আত্মীয়তার সম্পর্ক ছেদের বিধান ও আমার করণীয় কি?
Family Life · Hanafi
Question
সুতরাং আমি যেহেতু যোগাযোগে শিথিলতা এবং শর্ত শাপেক্ষে যোগাযোগ করবো আমার ভাসুর এবং তার বউয়ের সাথে, এক্ষেত্রে আমি কি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারি, জাহান্নামি হবো?
Answer
আত্মীয়তার সম্পর্ক ছেদের বিধান ও আপনার করণীয়
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
আপনি বিবাহিত নারী, বিয়ের ৫ মাস হয়েছে। আপনার ভাসুরের বউয়ের সাথে একটি মেসেজকে কেন্দ্র করে মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়েছে। আপনি ইতোমধ্যে তাকে সরি বলেছেন, কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি এবং আপনার সাথে সকল যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন। আপনার স্বামী হাসপাতালে থাকাকালীন সময়েও তারা কোনো খোঁজখবর নেয়নি। এখন আপনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, আপনি শুধুমাত্র জরুরি প্রয়োজনে তাদের সাথে যোগাযোগ করবেন। আপনার প্রশ্ন হলো—এতে কি আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছেদকারী (জাহান্নামি) হবেন?
উত্তরের মূল কথা
আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছেদকারী হবেন না, ইনশাআল্লাহ। কারণ:
১. আপনি সম্পর্ক ছেদ করার সিদ্ধান্ত নেননি, বরং অপর পক্ষই সম্পর্ক ছেদ করেছে। ২. আপনি ইতোমধ্যে সরি বলেছেন এবং সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করেছেন।
দলিল ও প্রমাণ
কুরআন ও হাদিসের আলোকে
আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِنْ تَوَلَّيْتُمْ أَنْ تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحَامَكُمْ "ক্ষমতা লাভ করলে তোমরা কি তবে পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে?" (সূরা মুহাম্মাদ: ২২)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَاطِعٌ "আত্মীয়তার সম্পর্ক ছেদকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (সহীহ বুখারী: ৫৯৮৪, সহীহ মুসলিম: ২৫৫৬)
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কে প্রকৃতপক্ষে সম্পর্ক ছেদকারী?
হানাফি ফিকহের আলোকে
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এবং অন্যান্য ফুকাহায়ে কেরামের মতে, সম্পর্ক ছেদকারী সেই ব্যক্তি, যে অন্য পক্ষের সম্পর্ক স্থাপনের প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করে এবং সম্পর্ক ছিন্ন করে রাখে।
রদ্দুল মুহতার (৫/২৬৮)-এ উল্লেখ আছে:
"আত্মীয়তার সম্পর্ক ছেদকারী সেই ব্যক্তি, যে সম্পর্ক স্থাপনের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে এবং সম্পর্ক ছিন্ন করে রাখে।"
ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৫/৩৫৭)-তে বলা হয়েছে:
"যদি কেউ আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, তবে সে গুনাহগার হবে। কিন্তু যদি সে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করে এবং অপর পক্ষ তা প্রত্যাখ্যান করে, তবে গুনাহ অপর পক্ষের উপর বর্তাবে।"
আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্যতা
আপনার ক্ষেত্রে:
- আপনি সরি বলেছেন এবং সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করেছেন
- অপর পক্ষ আপনার সরি গ্রহণ করেনি এবং সম্পর্ক ছিন্ন করেছে
- আপনি সম্পূর্ণ ছেদ করেননি, বরং জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন
সুতরাং, আপনি সম্পর্ক ছেদকারী নন। বরং অপর পক্ষই সম্পর্ক ছেদ করেছে।
আপনার করণীয় সম্পর্কে ইসলামি নির্দেশনা
সম্পর্ক রক্ষার সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
لَيْسَ الْوَاصِلُ بِالْمُكَافِئِ، وَلَكِنِ الْوَاصِلُ الَّذِي إِذَا قُطِعَتْ رَحِمُهُ وَصَلَهَا "সে-ই সম্পর্ক রক্ষাকারী নয় যে প্রতিদান দেয়, বরং সে-ই সম্পর্ক রক্ষাকারী যে সম্পর্ক ছিন্ন করা সত্ত্বেও তা পুনঃস্থাপন করে।" (সহীহ বুখারী: ৫৯৯১)
আপনি ইতোমধ্যে এই চেষ্টা করেছেন। তবে ভবিষ্যতেও যদি সুযোগ হয়, আপনি আবারও চেষ্টা করতে পারেন।
স্বামীর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে মনোযোগ দিন
আপনার স্বামীর সাথে সম্পর্ক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি যে তার পরিবারের জন্য সর্বোত্তম, এবং আমি আমার পরিবারের জন্য সর্বোত্তম।" (সুনানে তিরমিজি: ৩৮৯৫)
৪. ধৈর্য ও সবর করুন
আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ "নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" (সূরা বাকারা: ১৫৩)
উপসংহারঃ-
আপনি জাহান্নামি হবেন না—কারণ আপনি সম্পর্ক ছেদ করেননি, বরং অপর পক্ষই ছেদ করেছে।
তবে আপনাকে সম্পর্ক রক্ষা করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। মাঝে মাঝে ফোনে অথবা সাক্ষাৎ হলে সরাসরি কথা বলতে হবে। কমপক্ষে সালাম বিনিময় করতে হবে।
দোয়া করুন—আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন যেন তিনি আপনার সংসারে শান্তি ফিরিয়ে আনেন। স্বামীর সাথে কথা বলুন—তাকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলুন এবং সম্পর্ক উন্নয়নে একসাথে কাজ করুন।