আত্মীয়তার সম্পর্ক ছেদের বিধান ও আমার করণীয় কি?

Family Life · Hanafi

Question No: 4673
Questioner: nasa
Question Asked: 31 Aug 2026, 04:39 PM
Reviewed & Published: 31 Aug 2026, 05:44 PM
Views: 27
Tokens: 12,254
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছেদকারীকে জাহান্নামি বলা হয়েছে এবং এই সম্পর্কের তিন স্তরের মধ্যে তৃতীয় স্তরে শ্বশুরবাড়ির কথা উল্লেখ করা আছে। আমার বিয়ের পাঁচ মাস হয়েছে, এবং বিয়ের প্রথম দিনে আমার একটা মেসেজের কারণে আমার ভাসুরের বউ খুবই মনক্ষুন্ন হয়, আমি ওই সময়ে তাঁকে সরি না বললেই, আমি আমার বিয়ে পড়ানোর ব্যাপারে উনাকে জানানোর মাধ্যমে পরিস্থিতি কিছুটা ঠান্ডা করার চেষ্টা করি, কিন্তু সেটা তার জন্যে যথেষ্ট ছিল না। বিয়ের দিন ছিল দেখে আমি আর তখন ওই ব্যাপারে সাথে সাথেই মিট্মাট না করে অনুষ্ঠান শেষে ফয়সালা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু, পরবর্তিতে উনি আমার কোন মেসেজের কোনো ধরনের রিপ্লাইই দেয়নি যে আমি ওই মেসেজের প্রসঙ্গ এনে উনার সাথে কথা বলবো। পরবর্তিতে আমার শ্বশুরের শরানাপন্ন হয়ে আমিই উনার সাথে কথা বলার ব্যবস্থা করি এবং তখন সরি বলি। কিন্তু তার বিয়ের আগের বেশ কিছু আচরন এবং একটা মেসেজকে কেন্দ্র করে আচরনের কারণে স্বাভাবিকভাবেই আমি দুরত্ব বজায়ে রেখে চলার চেষ্টা করতাম, এবং দরকারে শুধু মেসেজ দিতাম। তার দিক থেকে আর কোনো প্রকার কোনো যোগাযোগ রক্ষা হতো না। এই ৫ মাসের মধ্যে বলতে গেলে প্রত্যেক মাস পরপরি সে আমার যেকোনো ব্যাপারকে ইস্যু বানায়ে কিছু না জানিয়েই কথা বলা বন্ধ করে দেয়, ফোন রিসিভ করে না, মেসেজের রিপ্লাইও দেয়না, কথা বলতে চাইলেও মুখের উপর না করে দিয়েছে। তার এমন আচরনের কারণে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের বৈবাহিক জীবনে ফাটল ধরছে, আমার অসুস্থ শ্বশুরের দেখভাল তিনিই করেন দেখে তার এসব ব্যবহার প্রত্যেকবার হজম করার চেষ্টা করেছি কারন, আমার শ্বশুরকে আমাদের কাছে এনে আমি আর আমার স্বামি দেখভাল করবো সেই অবস্থা এখনও হয়নি। এইবার আমার স্বামী ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে hospitalized ছিল, সেই সময়ে আমি আমার শ্বশুরবাড়ি থেকে কোনো হেল্প পাওয়া তো দুরের কথা, উলটা ওই সময় থেকে আমার ভাসুরের বউ আবার সব যোগাযোগ, ফোন ধরা, মেসেজের রিপ্লাই দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। হসপিটাল থেকে আসার পর ভাসুর এবং শ্বশুর জানাইছে, বিয়ের সময়ের ওই মেসেজের বিষয়ে এখনও বলে কিছুই রিসল্ভ হয়নি, সে ডিমান্ড করছে আমার তাঁকে সরি বলতে হবে, রিসল্ভ করতে হবে ব্যাপার। একটা বিপদ থেকে রক্ষা পাওার সময় তো কোনো হেল্পই পায়নি, উলটা আমার ওই বিপদ সামলানোর সাথে সাথে তাদের এসব ব্যাপারে মাথা ঘামাতে হচ্ছে। আমার স্বামীর সাথে রীতিমত আমার সম্পর্ক খারাপের পথে চলে যাচ্ছে। আমি আমার স্বামীকে জানিয়ে দিয়েছি যে, সরি বলছি, তার পরেও সে আমার এবং আমার ফ্যামিলির সাথে দুর্ব্যবহার করছে, মানায়ে নিছি, এমনকি সেও মাঝে সাঝে আমি কথা বললে স্বাভাবিকভাবে কথা বার্তা বলছে, তারপরেও এরকম হাসপাতালে থাকা অবস্থায় কেন তার মনে হলো এখন আমাদের এসব ঝামেলা মিটাতে হবে, ৫ মাস সে সবর করছে আর কয়টা দিন করতে পারতো না...যাই হোক, আমি নিজে মেন্টালি খুবই unstable হয়ে যাচ্ছি, আমার সংসার জীবনে অশান্তী তৈরি হচ্ছে দেখে আমি জানিয়ে দিয়েছি যে, আমি তার ভাই আর ভাইয়ের বউকে এই ব্যাপারে সরি আর বলবো না, কারন প্রথমবার যখন সরি বলেছি তখন আমারই সব ব্যবস্থা করতে হয়েছে এবং এরপরেও তার বিভিন্ন দুরব্যবহার মেনে নিয়েও স্বাভাবিকভাবে কথা বলার চেষ্টা করেছি। আমার কোনো খোজখবর তাদের নেওয়া লাগবে না, আমিও আর তাদের সাথে কোনও কথা বলবো না, শুধুমাত্র কোনো ফ্যামিলি ইমারজেন্সি বা বিপদ দুর্জগে কথা বলা, বা নিজের সাধ্য অনুযায়ী সাপোর্ট দেওয়া ছাড়া।
সুতরাং আমি যেহেতু যোগাযোগে শিথিলতা এবং শর্ত শাপেক্ষে যোগাযোগ করবো আমার ভাসুর এবং তার বউয়ের সাথে, এক্ষেত্রে আমি কি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারি, জাহান্নামি হবো?

Answer

আত্মীয়তার সম্পর্ক ছেদের বিধান ও আপনার করণীয়

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

আপনি বিবাহিত নারী, বিয়ের ৫ মাস হয়েছে। আপনার ভাসুরের বউয়ের সাথে একটি মেসেজকে কেন্দ্র করে মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়েছে। আপনি ইতোমধ্যে তাকে সরি বলেছেন, কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি এবং আপনার সাথে সকল যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন। আপনার স্বামী হাসপাতালে থাকাকালীন সময়েও তারা কোনো খোঁজখবর নেয়নি। এখন আপনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, আপনি শুধুমাত্র জরুরি প্রয়োজনে তাদের সাথে যোগাযোগ করবেন। আপনার প্রশ্ন হলো—এতে কি আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছেদকারী (জাহান্নামি) হবেন?

উত্তরের মূল কথা

আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছেদকারী হবেন না, ইনশাআল্লাহ। কারণ:

১. আপনি সম্পর্ক ছেদ করার সিদ্ধান্ত নেননি, বরং অপর পক্ষই সম্পর্ক ছেদ করেছে। ২. আপনি ইতোমধ্যে সরি বলেছেন এবং সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করেছেন।

দলিল ও প্রমাণ

কুরআন ও হাদিসের আলোকে

আল্লাহ তাআলা বলেন:

فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِنْ تَوَلَّيْتُمْ أَنْ تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحَامَكُمْ "ক্ষমতা লাভ করলে তোমরা কি তবে পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে?" (সূরা মুহাম্মাদ: ২২)

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَاطِعٌ "আত্মীয়তার সম্পর্ক ছেদকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (সহীহ বুখারী: ৫৯৮৪, সহীহ মুসলিম: ২৫৫৬)

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কে প্রকৃতপক্ষে সম্পর্ক ছেদকারী?

হানাফি ফিকহের আলোকে

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এবং অন্যান্য ফুকাহায়ে কেরামের মতে, সম্পর্ক ছেদকারী সেই ব্যক্তি, যে অন্য পক্ষের সম্পর্ক স্থাপনের প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করে এবং সম্পর্ক ছিন্ন করে রাখে।

রদ্দুল মুহতার (৫/২৬৮)-এ উল্লেখ আছে:

"আত্মীয়তার সম্পর্ক ছেদকারী সেই ব্যক্তি, যে সম্পর্ক স্থাপনের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে এবং সম্পর্ক ছিন্ন করে রাখে।"

ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৫/৩৫৭)-তে বলা হয়েছে:

"যদি কেউ আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, তবে সে গুনাহগার হবে। কিন্তু যদি সে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করে এবং অপর পক্ষ তা প্রত্যাখ্যান করে, তবে গুনাহ অপর পক্ষের উপর বর্তাবে।"

আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্যতা

আপনার ক্ষেত্রে:

  • আপনি সরি বলেছেন এবং সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করেছেন
  • অপর পক্ষ আপনার সরি গ্রহণ করেনি এবং সম্পর্ক ছিন্ন করেছে
  • আপনি সম্পূর্ণ ছেদ করেননি, বরং জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন

সুতরাং, আপনি সম্পর্ক ছেদকারী নন। বরং অপর পক্ষই সম্পর্ক ছেদ করেছে।

আপনার করণীয় সম্পর্কে ইসলামি নির্দেশনা

সম্পর্ক রক্ষার সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

لَيْسَ الْوَاصِلُ بِالْمُكَافِئِ، وَلَكِنِ الْوَاصِلُ الَّذِي إِذَا قُطِعَتْ رَحِمُهُ وَصَلَهَا "সে-ই সম্পর্ক রক্ষাকারী নয় যে প্রতিদান দেয়, বরং সে-ই সম্পর্ক রক্ষাকারী যে সম্পর্ক ছিন্ন করা সত্ত্বেও তা পুনঃস্থাপন করে।" (সহীহ বুখারী: ৫৯৯১)

আপনি ইতোমধ্যে এই চেষ্টা করেছেন। তবে ভবিষ্যতেও যদি সুযোগ হয়, আপনি আবারও চেষ্টা করতে পারেন।

স্বামীর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে মনোযোগ দিন

আপনার স্বামীর সাথে সম্পর্ক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি যে তার পরিবারের জন্য সর্বোত্তম, এবং আমি আমার পরিবারের জন্য সর্বোত্তম।" (সুনানে তিরমিজি: ৩৮৯৫)

৪. ধৈর্য ও সবর করুন

আল্লাহ তাআলা বলেন:

إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ "নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" (সূরা বাকারা: ১৫৩)

উপসংহারঃ-

আপনি জাহান্নামি হবেন না—কারণ আপনি সম্পর্ক ছেদ করেননি, বরং অপর পক্ষই ছেদ করেছে।

তবে আপনাকে সম্পর্ক রক্ষা করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। মাঝে মাঝে ফোনে অথবা সাক্ষাৎ হলে সরাসরি কথা বলতে হবে। কমপক্ষে সালাম বিনিময় করতে হবে।

দোয়া করুন—আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন যেন তিনি আপনার সংসারে শান্তি ফিরিয়ে আনেন। স্বামীর সাথে কথা বলুন—তাকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলুন এবং সম্পর্ক উন্নয়নে একসাথে কাজ করুন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.