Niqab

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 4646
Questioner: Nusrat Fardous snaha
Question Asked: 30 Aug 2026, 07:18 PM
Reviewed & Published: 30 Aug 2026, 11:00 PM
Views: 29
Tokens: 8,986
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।
আমি একজন বিবাহিত মুসলিম নারী। আমার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির পরিবার মনে করেন যে নারীর মুখ ঢেকে নিকাব করা ফরজ এবং নিকাব না করলে পূর্ণ পর্দা হয় না। আমার স্বামী চান আমি নিয়মিত নিকাব করি।

কিন্তু আমি নিজে নিকাব করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না। এছাড়া আমার ত্বক খুব সংবেদনশীল এবং কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে রাখলে আমার মুখে অ্যালার্জির মতো সমস্যা, পিম্পল এবং ব্যথা হয়। তারপরও আমার স্বামী মনে করেন, আমি যদি কষ্ট সহ্য করে নিকাব চালিয়ে যাই তাহলে আল্লাহর কাছে বেশি সওয়াব পাব।
এছাড়াও আমার শ্বাসকষ্ট বা প্যানিক এট্যাকের সমস্যা হয়।

আমি জানতে চাই:

১. কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে নারীর জন্য মুখ ঢেকে নিকাব করা কি ফরজ/ওয়াজিব? এ বিষয়ে আলেমদের মতভেদ থাকলে হানাফি মাজহাবের নির্ভরযোগ্য মত কোনটি?

২. যদি নিকাব পরার কারণে বাস্তবিকভাবে ত্বকে ব্যথা, অ্যালার্জি বা ক্ষতি হয়, তাহলে সেই অবস্থায়ও কি নিকাব করা বাধ্যতামূলক?

৩. “ইবাদত করতে যত বেশি কষ্ট হবে, তত বেশি সওয়াব”—এই ধারণাটি কি এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য? নিজের শরীরের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকলে ইচ্ছা করে সেই কষ্ট সহ্য করা কি শরিয়তে কাম্য?

৪. যদি স্ত্রী নিকাবকে ফরজ মনে না করেন এবং শালীন হিজাব ও পর্দার অন্যান্য শর্ত পালন করতে চান, তাহলে স্বামী কি তাকে জোর করে নিকাব পরাতে পারেন?

৫. আমার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির পরিবার নিকাবকে পর্দার অপরিহার্য অংশ মনে করেন। এই পরিস্থিতিতে আমার করণীয় কী?

দয়া করে কুরআন, সহিহ হাদিস এবং নির্ভরযোগ্য হানাফি ফিকহের দলিলসহ উত্তর দিলে উপকৃত হব।

জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।

Answer

بسم الله الرحمن الرحيم

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত। আমি কুরআন, সহিহ হাদিস এবং নির্ভরযোগ্য হানাফি ফিকহের আলোকে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব।


১. মুখ ঢেকে নিকাব করা কি ফরজ বা ওয়াজিব? হানাফী মাযহাবের নির্ভরযোগ্য মত:

  • হানাফী ফিকহের মুতামাদ (অগ্রগণ্য) ফয়সালা: হানাফী মাযহাবের নির্ভরযোগ্য ফয়সালা অনুযায়ী, স্বাধীন নারীর মুখমণ্ডল (চেহারা) এবং দুই হাতের কব্জি ,মূলত নামাযের ক্ষেত্রে এবং স্বাভাবিক অবস্থায় **"সতর" (আওরাত) এর অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে পরপুরুষের সামনে ফেতনার আশঙ্কার কারণে (বিশেষ করে বর্তমান ফেতনা-ফাসাদের যুগে) যুবতী নারীর জন্য চেহারা খোলা রাখা নিষিদ্ধ এবং চেহারা ঢেকে রাখা বা নিকাব করা ওয়াজিব (Wajib) হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে ।
  • দলীল ও কিতাবের ইবারত:
    • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (১৯শ খণ্ড): এই খণ্ডের ১৭৬-১৭৭ পৃষ্ঠায় "চেহারা কা পরদা" (চেহারার পর্দা) পরিচ্ছেদে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, পবিত্র কুরআনে সূরা আল-আহযাবের ৫৯ নম্বর আয়াতের (يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ) তাফসীরে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযি.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে— "বিশ্বাসীনী নারীরা যখন কোনো প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হবে, তখন তারা তাদের মাথার উপর থেকে জিলবাব টেনে মুখমণ্ডল ঢেকে নেবে এবং কেবল একটি চোখ খোলা রাখবে।" [Fatawa Mahmoodiah, Vol. 19, p. 176; Ibn Kathir]।

    • আদ্দুররুল মুখতার (২য় খণ্ড): হানাফী ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাব আদ্দুররুল মুখতারের ২য় খণ্ডের ৯৭ পৃষ্ঠায় (অথবা অন্য সংস্করণে ১ম খণ্ডের ৪০৬ পৃষ্ঠায়) বলা হয়েছে—

      وتمنع المرأة الشابة من كشف وجهها بين الرجال لا لأنه عورة بل لخوف الفتنة অনুবাদ: "পরপুরুষদের সামনে যুবতী নারীকে মুখমণ্ডল খোলা রাখতে বাধা দেওয়া হবে; তবে এটি চেহারা সতর বা আওরাত হওয়ার কারণে নয়, বরং ফেতনার আশঙ্কার কারণে।"


২. নিকাব পরার কারণে বাস্তবিকভাবে ত্বকে ব্যথা, অ্যালার্জি বা ক্ষতি হলে হুকুম:

  • শরয়ী বিধান (ওযরের কারণে শিথিলতা): যদি কোনো ফরজ বা ওয়াজিব আমল আদায়ের কারণে শরীরে বাস্তবিকভাবে রোগ সৃষ্টি হয়, রোগ বৃদ্ধি পায় বা তীব্র শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তবে শরীয়ত সেখানে শিথিলতা প্রদান করে। আপনার ত্বকে যদি গুরুতর অ্যালার্জি, পিম্পল, ব্যথা কিংবা শ্বাসকষ্ট বা প্যানিক অ্যাটাকের মতো রোগ বাস্তবিকভাবে বৃদ্ধি পায়, তবে আপনার জন্য ওযরের কারণে চেহারা খোলা রাখার পূর্ণ অনুমতি রয়েছে এবং এ অবস্থায় নিকাব করা বাধ্যতামূলক থাকবে না [Fatawa Mahmoodiah, Vol. 5, p. 57]।

  • দলীল ও কিতাবের সূত্র:

    • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (৫ম খণ্ড): এই খণ্ডের ৫৭ পৃষ্ঠায় গোসলের অধ্যায়ে একটি ওযরের মাসআলায় উল্লেখ করা হয়েছে— যদি কোনো রোগীকে কোনো নির্ভরযোগ্য মুসলিম চিকিৎসক মাথায় পানি ঢালতে নিষেধ করেন, অথবা নিজের বারবার অভিজ্ঞতা হয় যে মাথায় পানি ঢাললে ক্ষতি হবে বা নতুন রোগ সৃষ্টি হবে, তবে তার জন্য মাথায় পানি ঢালা জরুরী নয়; বরং কেবল মাসেহ করার গঞ্জাইশ রয়েছে [Fatawa Mahmoodiah, Vol. 5, p. 57]।
    • এই নির্ভরযোগ্য মূলনীতির আলোকে, যদি কোনো অভিজ্ঞ দ্বীনদার চিকিৎসক নিশ্চিত করেন যে মুখ ঢেকে রাখার কারণে আপনার ত্বকের ক্ষতি হচ্ছে বা শ্বাসকষ্ট বাড়ছে, তবে চেহারা খোলার ক্ষেত্রে আপনার জন্য শরয়ী ওযর প্রযোজ্য হবে [Fatawa Mahmoodiah, Vol. 5, p. 57; Darsul Fiqh-1, p. 469 ।

৩. “ইবাদত করতে যত বেশি কষ্ট হবে, তত বেশি সওয়াব”—এই ধারণাটি কি এক্ষেত্রে প্রযোজ্য?

  • নিজের শরীরের ক্ষতি করা শরীয়তে কাম্য নয়: ইবাদতে কষ্টের কারণে সওয়াব বেশি হওয়ার বিষয়টি কেবল ঐ স্বাভাবিক কষ্টের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যা এড়ানো সম্ভব নয় (যেমন শীতের দিনে ওযু করা)। কিন্তু নিজের শরীরের ক্ষতি করে বা রোগ বাড়িয়ে কষ্ট সহ্য করা শরীয়তে কোনোভাবেই কাম্য নয় [Fatawa Mahmoodiah, Vol. 5, p. 57।
  • দলীল ও কিতাবের সূত্র:
    • দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): এই কিতাবের ৩৯০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—

      لا ضرর ولا ضرار অনুবাদ: "কোনো ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতি সহ্য করাও যাবে না (ইসলামে কোনো ক্ষতি স্বীকার করার অবকাশ নেই)।" [Darsul Fiqh-1, p. 390।

    • পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন—

      وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى النَّهْلُكَةِ অনুবাদ: "তোমরা নিজেদের হাতকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করো না।" (সূরা বাকারা: ১৯৫) ,Darsul Fiqh-1, p. 390।

    • অতএব, রোগ বৃদ্ধি বা ত্বকের ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও জোরপূর্বক কষ্ট সহ্য করা শরীয়তের মেযাজের পরিপন্থী। বরং শরীয়তের দেওয়া শিথিলতা বা ওযরের সুযোগ গ্রহণ করাই আল্লাহর নিকট অধিক পছন্দনীয়।

৪. স্ত্রী নিকাব ফরজ মনে না করলে এবং অন্যান্য পর্দা মানলে স্বামী কি জোর করতে পারেন?

  • ন্যায়সঙ্গত বিষয়ে স্বামীর আনুগত্য: ইসলামে স্বামীর আনুগত্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু স্বামীর যেকোনো নির্দেশ মানার মূল শর্ত হলো তা ন্যায়সঙ্গত এবং ক্ষতিকর বিষয়মুক্ত হতে হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন— "আল্লাহর নাফরমানী বা ক্ষতিকর বিষয়ে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য করা যাবে না; আনুগত্য কেবল ভালো ও ন্যায়সঙ্গত কাজে" (لا طاعة في معصية الله، إنما الطاعة في المعروف) Darsul Fiqh-1, p. 360-361।
  • দলীল ও কিতাবের সূত্র:
    • দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): এই কিতাবের ৩৬০-৩৬১ পৃষ্ঠায় স্বামীর আনুগত্যের সীমারেখা ও মারূফ বা ন্যায়সঙ্গত বিষয়ের অধীনে বিশদ আলোচনা করে বলা হয়েছে যে, স্বামী তার স্ত্রীকে এমন কষ্টসাধ্য বা ক্ষতিকর কাজ করতে জোর করতে পারেন না যা স্ত্রীর শারীরিক সুস্থতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। Darsul Fiqh-1, p. 360-361।
    • যেহেতু আপনার চর্মরোগ ও শ্বাসকষ্টের ওযর রয়েছে এবং আপনি শালীন হিজাব ও পর্দার অন্যান্য শর্তসমূহ (যেমন ঢিলেঢালা পোশাক পরিধান করা, মাথা, ঘাড় ও বুক আবৃত রাখা) সঠিকভাবে পালন করছেন, সেহেতু স্বামী আপনাকে জোরপূর্বক নিকাব পরাতে বাধ্য করা শরীয়তের দৃষ্টিতে সমীচীন নয় [Darsul Fiqh-1, p. 360-361]।

৫. আপনার বর্তমান পরিস্থিতিতে করণীয় ও সমাধান:

১. চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ: আপনি কোনো অভিজ্ঞ দ্বীনদার চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ এবং রেসপিরেটরি ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে আপনার সংবেদনশীল ত্বক ও শ্বাসকষ্টের বিষয়টি পরীক্ষা করান। ডাক্তার যদি মুখ ঢেকে রাখতে নিষেধ করেন, তবে সেই ব্যবস্থাপত্রটি স্বামীর সামনে ওযর হিসেবে পেশ করুন [Fatawa Mahmoodiah, Vol. 5, p. 57]। ২. নম্র ভাষায় আলোচনা ও বুঝানো: স্বামীকে রাগান্বিত না করে অত্যন্ত নরম ও ভালোবাসাপূর্ণ ভাষায় বুঝান যে, আপনি পর্দার বিধানকে সম্মান করেন এবং শালীন হিজাবের মাধ্যমে নিজেকে আবৃত রাখছেন [Darsul Fiqh-1, p. 420-421]। তবে আপনার শারীরিক কষ্টের কারণে আল্লাহ তা'আলা আপনাকে যে ওযরের সুযোগ দিয়েছেন, সেই সুযোগটুকু গ্রহণ করতে তিনি যেন আপনাকে মানসিক সহযোগিতা করেন [Fatawa Mahmoodiah, Vol. 5, p. 57]। ৩. ইনসাফপূর্ণ মনোভাব বজায় রাখা: আপনার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির পরিবারকে আশ্বস্ত করুন যে আপনি বাইরে পরপুরুষের সাথে মেলামেশা বা অপ্রয়োজনে ঘোরাঘুরি পরিহার করে চলছেন [Darsul Fiqh-1, p. 277]। এভাবে ওযরের সীমার মধ্যে থেকে স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করাই আপনার জন্য বর্তমান পরিস্থিতিতে সর্বোত্তম শরয়ী সিদ্ধান্ত।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.