত্ব, তাই এটি সমাধান করলে অনেক সমস্যা দূর হতে পারে।
তৃতীয়ত: পরিবারের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করুন। পরিবারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা ইসলাম সমর্থন করে না।
চতুর্থত: যদি সব চেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং পরিবার আপনাকে জোর করে অন্যত্র বিবাহ দিতে চায়, তাহলে আপনি আপনার মামাতো ভাইকে নিয়ে বিবাহ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তবে এই ক্ষেত্রে:
- দুইজন বিশ্বস্ত সাক্ষী রাখুন
- মোহর নির্ধারণ করুন
- বিষয়টি গোপন না করে পরিবারকে জানান
৬. গুরুত্বপূর্ণ হাদীস
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
لَا تُنْكَحُ الْبِكْرُ حَتَّى تُسْتَأْذَنَ "কুমারী মেয়েকে তার অনুমতি ছাড়া বিবাহ দেওয়া যাবে না।" (সহীহ বুখারী: ৬৯৬৮)
এই হাদীস থেকে স্পষ্ট যে, মেয়ের অনুমতি ছাড়া বিবাহ দেওয়া জায়েয নয়। আপনার পরিবার যদি আপনাকে জোর করে অন্যত্র বিবাহ দিতে চায়, তাহলে তা শরিয়তসম্মত নয়।
চূড়ান্ত পরামর্শ
১. পরিবারের সাথে ধৈর্য ধরে আলোচনা চালিয়ে যান - রাগ বা ক্ষোভ নয়, বরং শান্তভাবে ও যুক্তিসঙ্গতভাবে বোঝানোর চেষ্টা করুন।
২. মামাতো ভাইকে চাকরি বা আয়ের ব্যবস্থা করতে উৎসাহিত করুন - এটি পরিবারের মূল আপত্তি দূর করতে সাহায্য করবে।
৩. পরিবারের সম্মান রক্ষা করুন - প্রকাশ্যে বা গোপনে এমন কিছু করবেন না যা পরিবারের সম্মান নষ্ট করে।
৪. যদি সব চেষ্টা ব্যর্থ হয় - এবং পরিবার আপনাকে জোর করে অন্যত্র বিবাহ দিতে চায়, তাহলে আপনি শরিয়তসম্মতভাবে আপনার মামাতো ভাইয়ের সাথে বিবাহ করতে পারেন। তবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভালোভাবে চিন্তা করুন এবং স্থানীয় আলেম বা মুফতির সাথে পরামর্শ করুন।
৫. দোয়া করুন - আল্লাহর কাছে হেদায়েত ও সহায়তা প্রার্থনা করুন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا "যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন।" (সূরা আত-তালাক: ২)
আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য সহজ পথ তৈরি করুন এবং আপনার বিষয়টি উত্তমভাবে সমাধান করুন। আমীন।