টাকা ইনভেস্ট করে কম বেশি করে লাভ নেওয়া কি জায়েজ?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
টাকা ইনভেস্ট করে কম-বেশি লাভ নেওয়ার বিধান
উত্তর: ওয়ালাইকুম আসসালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বুঝে নেওয়া প্রয়োজন। আপনি যে পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেছেন, তা ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয নয় এবং এটি সুদ (রিবা) এর অন্তর্ভুক্ত হবে।
কেন এটি জায়েয নয়?
১. সুদ (রিবা) এর সংজ্ঞা: ইসলামী শরীয়তে ঋণ প্রদানের বিনিময়ে কোনো অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করা সুদ। এখানে আপনি ৪ লক্ষ টাকা স্বর্ণের দোকানদারকে দিচ্ছেন এবং তিনি নির্দিষ্ট পরিমাণ লাভ (মাসে ৩০০০-৫০০০ টাকা) দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। এটি মূলত একটি ঋণ যার উপর নির্ধারিত সুদ দেওয়া হচ্ছে।
২. কুরআনের নির্দেশ: আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)
৩. হাদীসের নির্দেশ: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি সুদ খায়, যে ব্যক্তি সুদ খাওয়ায়, যে ব্যক্তি সুদের দলিল লিখে এবং যে ব্যক্তি সুদের সাক্ষ্য দেয়—তাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ।" (সহীহ মুসলিম: ১৫৯৮)
কেন এটি মুদারাবা (পার্টনারশিপ) হিসেবে গণ্য হবে না?
আপনি হয়তো ভাবতে পারেন এটি মুদারাবা (মুনাফা-অংশীদারিত্ব) হতে পারে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি মুদারাবা নয়, কারণ:
১. মুদারাবার শর্ত: মুদারাবায় লাভের হার শতাংশ হিসেবে নির্ধারিত হয় (যেমন: ৫০% লাভের অংশীদারিত্ব), নির্দিষ্ট টাকার অঙ্ক হিসেবে নয়। এখানে নির্দিষ্ট অঙ্ক (৩০০০-৫০০০ টাকা) নির্ধারণ করা হয়েছে, যা মুদারাবার শর্তের পরিপন্থী।
২. ক্ষতির অংশীদারিত্ব: মুদারাবায় ক্ষতি হলে মূলধনদাতা (রাব্বুল মাল) ক্ষতির অংশ বহন করেন। কিন্তু এখানে দোকানদার বলছে তিনি নির্দিষ্ট লাভ দেবেন, ক্ষতির কোনো কথা নেই। এটি মুদারাবার নীতির সাথে সাংঘর্ষিক।
৩. গ্যারান্টিড রিটার্ন: ইসলামী অর্থনীতিতে মূলধনের উপর নির্ধারিত বা গ্যারান্টিড রিটার্ন হারাম। এখানে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ রিটার্ন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, যা সুদেরই একটি রূপ।
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মত
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, যদি কেউ কোনো ব্যবসায় অর্থ বিনিয়োগ করে এবং নির্ধারিত পরিমাণ লাভের শর্ত করে, তবে তা জায়েয নয়। মুদারাবায় লাভের হার অবশ্যই শতাংশ হিসেবে নির্ধারিত হতে হবে এবং ক্ষতির অংশীদারিত্বও থাকতে হবে।
ফাতাওয়া উসমানী ও অন্যান্য কিতাবের আলোকে
মুফতী মুহাম্মদ তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) তাঁর ফাতাওয়া উসমানীতে উল্লেখ করেছেন যে, ইসলামী ব্যাংকিং ও অর্থায়নে নির্ধারিত রিটার্নের বিনিময়ে অর্থ প্রদান করা সুদ। তিনি বলেন:
"মুদারাবায় লাভের হার শতাংশ হিসেবে নির্ধারিত হবে, নির্দিষ্ট অঙ্ক হিসেবে নয়। আর ক্ষতির অংশীদারিত্বও থাকতে হবে।"
সঠিক ইসলামী পদ্ধতি
যদি আপনি স্বর্ণের দোকানে বিনিয়োগ করতে চান, তাহলে সঠিক পদ্ধতি হবে:
১. মুদারাবা চুক্তি: দোকানদারের সাথে মুদারাবা চুক্তি করুন, যেখানে লাভের শতাংশ নির্ধারিত হবে (যেমন: ৫০% বা ৬০%)। ক্ষতি হলে তা মূলধনদাতা বহন করবে।
২. মুশারাকা চুক্তি: যৌথ অংশীদারিত্ব স্থাপন করুন, যেখানে আপনি অংশীদার হবেন এবং লাভ-ক্ষতি উভয়েই অংশীদার হবেন।
৩. বিক্রয়-পদ্ধতি: দোকানদারকে পণ্য ক্রয় করে বিক্রি করার জন্য অর্থ দিন, যেখানে লাভের পরিমাণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে।
উপসংহার
আপনার উল্লেখিত পদ্ধতিতে টাকা দেওয়া-নেওয়া হারাম এবং এটি সুদের অন্তর্ভুক্ত। কারণ এখানে নির্ধারিত পরিমাণ লাভের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, যা মুদারাবার শর্তের সাথে সাংঘর্ষিক এবং সুদেরই একটি রূপ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে হালাল রিজিকের তাওফীক দান করুন এবং হারাম থেকে হেফাজত করুন। আমীন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।